খেলারদেশ

পর্ব-১

ফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল

কিছু দলবদল শুধু ক্লাব বদলের ঘটনা হয়ে থাকে, আর কিছু দলবদল হয়ে ওঠে সমর্থকদের আবেগ, রাগ ও ক্ষোভের কারণ।

ফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল

ম্যান ইউ থেকে সিটিতে যোগ দেয়ার পর ম্যানচেস্টার ইজ ব্লু বিলবোর্ড প্রকাশ করেছিলো ম্যান সিটি

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

বিশেষত গ্রীষ্মকালীন ট্রান্সফার উইন্ডো, জুলাই, আগস্ট ও কিছুটা সেপ্টেম্বর। ক্লাব ফুটবলে নতুন মৌসুমকে ঘিরে প্রতিটা দল নিজেদের স্কোয়াড সাজাতে ব্যস্ত থাকে। স্বভাবতই এখন খেলোয়াড়দের দল বদলের হিড়িক চলছে।

দল বদলের কারণ-অকারণ

ক্লাব ফুটবলে ঋতুগত দল বদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তা হোক বাই-ব্যাক ক্লজ জুড়ে দিয়ে বা পুরোপুরি কেনাবেচার মাধ্যমে বা লোন স্পেলের মাধ্যমে, সবাই জানেন। এও জানেন, এক ক্লাব ছেড়ে অন্য ক্লাবে ফুটবলাররা যায়—কখনো বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের আশায়। যেমন- অস্কার (ব্রাজিল, চেলসি)। কখনো নতুন ক্যারিয়ারে নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে, এই খোঁজে ক্লাবই না, লিগই বদলে ফেলেন (এন্দ্রিক বা নিকো পাজ এর স্বার্থক উদাহরণ)। কখনো ক্যারিয়ারের উন্নতি ও বড় সাফল্যের আশায় দল বদল করেন। যেমন- হ্যারি কেইন (টটেনহ্যাম থেকে বায়ার্ন মিউনিখ)।

এক ক্লাব ছেড়ে অন্য ক্লাবে ফুটবলাররা যায়—কখনো কোচ বা ক্লাবের সঙ্গে বনিবনাজনিত কারণে। কখনো ড্রেসিংরুম পলিটিক্স ও পরিবেশের কারণে। কখনো অন্য ক্লাব থেকে আসা প্রস্তাবে বেশি গুরুত্ব পাবার আশ্বাসে। কখনো নতুন কোচের ফুটবল দর্শন ও নিজের খেলার ধরনে পার্থক্য বেশি হলে বা নতুন কোচের পরিকল্পনায় নিজের ভূমিকা সন্তোষজনক মনে না হলে।

Image

সম্প্রতি আলোচিত রদ্রির বার্সায় যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কারণ হিসেবে জানান, বার্সেলোনার খেলার ধরন ও ফুটবল দর্শন তার খেলার ধরনের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই। আরেকটা কারণ বলেন, স্পেন জাতীয় দলের সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো এমন খেলোয়াড়ও বার্সাতে বেশি। সতীর্থদের মধ্যে এবং কোচ-খেলোয়াড়দের মধ্যে যোগাযোগ, সুবিধাজনক পরিবেশ, সম্পর্ক, যোগাযোগ ও বোঝাপড়া। বার্সেলোনা থেকে ইন্টার মায়ামিতে মেসির সতীর্থ হিসেবে লুইস সুয়ারেজ, রদ্রিগো দে পল, সার্জিও বুসকেতস, জর্দি আলবার যোগ দেয়া এই কারণেই। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে যোগ দেন কাসেমিরো, রাফায়েল ভারান। এরকম আরো আছে। যাই হোক, রদ্রি আরেকটি কারণ হিসেবে বার্সায় পেপ গার্দিওলার দর্শন ও ডিএনএ-র কথা বলেন। যার অধীনে রদ্রি বছরের পর বছর খেলেছেন, বিশ্বসেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হয়েছেন, সেই গার্দিওলার ফুটবল দর্শনের পুরোটা জুড়েই বার্সেলোনার ঐতিহ্য। ফলে রদ্রি ক্যাম্প ন্যু-কেই ঠিকানা করতে চাইছেন। কোচ-খেলোয়াড় সম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে, পেপ গার্দিওলা ও থিয়াগো আলকানতারা মানিকজোড় ক্লাব ফুটবল ভক্তদের মাঝে পরিচিত ও আলোচিত। এছাড়া কার্লো আনচেলত্তি এবং হামেস রদ্রিগেস ও রিচার্লিসন; এরিক টেন হ্যাগ এবং এন্তোনি ও লিসান্দ্রো মার্তিনেস; আন্তোনিও কন্তে এবং লুকাকু; মাউরিজিও সারি এবং জর্জিনহো ও গঞ্জালো হিগুয়েন।

উদাহরণ বলছে

অর্থাৎ কোচের সঙ্গে বোঝাপড়া দল বাছাই করতে, যোগ দিতে বা ছাড়তে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক খেলোয়াড় কোচের পরিকল্পনায় বদলি খেলোয়াড় হয়ে মৌসুমের পর মৌসুম শুধু বেঞ্চে বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে দল বদলান। প্লেটাইমের লক্ষ্যে দল বদলান। এছাড়া একই পজিশনে বেশি খেলোয়াড় থাকায় বা নতুন খেলোয়াড় যোগ দেয়ায় একাদশে সুযোগের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বা প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকে দল বদলান।

Image

স্বাভাবিকের চাইতে একমাত্রা উপরে আছে স্কোয়াডে নিজের গুরুত্ব ও রোলের পরিবর্তন। উঠতি তারকা হলে, খ্যাতি বাড়ার সাথে সাথে বেতন-বোনাস-গুরুত্ব নিয়ে খেলোয়াড় ও দলের সম্পর্কের ওঠানামাও কাজ করে এই ক্ষেত্রে। একদিকে যেমন চুক্তি শেষে ক্লাব নিজেই খেলোয়াড়কে ফ্রি এজেন্ট হিসেবে ছেড়ে দেয়। এরই অপর পিঠে দেখা মেলে মহাতারকাদের মহাদাবি। নিজেকে কেন্দ্র করে দলের খেলার ধরন তৈরি করে নেন অনেকেই। রোনালদো, মেসি ও পরবর্তী বিখ্যাত নামগুলো এবং যারা এই নামের তালিকায় যোগ হবেন। এই প্রবণতা ফুটবলের মতো কঠিন জায়গায় নিজের স্বার্থেই রাখতে হয়। সম্প্রতি ভিনি ও রিয়াল মাদ্রিদের চুক্তির সঙ্গে এমবাপ্পের চুক্তির কী সম্পর্ক ছিল? কিন্তু ভিনি-রিয়াল চুক্তিতে এমবাপ্পের চুক্তি অর্থবোধক ছিল। কারণ, দলে কে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকটা চুক্তিপত্রই নির্ধারণ করে দেয়। সুতরাং ভিনির দাবি ও ক্লাবের অফার নিয়ে পার্থক্য-হেতু গত কয়েকমাস 'ভিনি-রিয়াল-আর্সেনাল' গুঞ্জন ছিল সংবাদমাধ্যমে অন্যতম আলোচিত বিষয়।

চিলির ফুটবল বোর্ডের নিয়ম, খেলোয়াড়দের জার্সিতে তাদের সরকারি বা বংশপদবি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক

চিলির ফুটবল বোর্ডের নিয়ম, খেলোয়াড়দের জার্সিতে তাদের সরকারি বা বংশপদবি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক

কিছু দলবদল শুধুই ক্লাব বদলের ঘটনা। আবার কিছু দলবদল আইন বা নিয়ম বদলানোর উদাহরণ হয়ে ওঠে। এই যেমন চিলির ফুটবল বোর্ডকে জার্সিতে ডাকনাম রাখার কঠোর আইন বদলাতে হলো কেপ ভার্দের ফুটবল তারকা ভোজিনিয়ার কারণে।

আবার এই দল বদলই কখনো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক খেলার অংশ। পর্তুগিজ ফুটবল মহাতারকা লুইস ফিগোর ফুটবল ইতিহাসকে নাড়িয়ে দেয়া দল বদলের ঘটনাটি জগত-বিখ্যাত। সুতরাং সব দলবদলের ঘটনা ও গভীরতা ও পেছনের গল্প সমান না। কিছু দলবদল ভক্ত-সমর্থকদের আবেগ, রাগ ও ক্ষোভের কারণ হয়ে থাকে।

বিশেষ করে যদি তা হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোতে। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের মধ্যে দলবদল এতটাই স্পর্শকাতর ব্যাপার যে, সমর্থকরা একে সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখেন। এর প্রভাব মাঠ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাইরেও, তুমুল উত্তেজনায়, সমালোচনায়।

ক্রিস্তিয়ান গ্যাব্রিয়েল 'কুটি' রোমেরো (সেন্টার-ব্যাক)

ক্রিস্তিয়ান গ্যাব্রিয়েল 'কুটি' রোমেরো (সেন্টার-ব্যাক)

সম্প্রতি টটেনহ্যামের অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে নিয়ে আর্সেনালের আগ্রহের খবর প্রকাশ্যে আসে। এতে ইংলিশ ফুটবলে নতুন করে সেই পুরোনো বিতর্ক সামনে এসেছে। টটেনহ্যাম থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরের আর্সেনালে রোমেরোর যাওয়া হলে তা নিঃসন্দেহে দুই ক্লাবের সমর্থকদের কাছে বড় ধাক্কা হবে।

তবে টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে আর্সেনালে যাওয়ার ঘটনা ফুটবলে নতুন না। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে সরাসরি যোগদানের ইতিহাসে এর চেয়েও বিস্ময়কর ও চোখ ছানাবড়া করা ঘটনাও ঘটেছে অনেক। তার কিছু বিখ্যাত উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল

সল ক্যাম্পবেল: দলবদলের খবর জানাজানি হলে লন্ডনে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে, এই ভয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগতেন

সল ক্যাম্পবেল: দলবদলের খবর জানাজানি হলে লন্ডনে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে, এই ভয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগতেন

সল ক্যাম্পবেল: টটেনহ্যাম ⭢ আর্সেনাল (২০০১)

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং জঘন্যতম দলবদল হিসেবে পরিচিত এই ঘটনা। ইংলিশ তথা ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত দলবদলের তালিকা করলে সবার আগে আসবে সল ক্যাম্পবেলের নাম। টটেনহ্যাম একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন ক্যাম্পবেল। ছিলেন স্পার্সের অধিনায়ক। ১৯৯৯ সালে তার নেতৃত্বেই টটেনহ্যাম জিতেছিল লিগ কাপ। ক্লাবটির হয়ে ৩০০টির বেশি ম্যাচও খেলেছেন তিনি।

২০০১ সালে চুক্তি শেষ হওয়ার পর বিনা ট্রান্সফার ফিতেই ক্যাম্পবেল যোগ দেন আর্সেনালে। দুই ক্লাবের দূরত্ব মাত্র কয়েক মাইল হলেও ফুটবলীয় সম্পর্কের দিক থেকে এটা ছিল বিশাল লং জাম্প।

টটেনহ্যাম সমর্থকেরা বিষয়টা মোটেও ভালোভাবে নেননি। উত্তর লন্ডনের দুই প্রতিবেশী ক্লাবের তীব্র দ্বৈরথের মাঝে ক্যাম্পবেলের এমন সিদ্ধান্ত সমর্থকদের কাছে রাতারাতি স্পার্সের কাণ্ডারি থেকে 'জুডাস' বা বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করে। অথচ ইউরোপের বড় বড় ক্লাব যেমন বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান তাকে নিতে আগ্রহী ছিল। তবে তিনি আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার ও তৎকালীন ভাইস-চেয়ারম্যান ডেভিড ডেইনের সাথে গভীর রাতে গোপনে বৈঠক করে চুক্তি সম্পন্ন করেন। দলবদলের খবর জানাজানি হলে লন্ডনে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে, এই ভয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগতেন ক্যাম্পবেল।

অনেকের ধারণা, বেশি টাকার লোভেই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে ভিড়েছেন তিনি। অথচ ক্যাম্পবেল স্পার্স ছেড়ে ইন্টার মিলান বা বার্সেলোনায় যোগ দিলে আর্সেনালের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ বা সাইনিং বোনাস পেতেন। তিনি ইংল্যান্ডেই থাকতে চেয়েছিলেন, নিয়মিত ট্রফি জেতে ও ট্রফির জন্য খেলে এমন দলেই খেলতে চেয়েছিলেন তিনি। এর উপর আর্সেন ওয়েঙ্গারের ফুটবল দর্শন তাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি সব জেনেশুনেও উত্তর লন্ডনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবে যাওয়ার মতো ভয়ংকর ঝুঁকি নেন।

মিডিয়া ধারণা করেছিল আর্সেনাল হয়তো এভারটন থেকে গোলরক্ষক রিচার্ড রাইটকে ঘোষণা দেবে। কিন্তু ওয়েঙ্গার যখন সল ক্যাম্পবেলকে নিয়ে হাজির হন, তখন উপস্থিত সাংবাদিকরা থ মেরে গিয়েছিলেন। কারণ ক্যাম্পবেল এর আগে গণমাধ্যমে একাধিকবার বলেছিলেন, তিনি কখনোই টটেনহ্যাম ছাড়বেন না। ফলে সাংবাদিকরাও হতভম্ব হয়ে ক্যাম্পবেলকে বলেছিলেন, ‘ভেবেছিলাম আপনি রিচার্ড রাইট!’ ক্যাম্পবেল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দুঃখিত বন্ধু, আমি গোলপোস্ট সামলাতে পারি না যে।’

আর্সেনালের হয়ে টটেনহ্যামের মাঠে ফেরার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বোতল ও ডিম ও বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয় গ্যালারি থেকে। এমনকি টটেনহ্যামের রাস্তায় ক্যাম্পবেলের কুশপুত্তলিকাও ঝোলানো হয়েছিল।

তবে আর্সেনালের হয়ে ক্যাম্পবেল দুটো প্রিমিয়ার লিগ ও তিনটা এফএ কাপ জেতেন। টটেনহ্যাম ভক্তদের তীব্র ঘৃণা ও সমালোচনার মুখোমুখি হলেও, ফুটবলীয় দিক থেকে ক্যাম্পবেলের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সফল ছিল। আর্সেনালে যোগ দেওয়ার পর তিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটান।

লুইস ফিগো: বার্সেলোনা ⭢ রিয়াল মাদ্রিদ (২০০২)

লুইস ফিগোকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল শূকরের মাথা

লুইস ফিগোকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল শূকরের মাথা

স্পেনের ফুটবলে সবচেয়ে বড় বিতর্কিত ও ভক্তদের ভাষায় 'বিশ্বাসঘাতকতার' উদাহরণ সম্ভবত লুইস ফিগো। বার্সেলোনার সমর্থকদের কাছে ফিগো তখন ছিলেন প্রিয় তারকাদের একজন। তাই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালে তাঁর যোগ দেওয়া ছিল প্রায় অকল্পনীয় ঘটনা। ২০০০ সালে তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড ৬০ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনা থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন পর্তুগিজ তারকা।

২০০০ সালে রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। তৎকালীন সভাপতিকে হারাতে সমর্থকদের কাছে অসম্ভব এক প্রতিশ্রুতি করে বসেন পাপা পেরেজ। সবাইকে চমকে দিতেই যেন ঘোষণা দেন, বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় তারকা লুইস ফিগোকে রিয়াল মাদ্রিদে আনবেন তিনি। শর্ত সামান্যই, তাকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করতে হবে।

তখন ফিগো শুধু বার্সেলোনার তারকা ছিলেন না, ছিলেন দলের অধিনায়কও ছিলেন। ক্যাম্প ন্যুয়ের সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণপ্রিয়, আপন একজন। যার গল্প দ্রুতই বদলে যায় হাতের তালুর মতো। কারণ পর্দার আড়ালে চলছে অন্য গল্প। পেরেজ নিজে ফিগোর এজেন্টের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেন। শর্ত, নির্বাচনে জিতলে ফিগোকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিতে হবে। আর হেরে গেলে ফিগোকে বড় অঙ্কের অর্থ দেবেন। ফিগো ও এজেন্সির সবাই ধরেই রেখেছিলেন পেরেজ হারবেন। ফলে এই চুক্তিকে তারা বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখেননি।

কারণ, এটা চুক্তিই ছিল না, ছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় 'জুয়া'। আর 'পাপা পেরেজ' ছিলেন এর খেলোয়াড়। নির্বাচনে পেরেজ জিতলেন। আর ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বিস্ময়কর এক ঘটনার জন্ম দিয়ে গোপন চুক্তি বাস্তব হয়ে গেল। ফিগোর তখন রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার পথ ছাড়া আর কোনো সহজ পথ ছিল না।

ফিগো তার প্রতিনিধির কাছ থেকে চরম চাপের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ফিগোর মতে, তার এজেন্ট সরে দাঁড়ানোর আর্থিক সর্বনাশ এবং আইনি পরিণতির ভয় দেখিয়ে তাকে ও তার পরিবারকে আতঙ্কিত করেছিল, যা তাকে শেষ পর্যন্ত এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

আরও বড় নাটক তখনও বাকি। চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসে। কে এই তথ্য ফাঁস করে? অনুমান করুন। স্বয়ং পেরেজ! তিনি যখন প্রকাশ্যে স্বাক্ষর করা নথি আর সংবাদমাধ্যমের কাছে তার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেন, তখন স্প্যানিশ ফুটবল দুনিয়া হতবাক হয়ে যায়। তৎকালীন সভাপতি লরেঞ্জো সাঞ্জ প্রথমে ধাপ্পাবাজি ভেবে হেসে উড়িয়ে দেন। ফিগো জনসমক্ষে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং এরকম চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করে কাতালান ক্রীড়া দৈনিক ‘স্পোর্ট’-এ বার্সেলোনা সমর্থকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ক্যাম্প ন্যু ছেড়ে যাবেন না তিনি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি পরেন। পড়তে বাধ্য হন। কারণ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে। বার্সেলোনাও এই জরিমানা দিয়ে উদ্ধার করতে না পারায়, ফিগো রিয়াল মাদ্রিদে রেকর্ড-ভাঙা ট্রান্সফার মেনে নিতে বাধ্য হন। এই রাজনৈতিক কৌশলের নাটকীয় বিবরণ নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘দ্য ফিগো অ্যাফেয়ার’-এ আছে।

বার্সেলোনা সমর্থকদের কাছে ছিল চরম এক বিশ্বাসঘাতকতা। আর এর প্রভাবও ছিল অনুমেয়। বার্সেলোনার মাঠে রিয়ালের জার্সি গায়ে প্রথমদিন পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফিগোকে লক্ষ্য করে বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে থাকেন সমর্থকেরা। এমনকি তার কর্নার নেওয়ার সময়ও ম্যাচ কয়েকবার থামাতে হয়েছিল। এমনকি এই ট্রান্সফারের দুই বছর পরও ফিগোর বিতর্ক থামেনি। একটা এল ক্লাসিকো ম্যাচে ফিগোর দিকে শূকরের মাথাও ছুঁড়ে দেওয়া হয় গ্যালারি থেকে।

লুইস ফিগোর এই দলবদল শুধু স্প্যানিশ ফুটবল নয়, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেই সবচেয়ে বড় আলোচিত ঘটনার একটি হয়ে আছে।

কার্লোস তেভেজ: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ⭢ সিটি

Image

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটির দ্বৈরথও ফুটবল ভক্তদের জানা। বিশেষ করে সেই সময়ে। ২০০৯ সালে আর্জেন্টাইন তারকা কার্লোস তেভেজ ইউনাইটেড ছেড়ে যোগ দেন ম্যান সিটিতে। ইউনাইটেডে দুই মৌসুম ধারে খেলে দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতার পরও ক্লাবটিতে স্থায়ী হননি তিনি।

বরং চলে গেলেন শহরের অন্য প্রান্তে, ম্যানচেস্টার সিটিতে। সেই সময় সিটি এখনকার মতো ইংলিশ ফুটবলের পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি। তাই তেভেজকে নিয়ে তারা ইউনাইটেডকে খোঁচা দিতে বড় এক বিলবোর্ডও বানিয়েছিল—‘Welcome to Manchester’।

ইউনাইটেড কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন সেই প্রচারণাকে ‘বোকামি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

গাব্রিয়েল হেইঞ্জ: ইউনাইটেড ⭢ লিভারপুল?

গাব্রিয়েল হেইঞ্জ

গাব্রিয়েল হেইঞ্জ

২০০৭ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জ ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন। তাঁর পছন্দের গন্তব্য ছিল লিভারপুল। লিভারপুল প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু ইউনাইটেড সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

এরপর বিষয়টা এতই জটিল হয়ে ওঠে যে তা প্রিমিয়ার লিগের ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যায় ইউনাইটেডের পক্ষেই। হেইঞ্জ শেষ পর্যন্ত লিভারপুলে যেতে পারেননি। একই গ্রীষ্মে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে চলে যান।

মাইকেল ওয়েন: লিভারপুল ⭢ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

মাইকেল ওয়েন

মাইকেল ওয়েন

লিভারপুলের সমর্থকদের কাছে মাইকেল ওয়েন ছিলেন একসময় প্রিয় এক ফুটবল নায়ক। কিন্তু ২০০৯ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিলে অনেক সমর্থকের চোখে তিনি বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হন।

ওয়েন ২০০৪ সালে লিভারপুল ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে গিয়েছিলেন। এরপর নিউক্যাসল ও অন্যান্য ক্লাব ঘুরে শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেডে যোগ দেন। লিভারপুল-ইউনাইটেডের ঐতিহাসিক বৈরিতার কারণেই এই দলবদলটি ছিল বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।

রবিন ফন পার্সি: আর্সেনাল ⭢ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

২০১২ সালে আর্সেনাল অধিনায়ক রবিন ফন পার্সি যোগ দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। আর্সেনালের সমর্থকদের কাছে ঘটনাটি ছিল বড় ধাক্কা। তবে ফন পার্সি ইউনাইটেডে গিয়েই প্রিমিয়ার লিগ জেতেন এবং দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

রবিন ফন পার্সি

রবিন ফন পার্সি

অ্যালান স্মিথ: লিডস ইউনাইটেড ⭢ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

লিডস ইউনাইটেডের সমর্থকদের কাছে অ্যালান স্মিথ ছিলেন আবেগের প্রতীক। তাই ২০০৪ সালে তাঁর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়া অনেকের কাছেই ছিল প্রায় বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। লিডস ও ইউনাইটেডের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই দলবদল আজও আলোচিত।

সেল্টিক-রেঞ্জার্স: যে দ্বৈরথ মাঠের বাইরেও

স্কটল্যান্ডের সেল্টিক ও রেঞ্জার্সের দ্বৈরথ শুধু ফুটবলের মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। দুই ক্লাবের মধ্যে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিভাজনের প্রভাবও রয়েছে। ফলে এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে সরাসরি যাওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই কম।

১৯৮৯ সালে সাবেক সেল্টিক স্ট্রাইকার মো জনস্টন রেঞ্জার্সে যোগ দিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। ফরাসি ক্লাব নঁতে থেকে রেঞ্জার্সে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। দলবদলের পর জনস্টন ও তাঁর এজেন্টকে নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করতে হতো।

বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ : চিরশত্রুর জার্সি

ফিগোর ঘটনা সবচেয়ে বিখ্যাত হলেও বার্সেলোনা ও রিয়ালের মধ্যে সরাসরি দলবদল খুবই বিরল। ১৯৯৬ সালে লুইস এনরিকে রিয়াল ছেড়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন। ২০০৭ সালে হাভিয়ের সাভিওলা বার্সেলোনা থেকে রিয়ালে যান।

তবে ফিগোর মতো কোনো দলবদলই সমর্থকদের আবেগে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি।

ফুটবলে খেলোয়াড়েরা ক্লাব বদলাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু ক্লাবের সম্পর্ক এতটাই তিক্ত যে সেখানে দলবদল আর শুধু পেশাগত সিদ্ধান্ত থাকে না; তা হয়ে ওঠে আবেগ, আনুগত্য ও পরিচয়ের প্রশ্ন। সল ক্যাম্পবেল, লুইস ফিগো, তেভেজ কিংবা ফন পার্সির দলবদল তারই প্রমাণ।

এখন তাই ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে নিয়ে আর্সেনালের আগ্রহের খবর নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে: টটেনহামের অধিনায়ক কি সত্যিই আর্সেনালের জার্সি পরতে চলেছেন? যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে উত্তপ্ত, বিতর্কিত বা সমালোচিত দলবদলের তালিকায় আরেকটি নতুন উদাহরণ যোগ হতে চলেছে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।