খেলারদেশ

নেইমারের অবসর

যে গল্পের নাম ‘নেইমার’

ব্রাজিলের সরু গলি থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়ক হয়ে ওঠা নেইমার জুনিয়র। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ব্রাজিল ফুটবলের মুকুটবিহীন রাজা বা কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যিনি। তবে কি সত্যিই নেইমারকে আর হলুদ জার্সিতে দেখা যাবে না?

যে গল্পের নাম ‘নেইমার’

যে গল্পের নাম ‘নেইমার’ : মুকুটহীন রাজার অবসর

রনক জামান
By রনক জামান

নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র। নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে এক জাদুকরী ফুটবলারের মুখ। যার দুই পায়েই সমান দক্ষতায় অসাধারণ ড্রিবলিং, গতি এবং দুর্দান্ত গোল করার ক্ষমতার কারণে বিশ্বজুড়ে এক নামে প্রশংসিত। মাঠে মনোমুগ্ধকর শৈল্পিক খেলা, ব্রাজিলীয় ফুটবলশৈলীতে কোটি কোটি ভক্তকে মুগ্ধ করেছেন গত দেড় যুগ। আধুনিক ফুটবলে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সাম্বা ঘরানা ও নান্দনিক খেলার (জোগো বনিতো) শেষ বাহক হিসেবেও বিবেচনা করা হয় নেইমার জুনিয়রকে।

Image

কিন্তু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নরওয়ের সঙ্গে ম্যাচে বিদায় পর অবসরের ইঙ্গিত দিলেও, এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নেইমার জুনিয়র শেষমেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেবার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ব্রাজিল দলের হয়ে তার ১৬ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি ঘটল। ৪টি বিশ্বকাপে ৯ গোলসহ, ১৩০ ম্যচে পেলের রেকর্ড ভেঙে ৮০ গোল করে তিনি ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করলেন।

তার ঝুলিতে রয়েছে ক্লাব পর্যায়ের সর্বোচ্চ সব ট্রফিসহ ব্যালন ডি’অরে তৃতীয় ও দশম স্থান, সান্তোসে থাকাকালে পুসকাস এওয়ার্ড, ১৯ বছর বয়সে ২০১১ এবং ২০১২ সালে দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলার, তিন মহাদেশে করা ১০০ গোলের মাইলফলকসহ ব্যক্তিগত অনেক অর্জন।

জাতীয় দলকেও ২০১৬ সালে এনে দেন প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণপদক, ২০১৩ সালে দুর্দান্ত সেই স্পেনকে একাই হারিয়ে জেতান কনফেডারেন্স কাপ। তবে নেইমারের গল্প পরিসংখ্যানেই শেষ হবার না।

নেইমারের পিতৃভিটা

নেইমারের পিতৃভিটা

নেইমারের গল্প ব্রাজিলের ফুটপাত থেকে শুরু

ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা, বার্সেলোনা ও পিএসজির হয়ে অসংখ্য শিরোপাজয়ী এবং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা প্রতিভা নেইমার জুনিয়র। কিন্তু তার বিশ্বজোড়া খ্যাতির যাত্রা কোত্থেকে শুরু হয়েছিল? কীভাবে রাস্তার ফুটবল খেলা এক কিশোর পরিণত হন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় আইকনে?

নেইমার জুনিয়রের গল্পের শুরু কোনো আধুনিক ঘাসে মোড়ানো নিখুঁত ফুটবল মাঠে না। তার যাত্রা শুরু হয় ব্রাজিলের অগণিত শিশুর মতো, রাস্তার ফুটবল দিয়ে। ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তিই হলো এই রাস্তার ফুটবল। সরু গলি, অসমান মাটি আর অনিশ্চিত পরিবেশে খেলতে খেলতেই ছোটরা গড়ে তোলে অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীলতা ও মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

এই পথ ধরেই নিজেদের কিংবদন্তি ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়েছিলেন পেলে, গারিঞ্চা, রোনালদিনিয়ো ও রোনালদো নাজারিওসহ অনেক সেলেসাও কিংবন্দন্তি। সেই একই পথেই যাত্রা শুরু হয়েছিল নেইমার জুনিয়রের। যে পথচলা তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে। ইঞ্জুরি-লড়াইয়ে অবিরাম উত্থান-পতনের ক্যারিয়ারে ভক্তদের ভালোবাসাও ছিল সব সময় অটল, অনড়।

আর ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল দলে ডাক পাওয়ার মাধ্যমে আবার প্রমাণিত হয়, তার গল্প তখনও শেষ হয়ে যায়নি—যতক্ষণ না অবসরের ঘোষণা দিয়েই বসলেন।

ব্রাজিলে প্রতিটি শিশুই খুব ছোটবেলা থেকে রাস্তার ফুটবল খেলতে শুরু করে। এটা আমাদের রক্তে মিশে আছে।

রোনালদো নাজারিও

ব্রাজিলের রাস্তায় ফুটবল পায়ে শিশুরা, চিরাকালীন চিত্র

ব্রাজিলের রাস্তায় ফুটবল পায়ে শিশুরা, চিরাকালীন চিত্র

নেইমার জুনিয়র যে এলাকায় বড় হয়েছেন, তা ব্রাজিলের ফাভেলা নিয়ে প্রচলিত ‘ভয়ংকর’ বা অপরাধপ্রবণ এলাকার চিরাচরিত ধারণার সঙ্গে মেলে না। বরং তার শৈশবের মহল্লার রাস্তাগুলো ছিল প্রাণচঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির নিজস্ব উচ্ছ্বাস-ভরপুর।

সেই অলিগলিই শিশুদের হাসি, ফুটবলের শব্দ আর স্বপ্নের মিলনস্থল। প্রতিটি গলি যেন একেকটি ফুটবল মাঠ, সৃজনশীলতার আঁতুড়ঘর, আনন্দ আর কৌশলের অনুশীলন চলা প্রতিদিনের চেহারা। এরকম পরিবেশেই জন্ম নেন ‘ব্রাজিলিয়ান ম্যাজিক’ পেলে—যার খেলা শুধু খেলা না, ব্রাজিলের ফুটবল পরিচয়েরই প্রতীক। আর সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছিলেন নেইমার জুনিয়রও। পায়ের জাদু যার শুরু থেকেই মুগ্ধ করে এসেছে পুরো বিশ্বকে, কোটি কোটি ফুটবলভক্তকে।

খালি পায়ে ছুটে চলা শিশুরা আধা-চুপসে যাওয়া একটা বল নিয়ে যে রাস্তার মাঝে ফুটবল খেলে ব্রাজিলের শিশুরা, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট্ট শিশুটিও এমন দক্ষ, যা অনেক ফুটবলারের পক্ষে কোনোদিন অর্জন করাও সম্ভব হয় না। এই রাস্তাগুলো জীবন্ত, বাস্তব—আর এখানেই নেইমার শিখেছেন বলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে, ড্রিবলিংয়ের জাদু রপ্ত করতে এবং স্বপ্ন দেখতে। বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে যে নেইমারকে আজ সবাই চেনেন, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই জীর্ণ অথচ অসাধারণ রাস্তাগুলোতেই।

বাবার সঙ্গে নেইমার

বাবার সঙ্গে নেইমার

“আমরা যখন থাকতাম তখন এই এলাকাটা তখন এতটা উন্নত ছিল না। খুবই নিম্ন আয়ের মানুষের এলাকা ছিল। বিশাল ময়লার ভাগাড়ও ছিল এখানে, পুরো শহরের আবর্জনা ফেলা হতো যেখানে। খুব বেশি আগের কথা না, ২০০০ সালের দিকেই। নেইমার পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগ পর্যন্ত, ২০০৮ সাল পর্যন্ত এখানেই ছিলাম। এই সমাজের অংশ হিসেবেই আমরা বড় হয়েছি। মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামও খুব কাছ থেকে দেখেছি।”

নেইমারের বাবা নেইমার সিনিয়র স্মৃতিচারণ করে বলেন

পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট নেইমি

পরিবারের সঙ্গে ছোট্ট নেইমি

নেইমার জুনিয়রের শৈশবের বাড়িটি আজও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে প্রোজেতো ইনস্টিটুতো নেইমার জুনিয়র-এর ঠিক পেছনের একটি শান্ত গলিতে। কয়েক ব্লক দূরেই ছিল পুরোনো ময়লার ভাগাড়। আশপাশের সাধারণ বাড়িগুলোর ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ে না। অবাক করা বিষয়, বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়ার পরও বাড়িটিতে নেই কোনো স্মারক, নেই কোনো পতাকা, এমনকি নেইমারের স্মরণে কোনো বিশেষ চিহ্নও নেই।

Image

এলাকাটি এখন আর জরাজীর্ণ না। বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও উঁচু উঁচু ভবনে এক বিশৃঙ্খল শহর, অথচ এখনো প্রাণবন্ত। বিকালের সোনালি-ধুলামাখা আলো যেন পুরো প্রাইয়া গ্রান্দে শহরকে ঢেকে রাখে। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সবুজ অরণ্য আর সাও পাওলো থেকে নেমে আসা উপত্যকার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে বেড়ে উঠেছিলেন নেইমার।

এরপর কীভাবে প্রাইয়া গ্রান্দের রাস্তায় বেড়ে ওঠা ছোট্ট এক ছেলে একদিন বার্সেলোনা, পিএসজি এবং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বড় স্টেডিয়ামের নায়ক হয়ে উঠলেন?

শৈশবে নেইমার

শৈশবে নেইমার

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় তার শৈশবে। নেইমারের বাবা নেইমার সিনিয়র বলেন, “খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা তাকে এমনভাবে বড় করেছি, যাতে সে নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করতে পারে। আমরা সব সময় তার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই এগিয়েছি।”

Image

তিনি আরও জানান, “নেইমারের সঙ্গে আমার প্রথম চুক্তি হয়েছিল যখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। ওটা মূলত তরুণ খেলোয়াড়ের প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত চুক্তি ছিল। কিন্তু তখনই আমি প্রথম উপলব্ধি করি, সে একদিন ফুটবলকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেবে।” নেইমারের বাবা শৈশবের কথা স্মরণ করে আরো বলেন,

সে ছিল অন্য সব শিশুর মতোই এক হাসিখুশি। ভীষণ সরল, প্রাণবন্ত এবং সব সময় মজা করতে, খেলতে ভালোবাসত—যদিও তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিল একটি ফুটবল। আমি আর আমার স্ত্রী সব সময় চেয়েছি, নেইমার ও তার বোন যেন স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে এবং নিজেরাই সুখী হওয়ার পথ বেছে নিতে পারে। তাই ছোটবেলায় নেইমার কখনো সুপারম্যান হতে চাইত, কখনো পাওয়ার রেঞ্জার। সে ভীষণ চঞ্চল ছিল। সত্যি বলতে, আজও ঠিক তেমনই আছে!

বাবার ক্লাবে ফুটবল হাতে ছোট্ট নেইমার

বাবার ক্লাবে ফুটবল হাতে ছোট্ট নেইমার

অন্য সব শিশুর মতোই ছোটবেলায় নেইমার জুনিয়রের কল্পনার জগৎ ছিল সীমাহীন। তবে একটা পার্থক্য ছিল, যখনই তার পায়ে ফুটবল উঠত তখনই ফুটে উঠত অনন্য এক প্রতিভা, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করত। মাত্র তিন বছর বয়সেই বলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব শুরু। অল্প বয়সে হাঁটা বা কথা বলা শেখার মতোই ফুটবলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে পরিণত হয়েছিল। বল নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য আর গতি যেন তার শরীরেরই অংশ হয়ে গিয়েছিল।

নেইমারের প্রথম কোচ বেতিনিয়ো

নেইমারের প্রথম কোচ বেতিনিয়ো

নেইমারের প্রতিভাকে সবার আগে যিনি চিনতে পেরেছিলেন, তিনি নেইমারের প্রথম কোচ বেতিনিয়ো। যিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন,

প্রথমবার আমি নেইমারকে খেলতে দেখি ১৯৯৮ সালে, সাঁও ভিসেন্তেতে একটি বিচ সকার ম্যাচে। তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। আমি দেখলাম, ছোট্ট একটি ছেলে গ্যালারির মাঝ দিয়েই দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তার অসাধারণ দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা এবং শরীরের ভারসাম্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ওই জায়গায় সামান্য ভুল করলেই গুরুতর চোট লাগতে পারত, কিন্তু সে অবিশ্বাস্য সহজতায় সবকিছু সামলে নিচ্ছিল।

নেইমার জুনিয়রের প্রতিভার পেছনে তার বাবা, সাবেক ফুটবলার নেইমার সিনিয়রের প্রভাব অবশ্যই ছিল। তবে শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, ফুটবলের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাকে আজকের নেইমারে পরিণত করেছে। নেইমার সিনিয়র বলেন,

ফুটবল মাঠই নেইমার জুনিয়রের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাকে যদি একটা মাঠ আর একটা ফুটবল দেওয়া হয়, সে মুহূর্তেই খুশি হয়ে যাবে। ব্রাজিলে থাকুক বা বার্সেলোনায়, কোনো পার্থক্য নেই। মাঠেই নিজের সত্যিকারের আনন্দ খুঁজে পায় সে। আর আমরা সব সময় চেষ্টা করি, যতটা সম্ভব তার পাশে থাকতে।

ফুটবলের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই নেইমার চালু করেছিলেন পাঁচজনের ফুটবলের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ‘নেইমার জুনিয়র’স ফাইভ’। প্রথম আসরেই বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় প্রায় ১০ হাজার দল এবং ৬৫ হাজারেরও বেশি খেলোয়াড়। টুর্নামেন্টের বিশ্ব ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটুতো নেইমার জুনিয়র-এ।

‘জিঙ্গা’—ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ছন্দ

Image

নেইমারকে ফুটবল তারকা খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির অবদানও অপরিসীম। তার প্রথম কোচ বেতিনিয়োর মতে, নেইমার খেলেন ‘জিঙ্গা’-র ছন্দে। জিঙ্গা হচ্ছে ব্রাজিলীয় ফুটবলের অনন্য পরিচয়। এ শুধু খেলার ধরন না, বরং শরীরের ছন্দ, সৃজনশীলতা, তাল-লয়, কৌশল এবং প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার সহজাত ক্ষমতার সমন্বয়। বেতিনিয়ো বলেন,

আমি যত ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, তাদের কারও মধ্যে নেইমারের মতো গুণ দেখিনি। সে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে নড়াচড়া করে। এটাই ‘জিঙ্গা’। তার শারীরিক গঠন তাকে প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিতে, ড্রিবল করতে এবং শরীরের অসাধারণ ভারসাম্য ব্যবহার করতে সাহায্য করে। এই বিশেষ গুণটা তার মধ্যে জন্মগত। এটা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলেরই অংশ—যেন প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানের রক্তে মিশে থাকা এক স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

Image

নেইমার জুনিয়রকে আলাদা করে তোলে শুধু তার ফুটবল প্রতিভা নয়। বরং নিজের শেকড়ের সঙ্গে অটুট সম্পর্কও। বিশ্বজোড়া খ্যাতি, অর্থ আর সাফল্য পাওয়ার পরও তিনি পরিবার, বন্ধু এবং বেড়ে ওঠার এলাকার মানুষের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি।

নেইমারের প্রথম কোচ বেতিনিয়ো বলেন, “আমাদের ‘ইনস্টিটুতো প্রোজেতো নেইমার জুনিয়র’-এর মূল মূল্যবোধ হলো সম্মান, দলগত কাজ এবং একে অপরকে ভালোবাসা। নেইমার সব সময়ই এই মূল্যবোধগুলো নিজের জীবনে ধারণ করেছে।”

এই বিশ্বাস থেকেই নেইমার নিজের শৈশবের এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রোজেতো ইনস্টিটুতো নেইমার জুনিয়র। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু ফুটবলার তৈরি করা নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও পরিবারের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা।

এ প্রসঙ্গে নেইমারের বাবা বলেন, “নেইমার চেয়েছিল এই এলাকার মানুষদের কিছু ফিরিয়ে দিতে। যেখানকার মানুষদের সঙ্গে সে বড় হয়েছে, তাদের জীবনযাত্রার বাস্তবতা একটু হলেও বদলে দিতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে তুলতে সে এই উদ্যোগ নিয়েছে।”

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হওয়ার পরও নেইমারের কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু ট্রফি বা ব্যক্তিগত অর্জন নয়। নিজের শিকড়কে স্মরণ রাখা, তাই তার প্রতিষ্ঠিত এই ইনস্টিটিউট আজ হাজারো শিশুর জন্য নতুন স্বপ্ন দেখার একটি ঠিকানা হয়ে ওঠে।

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে প্রত্যাবর্তন

Image

২০১৪ বিশ্বকাপ। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে মেসির গোলসংখ্যা যখন ১টি। তখন ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই গোলসংখ্যা ২।

এরপরের ইতিহাস সবার জানা। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার খেলোয়াড় জুনিগার পাশবিক ফাউলটাই যেন নেইমারের ক্যারিয়ারের প্রায় ইতি টেনে দেয়। নেইমার তবু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন বহুবার। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো গোল করেও দলকে জেতাতে পারেননি। এছাড়াও একের পর এক ইঞ্জুরি তার পিছু ছাড়েনি। যার প্রভাব পড়ে তার আকাশছোঁয়ার সম্ভাবনায়, স্বপ্নে।

২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো গোল

২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে চোখ ধাঁধানো গোল

তবু ২০২৬ সালের মে মাসে সান্তোসের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ব্রাজিল জাতীয় দলে আবারও ডাক পান নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, “নেইমারের ক্ষেত্রে আমাদের শুধু তার শারীরিক অবস্থার মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ তার প্রতিভা নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।”

বিশ্বকাপের মঞ্চে নেইমারের চতুর্থবারের মতো যোগ দেন। চার বিশ্বকাপে গোল করে পেলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। হেক্সা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা নেইমার রাউন্ড অব ১৬-তে বিদায় নিয়ে যেন ভক্তদেরও মন ভেঙে দিলেন ‘এখানেই শেষ’ বার্তায়। এবার তো অফিসিয়ালিই বলে দিলেন, ব্রাজিলের জার্সিতে খেলার ইচ্ছা তার আর নেই।

প্রাইয়া গ্রান্দের ধুলোমাখা রাস্তায় খালি পায়ে ফুটবল খেলতে শুরু করা যে ছেলেটির স্বপ্ন একদিন বিশ্বজয়ের ছিল, সেই গল্পটি কি এখানেই ফুরিয়ে যাবে? অবসরের ঘোষণা তো পেলেও দিয়েছিলেন ১৯৬২ সালে প্রতিপক্ষের একের পর এক কঠিন আঘাতে ইঞ্জুরিতে পড়ে। দিয়েছিলেন মেসিও। কিন্তু আবার ফিরে আসেন তারা। জয় করেন বিশ্বকাপ শিরোপা। ভক্তরা কি নেইমারের ক্ষেত্রেও সেরকম আশা রাখছেন এখনো?

এখনো আশা আছে?

Image

যদিও তার অবসর নিয়ে ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক মার্সেলো বেখলার মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেইমার হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতেও পারেন। বেখলার বলেন, বর্তমানে নেইমার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

আমার মনে হয়, সে এখন হতাশ এবং ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে। এই মুহূর্তে সে নিরুৎসাহিত। তবে কিছুদিন পর যখন সবকিছু শান্ত হবে, বিশ্বকাপের হতাশা কেটে যাবে, তখন হয়তো সে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। যদি সে আবার ভালো খেলতে শুরু করে এবং ফুটবলে আনন্দ পায়, তাহলে হয়তো বলবে—‘আরও দুই বছর খেলি, কোপা আমেরিকায় অংশ নিই।’ এরপর আবার বলতে পারে—‘আরও দুই বছর দেখি, কত দূর যেতে পারি। এটা তখনই সম্ভব, যখন সে সত্যিই ফুটবলে নিজের খেলার আনন্দে থাকবে। আর হয়তো সেটা সান্তোসে সম্ভব হবে না। এত চাপ, এত সমালোচনা...যদি সে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলে, তাহলে তার সুযোগ বেশি থাকবে। সেখানে এত চাপ নেই, অনুশীলন কেন্দ্রে ভক্তদের ভিড় নেই, গ্যালারির দর্শকদের সঙ্গে তর্কেও জড়াতে হবে না। জাতীয় দল নিয়ে সে দুঃখিত, হতাশ এবং বিশ্বকাপের ব্যর্থতার রেশ এখনো কাটেনি। এই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে। এই মুহূর্তে পরবর্তী বিশ্বকাপ অনেক দূরের বিষয়। আমরা বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী মেসি এবং ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেখেছি। তারা নিজেদের শরীরের দারুণ যত্ন নিয়েছে, চোটও তুলনামূলক কম পেয়েছে, তবুও বিশ্বকাপে তাদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। মেসির জন্য পুরো দলকে সাজানো হয়েছিল, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানোর ক্ষেত্রে তা হয়নি। তবে কোপা আমেরিকায় খেলা, আবার জাতীয় দলের পরিবেশে ফেরা এবং তিক্ত এক সমাপ্তির বদলে সুন্দরভাবে বিদায় নেওয়া—এসবের অংশ হওয়ার সুযোগ এখনো তার আছে বলে আমি মনে করি।

সাংবাদিক মার্সেলো বেখলার

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।