বিশ্ব ফুটবলে নতুন বিপ্লব: অভিবাসন
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ২৪ শতাংশ খেলোয়াড় এমন জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন, যা তাদের জন্মভূমি নয়।

চলতি ফিফা বিশ্বকাপে রাউন্ড অব সিক্সটিনের ফ্রান্স-প্যারাগুয়ের ম্যাচের আগে প্যারাগুয়ের কিংবদন্তিতুল্য গোলক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্টের একটি মন্তব্য খুব উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ১৯৯৮ সালে তো আমরা ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলে হেরেছিলাম (সেবারও প্যারাগুয়ে-ফ্রান্স রাউন্ড অব সিক্সটিন ম্যাচে মুখোমুখি হয়ে গোল্ডেন গোলে জয় পেয়েছিলো ফ্রান্স)। এই ফ্রান্স তো আফ্রিকান একাদশ। চিলাভার্টের এই কথা অনেকাংশেই সত্য। ফ্রান্সের যে স্কোয়াড বা একাদশ। তাদের ফ্রান্সের অরিজিন খেলোয়াড়ই হাতে গোনা। এমনকি এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ২৪ শতাংশ খেলোয়াড় এমন জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন, যা তাদের জন্মভূমি নয়। বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে এটি একটি বিশাল এবং যুগান্তকারী পরিবর্তন। তুলনামূলকভাবে দেখলে, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে এই হার ছিল ৯ শতাংশেরও কম। বিগত কয়েক বছরে ফিফার খেলোয়াড় নির্বাচন বা যোগ্যতার নিয়মে নমনীয়তা আসার পর থেকে উদীয়মান ফুটবল দেশগুলো এমন সব প্রতিভার খোঁজ পেয়েছে, যা আগে তাদের নাগালের বাইরে ছিল। এর ফলে ইউরোপ-লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ফুটবল পরাশক্তিদের সঙ্গে বাকি বিশ্বের ব্যবধান দ্রুত ঘুচে যাচ্ছে।

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সবচেয় ছোট দেশ কুরসাও
ফুটবল উন্নয়নের নতুন মডেল
আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রসারে এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি মডেল তৈরি করেছে। এখন আর উদীয়মান দেশগুলোকে ফ্রান্স বা স্পেনের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিদের অনুকরণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নিজস্ব একাডেমি বা অবকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে না। এর পরিবর্তে, তারা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাদের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে পারছে, যারা অন্য দেশে উন্নত সুযোগ-সুবিধায় ফুটবলার হিসেবে বড়ো হয়েছে। মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের দল সাজাচ্ছে বিদেশে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের দিয়ে। নিজস্ব ঘরোয়া পাইপলাইনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে, এই ফুটবল ফেডারেশনগুলো মূলত পরিযায়ী ধারা এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনকে কাজে লাগাচ্ছে। ইউরোপে জন্ম ও প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রথম প্রজন্মের ফুটবলারদের খুঁজে বের করে তারা নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে।

ফ্রান্স দলের একটি বড় অংশই অভিবাসী ফুটবলার
বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা: পর্দার পেছনের সমীকরণ
ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন খেলোয়াড়ের কেবল সেই দেশের নাগরিকত্ব থাকলেই চলে। এই নাগরিকত্ব প্রায়শই বাবা-মা বা এমনকি দাদা-দাদি, নানা-নানির সূত্রেও পাওয়া সম্ভব। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলস্বরূপ, জাতীয় পরিচয় এবং ক্রীড়াক্ষেত্রের যোগ্যতা এখন আর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে নেই। ক্লাব ফুটবলে যেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে খেলোয়াড় কেনা যায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তেমন সুযোগ নেই। এখানে মূল হাতিয়ার হলো ‘আবেগ ও শিকড়ের পরিচয়’। বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলো এখন যোগ্য খেলোয়াড়দের একটি বিশাল ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণ করে। তারা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের পরিবার, এজেন্ট ও কোচেদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় দলের ম্যানেজাররা নিজেই সরাসরি খেলোয়াড়দের দলে টানার জন্য রিক্রুটমেন্ট বা দূত হিসেবে কাজ করেন।

বাংলাদেশ দলের হামজা চৌধুরীও ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের নাগরিক
অভিবাসী শক্তির উদাহরণ
অভিবাসীদের দেশ যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯০-এর দশক থেকেই দ্বৈত নাগরিকদের এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ডিফেন্ডার সার্জিনো ডেস্ট এর কথা বলা যায়। নেদারল্যান্ডসে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও বাবার সূত্রে ডেস্ট যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন (তার বাবা সুরিনাম থেকে অ্যামেরিকায় এসে নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন)। বর্তমানে ইউরোপজুড়ে থাকা হাজার হাজার খেলোয়াড়ের জন্য এমন পথ উন্মুক্ত রয়েছে, যাদের পারিবারিক শিকড় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা ক্যারিবীয় অঞ্চলে। এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে আসা কুরাসাও হলো ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ যারা চূড়ান্ত পর্বে যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের মধ্যে ২৫ জন খেলোয়াড়ই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণ করেছেন, যা এই টুর্নামেন্টের যে-কোনো দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই চিত্রটি নেদারল্যান্ডসের সাথে কুরাসাওয়ের দীর্ঘ ও অন্তর্বর্তীকালীন সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ, কারণ প্রায় ৭১ হাজার কুরাসাওয়ান বংশোদ্ভূত মানুষ বর্তমানে নেদারল্যান্ডসে বসবাস করেন।
২০২১ সালে ফিফার নিয়ম পরিবর্তন ও তার প্রভাব
২০২১ সালে ফিফার নিয়মে আনা সংস্কার এই ধরনকে আরও গতিশীল করেছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, যুব পর্যায়ে (অনূর্ধ্ব দল) কোনো দেশের হয়ে একটি ম্যাচ খেললেও খেলোয়াড়টি স্থায়ীভাবে সেই দেশের সাথে বাঁধা পড়ে যেতেন। নতুন সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন খেলোয়াড় তার জাতীয় দল বা দেশের আনুগত্য পরিবর্তন করতে পারবেন যদি তিনি মূল জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি ম্যাচ খেলে থাকেন এবং কোনো বড়ো টুর্নামেন্টে বা প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট (যেমন বিশ্বকাপ বা মহাদেশীয় কাপ) অংশ না নেন। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের দলবদলের বাজার অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠেছে।
প্রতিযোগিতামূলক দিক থেকে এই নিয়ম প্রতিভার কার্যকর বিভাজনে দারুণ সহযোগী হয়ে উঠেছে। যে খেলোয়াড়রা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড বা স্পেনের মতো তারকাখচিত দলে সুযোগ পেতে লড়াই করতেন, তারা এখন অন্য কোনো দেশে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন যেখানে তাদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামার সম্ভাবনা বেশি।
আফ্রিকার উত্থান ও মরক্কো ম্যাজিক
আফ্রিকান দলগুলো এই সুযোগটি সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। গেলো বছর মরক্কোয় হওয়া আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে অংশ নেওয়া প্রায় ৩০ শতাংশ খেলোয়াড়ই আফ্রিকার বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মরক্কো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কো স্কোয়াডের ১৪ জন সদস্য দেশের বাইরে জন্মেছিলেন, যাদের বেশিরভাগই ইউরোপীয় অ্যাকাডেমির সৃষ্টি। ২০২৬ সালের মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন এই কৌশরের আরও শক্তিশালী ব্যবহার করেছে। ফলে বর্তমান দলের প্রায় চারভাগের তিন ভাগ খেলোয়াড়ই বিদেশে জন্ম নেওয়া। এই কৌশলের সফলতার প্রমাণ মিলেছে ২০২২ বিশ্বকাপে, যেখানে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে মরক্কো সেমিফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন করে। এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপেও মরক্কোকে অন্যতম বিপজ্জনক ও ডার্ক হর্স হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদি এই আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নরা বিশ্বমঞ্চে বড়ো কোনো চমক দেখায়, তবে তার পেছনে এই দূরদর্শী রিক্রুটমেন্ট বা খেলোয়াড় সন্ধানের বড় ভূমিকা থাকবে, যা আধুনিক ফুটবলের মানচিত্রকেই বদলে দিচ্ছে।

ইলিয়াস কমল
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।