মেসি অবসর
লিওনেল মেসি: একবার কান্নায়, একবার গর্বে
অবিশ্বাস্য ১০ বছর

একই মানুষ। এলিয়েনও। ফুটবলের পিকাসো, ইয়েটসের কবিতা বা জেমস জয়েসের ইউলিসিসও। একই জার্সি, এক দশকে দুই ভিন্ন রূপ, দুটি বিদায়ের দৃশ্যও সম্পূর্ণ আলাদা। একবার তিনি বসেছিলেন মাটিতে, চোখে পানি, মুখে হতাশা। টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস। কয়েক মিনিট পর জানালেন, আর না! আর্জেন্টিনার হয়ে আর খেলবেন না। এসব ২০১৬ সালের কথা, দশ বছর আগের কথা।

দশ বছর পর আবারও মেসি দাঁড়ালেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে, একই পরিস্থিতি। তবে এবার চোখের জলের ভাষা ভিন্ন। এবার কোনো অপূর্ণতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন না। তার হাতে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকার দুটি ট্রফি, ফিনালিসিমা, অসংখ্য রেকর্ড। বাকি বলতে ছিল একটা সিদ্ধান্ত, বিদায়।
৩৯ বছর বয়সে লিওনেল মেসি জানিয়ে দিলেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা এবার সত্যি শেষ। কিন্তু এই শেষ বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে এক দশক আগের সেই রাতে, ২৯ বছরের মেসির কাছে। যার মনে হয়েছিল, জাতীয় দলের জার্সি তার জন্য অভিশাপ হয়ে গেছে।

২৬ জুন ২০১৬, নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম চিলি, ম্যাচের ১২০ মিনিটেও গোল নেই, দুই দলই ছুটছে ট্রফির দিকে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হবে টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার প্রথম শট নিতে এগিয়ে এলেন দলের সবচেয়ে বড় তারকা, লিওনেল মেসি। সারা পৃথিবী তাকিয়ে। কিন্তু বাঁ পায়ের সেই শট চলে গেল ক্রসবারের ওপর দিয়ে। মেসি মাথা নিচু করলেন।
চিলি জিতে যায় টাইব্রেকারে। মাঠে বসে তখন কাঁদছিলেন মেসি। এ শুধু ফাইনালের হার ছিল না। ছিল আরো একবার ভেঙে পড়ার মুহূর্ত। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হার। এবারও চিলি। দুই বছরে তিনটি বড় ফাইনাল, তিনবারই স্বপ্নভঙ্গ। পেনাল্টি মিসের গ্লানিসহ। ম্যাচ শেষে মেসি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন যা পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

‘মেসি ফুটবলের পিকাসো’

২৯ বছর বয়সে জাতীয় দল থেকে অবসর। কেন এতটা ভেঙে পড়েছিলেন মেসি? মেসির প্রথম অবসরকে শুধু পেনাল্টি মিসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ভুল হবে। সমস্যা ছিল আরও গভীরে। বার্সেলোনার হয়ে তিনি তখন পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের একজন। লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দেল রে, ক্লাব ফুটবলে একের পর এক শিরোপা তার হাতে উঠেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সি পরলেই গল্প বদলে যেত। বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার, আবার ফাইনাল হার। সাফল্যের বদলে তার নামের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছিল ‘ব্যর্থতা’ শব্দটি।
আর আর্জেন্টিনার মানুষের প্রত্যাশাও ছিল অস্বাভাবিক। কারণ তাকে তুলনা করা হতো বিশ্বকাপ এনে দেওয়া ১৯৮৬ সালের দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে। মেসির কাছেও একই প্রত্যাশা। সমালোচনার চাপ, ফাইনালে ব্যর্থতা, সব মিলিয়ে ২০১৬-এর সেই রাতে মেসি মনে করেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে তার গল্প এখানেই শেষ।
কিন্তু আর্জেন্টিনা মেসিকে যেতে দিল না। মেসির ঘোষণা আসতেই শুরু হলো অন্যরকম এক আন্দোলন। রাস্তায় মানুষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা। সমর্থকদের একটাই দাবি, ‘মেসি, যেও না।’ আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট থেকে সাধারণ সমর্থক, অনেকেই তাকে সিদ্ধান্ত বদলাতে অনুরোধ করেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেসির অন্তর্দ্বন্দ্ব। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার মন বদলাতে শুরু করে। বুঝলেন, জাতীয় দল ছেড়ে যাওয়া যত সহজ, দেশের জার্সি ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে ততই কঠিন।
শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের আগস্টে অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। ফিরলেন মেসি, এক ব্যর্থ খেলোয়াড় হিসেবে না, অসমাপ্ত গল্পের নায়ক হিসেবে। আর প্রত্যাবর্তনের পর বদলে গেল গল্প। ফিরে এসে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গোল করলেন। কিন্তু তার পথ ছিল আরও দীর্ঘ। কারণ তখন শুধু গোল করা না, নিজের এবং আর্জেন্টিনার গল্পই বদলে ফেলতে হবে তার। ২০২১ সালে সেই পরিবর্তনের প্রথম বড় মুহূর্ত এলো।

বাবার প্রতি মেসির চিঠি

কোপা আমেরিকার ফাইনাল, প্রতিপক্ষ ব্রাজিল, মারাকানা স্টেডিয়াম। ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা জিতে গেল। মেসি প্রথমবারের মতো সিনিয়র জাতীয় দলের বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা হাতে তুললেন। যে মানুষ পাঁচ বছর আগে কাঁদতে কাঁদতে জাতীয় দল ছেড়েছিলেন, সেই মানুষটা ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে। কান্না এবারও ছিল, তবে এই কান্না আনন্দের।
তারপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। শুরুতেই সৌদি আরবের কাছে পরাজয়। আবার প্রশ্ন, সন্দেহ, কিন্তু এবার মেসি থামলেন না। মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া—এক এক করে বাধা পেরিয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স।
আর সেই ফাইনাল? ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। মেসি দুই গোল করলেন। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে করলেন হ্যাটট্রিক। ১২০ মিনিট পরও সমতা, তারপর টাইব্রেকার। সেই টাইব্রেকার, ছয় বছর আগে মেসিকে কাঁদিয়েছিল। কিন্তু এবার মেসি নিজের শট জালে পাঠালেন। আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, মেসিও। ২০১৬-এর সেই অপমানের রাত যেন ছয় বছর পর গিয়ে শেষ হলো দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামে।

বিশ্বকাপের আগে ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। তারপর ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল, প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া। অতিরিক্ত সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের গোল, আর্জেন্টিনা আবার চ্যাম্পিয়ন। মেসি এবার এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেলেন, যেখানে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোই যেন ইতিহাসের কৌতুকে পরিণত হয়েছে। যে মানুষটির বিরুদ্ধে বলা হয়েছিল, ‘জাতীয় দলের হয়ে কিছুই জেতেননি’, সেই মেসিই হয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল প্রজন্মের নেতা।

অবসরের ঘোষণা দিলেন মেসি

২০২৬, শেষ বিশ্বকাপ। মেসির বয়স ৩৯। এবার আর কাউকে কিছু প্রমাণ করার ছিল না। তবু তিনি খেললেন, আর্জেন্টিনাকে নিয়ে পৌঁছালেন বিশ্বকাপের ফাইনালে, প্রতিপক্ষ স্পেন। কিন্তু এবার আর বিশ্বকাপ তার হাতে উঠল না। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা হেরে গেল ১-০ ব্যবধানে। কয়েক বছর আগে যে মেসি ফাইনালে হেরে অবসর নিয়েছিলেন, এবারও তিনি ফাইনালে হেরে মাঠ ছাড়লেন।
কিন্তু পার্থক্যটা বিশাল। ২০১৬ সালে তার মনে হয়েছিল, তিনি কিছুই করতে পারেননি জাতীয় দলের জন্য। ২০২৬ সালে তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল পরিপূর্ণ ক্যারিয়ার। সবচেয়ে বড় কথা, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার অসমাপ্ত বলে কিছু আর নেই।
২০১৬ সালে মেসির অবসর ছিল আবেগের সিদ্ধান্ত। ২০২৬-এর সিদ্ধান্ত অনেক বেশি পরিণত। তিনি জানতেন, বয়স থেমে থাকে না। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা উঠে আসছে। জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ এখন তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সময়। ৩১ আগস্ট ২০২৬ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা আবেগঘন বার্তায় মেসি তার সিদ্ধান্ত জানান। কয়েক দিন ধরে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার পর অবশেষে তিনি প্রকাশ্যে বললেন, এবার সত্যিই শেষ। তার বিদায়ের পেছনে ব্যক্তিগত আবেগও ছিল প্রবল। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর সিদ্ধান্তটি তার মনে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর বাবার মৃত্যু তার জীবনের এই সময়কে আরও কঠিন করে তোলে।

তবে এবার তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন না। কোনো ব্যর্থতা থেকে নয়, কোনো অভিমান থেকে নয়, বরং সবকিছু জিতে। ২০১৬-এর মেসি জাতীয় দল ছাড়ছিলেন হার নিয়ে। ২০২৬-এর মেসি জাতীয় দল ছাড়লেন ইতিহাস নিয়ে।
২০১৬ সালে তিনি ভাবছিলেন, আর্জেন্টিনার মানুষ হয়তো তাকে ক্ষমা করবে না। ২০২৬ সালে পুরো আর্জেন্টিনা জানে, তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি লিখেছেন এই মানুষ। ২০১৬ সালে তিনি বলেছিলেন, আর পারবেন না। কিন্তু ফিরে এসে তিনি যা করলেন, সেটাই হয়তো তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় উত্তর।
২০১৬ সালে যে মেসি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘এবার শেষ’, তিনি আসলে তখনও শেষ হয়ে যাননি। লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনাকে দিতে চেয়েছিলেন একটি ট্রফি। শেষ পর্যন্ত দিয়ে গেলেন একটি যুগ।


রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
খেলার দেশ বিশেষদেউলিয়া থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগের স্বপ্ন
খেলার দেশ বিশেষ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ মোহাম্মদ আলি
খেলার দেশ বিশেষফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল
খেলার দেশ বিশেষবলবয় ফেদেরার থেকে টেনিস কিংবদন্তি
খেলার দেশ বিশেষযে গল্পের নাম ‘নেইমার’
খেলার দেশ বিশেষ

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।