খেলারদেশ

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০৩০

৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি সত্যিই সম্ভব?

৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি সত্যিই সম্ভব? ইনফান্তিনোর নতুন পরিকল্পনা নিয়ে যত প্রশ্ন

৬৪ দলের বিশ্বকাপ কি সত্যিই সম্ভব?

বিশ্বকাপের আকার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিসহ একটি ইশতেহারের ভিত্তিতে জিয়ানি ইনফান্তিনো ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন

রনক জামান
By রনক জামান

আরও দল, আরও ম্যাচ, আরও আয়। গত এক দশকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর পেছনে যেন এই তিনটি নীতিই কাজ করেছে।

বিশ্বকাপ ৩২ দল থেকে ৪৮ দলে উন্নীত হয়েছে। ক্লাব বিশ্বকাপও এখন অনেক বড় আকারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ম্যাচ বেড়েছে, টুর্নামেন্ট বেড়েছে, সম্প্রচার আয় বেড়েছে, স্পনসর বেড়েছে, এমনকি টিকিটের দামও আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও দেখা গেছে সুপার বোলের আদলে দীর্ঘ হাফটাইম শো। যেখানে বিরতি ছিল ২৭ মিনিট ২২ সেকেন্ড—যা ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীন।

কিন্তু ইনফান্তিনোর কাছে মনে হচ্ছে এখানেই শেষ নয়। এখন তিনি এমন একটি ধারণাকে সমর্থন দিচ্ছেন, যা কয়েক বছর আগেও অবাস্তব বলে মনে করা হতো—৬৪ দলের ফিফা বিশ্বকাপ।

ইনফান্তিনোর যুক্তি হিসেবে বিশ্বকাপ শেষে বলেন, "ছোট দেশগুলোকে যদি অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে উন্নতির জন্য তাদের প্রেরণাও কমে যাবে।" তার মতে, বিশ্বকাপে বেশি দেশ অংশ নিলে বিশ্ব ফুটবলের বিকাশ আরও দ্রুত হবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ছোট দেশগুলো কি সত্যিই সুযোগ পাচ্ছে না?

বাস্তবতা হলো, যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে যেকোনো দেশই বিশ্বকাপে খেলতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপেই তার প্রমাণ মিলেছে। কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ প্রথমবার কিংবা দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে উঠে এসেছে এবং অনেকেই প্রত্যাশার চেয়েও ভালো খেলেছে। অর্থাৎ, সমস্যা সুযোগের নয়—যোগ্যতার।

বিশ্বকাপের সফল দলগুলোর মধ্যে কেপ ভার্দে অন্যতম ছিল, কিন্তু অভিষেককারী দলগুলোর মধ্যে তারাই একমাত্র দল যারা গ্রুপ পর্ব পার হতে পেরেছিল

বিশ্বকাপের সফল দলগুলোর মধ্যে কেপ ভার্দে অন্যতম ছিল, কিন্তু অভিষেককারী দলগুলোর মধ্যে তারাই একমাত্র দল যারা গ্রুপ পর্ব পার হতে পেরেছিল

প্রশ্ন উঠতে পারে, ৬৪ দলের ধারণা এলো কোথা থেকে? এই পরিকল্পনার মূল উদ্যোক্তা আসলে ফিফা নয়, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল)। ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল উরুগুয়েতে ১৯৩০ সালে। শতবর্ষ উপলক্ষে ২০৩০ বিশ্বকাপ মূলত অনুষ্ঠিত হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে, তবে উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ হবে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এই বিশেষ আসরকে আরও বড় করতে ২০২৫ সালে কনমেবল প্রথমবারের মতো এককালীন ৬৪ দলের বিশ্বকাপ প্রস্তাব দেয়। কনমেবল সভাপতি আলেহান্দ্রো দোমিঙ্গেজ তখন বলেছিলেন, "পৃথিবীর কেউ যেন এই উৎসব থেকে বাদ না পড়ে।" ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও ঘোষণা দেন, "আমরা কাজ করছি, যাতে ২০৩০ বিশ্বকাপে ৬৪টি দল অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক ফুটবল তখনই এগোয়, যখন আরও বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।"

সবাই কি এই প্রস্তাব সমর্থন করছে? একেবারেই না। বরং বিশ্বের বড় ফুটবল সংস্থাগুলোর বেশিরভাগই এর বিরোধিতা করছে। উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন এটিকে সরাসরি "খারাপ ধারণা" বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এতে শুধু বিশ্বকাপ নয়, পুরো বাছাইপর্বের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানি বলেছেন, "এটি পুরো ফুটবল ব্যবস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।" অন্যদিকে এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা সতর্ক করে বলেছেন, "আরও সম্প্রসারণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।" তবুও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ সদস্য।

৬৪ দল হলে আসলে কী পরিবর্তন হবে? বর্তমান ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ১২টি গ্রুপ রয়েছে। ৬৪ দল হলে হবে ১৬টি চার দলের গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুই দল সরাসরি নকআউটে যাবে। এই দিক থেকে দেখলে ফরম্যাটটি কিছুটা সহজ ও স্বাভাবিক। তৃতীয় হওয়া দলকে হিসাব-নিকাশ করে পরবর্তী রাউন্ডে তোলার দরকার হবে না। এটি ১৯৯৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ব্যবহৃত ৩২ দলের বিশ্বকাপের মতোই পরিষ্কার একটি কাঠামো।

কিন্তু এতে কি বিশ্বকাপের মান কমে যাবে? এটাই সবচেয়ে বড় বিতর্ক। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে ছিল সবচেয়ে বড় বিস্ময়। তারা স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে গ্রুপ থেকে উঠে আসে এবং শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই উদাহরণ দেখিয়ে ইনফান্তিনো বলছেন, ছোট দেশগুলোকে সুযোগ দিলে তারাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। কিন্তু পুরো চিত্রটি ভিন্ন। ২০২৬ বিশ্বকাপে—হাইতি, ইরাক, জর্ডান, পানামা, তিউনিসিয়া, উজবেকিস্তান এক পয়েন্টও অর্জন করতে পারেনি। অনেক ম্যাচই ছিল একপেশে। বিশ্ব ফুটবলের বড় দলগুলোর ওপরও গ্রুপপর্বে চাপ আগের তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে সমালোচকদের মতে, আরও ১৬টি দল যোগ হলে গ্রুপপর্ব আরও কম প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়বে।

অতিরিক্ত দলগুলো কারা হতে পারে? ২০২৬ সালের বাছাইপর্বের ফল অনুযায়ী ৬৪ দল হলে নতুন যেসব দেশ বিশ্বকাপে খেলত: এশিয়া থেকে—ইন্দোনেশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইউরোপ থেকে—ইতালি, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড। আফ্রিকা থেকে—নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, বুরকিনা ফাসো, গ্যাবন। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে—ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া। কনকাকাফ অঞ্চল থেকে—জ্যামাইকা, হন্ডুরাস, সুরিনাম। ওশেনিয়া থেকে—নিউ ক্যালেডোনিয়া।

এই তালিকায় ইতালি, ডেনমার্ক, নাইজেরিয়া কিংবা ক্যামেরুনের মতো শক্তিশালী দল থাকলেও, একই সঙ্গে এমন অনেক দলও রয়েছে যাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত।

এছাড়া কনফেডারেশনগুলোর মধ্যে ভারসাম্যও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার ১০ দলের মধ্যে ৯টি নকআউটে উঠেছিল। অন্যদিকে এশিয়ার ৯ দলের মধ্যে মাত্র ২টি এবং কনকাকাফের ৬ দলের মধ্যে মাত্র ৩টি গ্রুপ পার হতে পেরেছিল। ওশেনিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী নিউজিল্যান্ড একটি পয়েন্ট নিয়েই বিদায় নিয়েছিল। এই বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন, যদি সম্প্রসারণ করতেই হয়, তাহলে ইউরোপ ও আফ্রিকাকে তুলনামূলক বেশি অতিরিক্ত কোটা দেওয়া উচিত। কিন্তু তখন আবার অন্য মহাদেশগুলো বৈষম্যের অভিযোগ তুলবে।

সেক্ষেত্রে বিশ্বকাপ কি ধীরে ধীরে শুধু বড়সড় বাছাইপর্বে পরিণত হবে? এখন ফিফার সদস্য দেশ ২১১টি। ৬৪ দল হলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশ সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। সমালোচকদের মতে, তখন গ্রুপপর্বের গুরুত্ব কমে যাবে। অনেক ম্যাচই কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়াবে। আসল প্রতিযোগিতা শুরু হবে নকআউট থেকেই। ফলে বিশ্বকাপের ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আয়োজনের দিক থেকেও বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ৬৪ দল মানেই শুধু আরও ১৬টি দল নয়। এর অর্থ—আরও ২৪টি অতিরিক্ত ম্যাচ, অন্তত আরও ৫ দিনের টুর্নামেন্ট, আরও বেশি স্টেডিয়াম, আরও বেশি অনুশীলন মাঠ, হাজার হাজার অতিরিক্ত হোটেল কক্ষ, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসেবক, সম্প্রচার অবকাঠামো।

২০২৬ বিশ্বকাপ ৩৯ দিন ধরে চলেছে। ৬৪ দল হলে এটি প্রায় ৪৪-৪৫ দিনে পৌঁছে যেতে পারে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনও নতুন সমস্যা। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অনেক স্টেডিয়ামে ছাদ ছিল। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন টাইম জোনের কারণে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ধরে ম্যাচ আয়োজন সম্ভব হয়েছিল। ভবিষ্যতের আয়োজকদের সেই সুবিধা নাও থাকতে পারে। ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ দেখিয়েছে, দিনের বেলায় ম্যাচ আয়োজন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এ কারণে ২০৩৪ সালের সৌদি আরব বিশ্বকাপও সম্ভবত শীতকালে অনুষ্ঠিত হবে।

একসময় একটি দেশ সহজেই বিশ্বকাপ আয়োজন করত। কিন্তু এখন? ৪৮ দলই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ৬৪ দল হলে হয়তো একাধিক দেশের যৌথ আয়োজনই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হয়ে যাবে। সম্ভাব্য উদাহরণ হতে পারে—যুক্তরাজ্য ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া, পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশ, একাধিক আফ্রিকান দেশ, একাধিক এশীয় দেশ।

তাহলে কি আসল কারণ টাকা? অনেকের মতে, হ্যাঁ। ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বিশ্বকাপ। ২০১৭ সালে ফিফা হিসাব করেছিল ৪৮ দলের বিশ্বকাপ থেকে আয় হবে প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। পরে ফরম্যাট পরিবর্তন করে ম্যাচ বাড়ানোর পর ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে আয়ের পূর্বাভাস বেড়ে দাঁড়ায় ৯ বিলিয়ন ডলার।

৬৪ দল হলে—আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি টেলিভিশন স্বত্ব, আরও বেশি স্পনসর, আরও বেশি টিকিট বিক্রি, আরও বেশি বিজ্ঞাপন। অর্থাৎ আয়ও আরও বাড়বে। ইনফান্তিনো অবশ্য বলেন, এই অর্থ আবার ফুটবলের উন্নয়নেই ব্যয় করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা চার বছরে ৮ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নয়ন তহবিল পায়। ছোট দেশগুলো অতিরিক্ত অর্থও পায়। আঞ্চলিক কনফেডারেশনগুলোকেও উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি ডলার দেওয়া হয়। এই অর্থের বড় অংশই আসে বিশ্বকাপ থেকে।

৬৪ দলের বিশ্বকাপের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—আরও বেশি দেশকে বিশ্বমঞ্চে সুযোগ দেওয়া এবং ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক করা। অন্যদিকে বিপক্ষের যুক্তি—বিশ্বকাপের মর্যাদা, প্রতিযোগিতার মান, আয়োজনের জটিলতা এবং ম্যাচের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দশ বছরের নেতৃত্ব দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন, "বড় মানেই ভালো"।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বিশ্বকাপ কি এমন এক সীমায় পৌঁছাবে, যেখানে সম্প্রসারণ আর উন্নয়ন নয়, বরং ঐতিহ্য ও প্রতিযোগিতার মানকেই দুর্বল করে দেবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বিশ্ব ফুটবলের আগামী কয়েক দশকের ভবিষ্যৎ।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।