স্পেনের দায়িত্ব কাঁধে এক শান্ত কিশোর
কুবার্সি রক্ষণভাগে খেললেও বল পায়ে পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ে গিয়ে গোল করতেন এবং তার কল্যাণেই দল সবসময় লীগে চ্যাম্পিয়ন হতো।

পাও কুবারসি
এবারের বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচে এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি স্পেন। ৪৮টি দলের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অব থার্টি টু ও রাউন্ড অব সিক্সটিন পর্যন্ত বেশিরভাগ দলই বিদায় নিয়েছে। কিন্তু স্পেন একমাত্র দল, যারা নিজেদের ডিফেন্সিভ রেকর্ড অক্ষুণ্ন রেখেছে। এর সাথে গোলরক্ষক উনাই সিমনের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৬শ মিনিট পর্যন্ত ক্লিনশিট রাখার রেকর্ডও হয়েছে। তবে এই দুই রেকর্ডের পেছনে অন্যতম কারিগর হিসেবে যাদের নাম আসে, সেই সেন্টারব্যাক জুটির কথা ততটা আলোচনায়ই আসছে না। এই জুটিতে আছে অভিজ্ঞ অ্যামেরিক লাপোর্তে ও স্পেনের এবং বার্সেলোনার আরেক তরুণ তুর্কি পাও কুবারসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সি একজন ডিফেন্ডার বিশ্বকাপে প্রধান সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলে নিজের প্রথম পাঁচ ম্যাচে এখন পর্যন্ত কোনোও গলই হজম করতে দেয়নি দলকে, একে কি বলা যায়? ডিফেন্সিভ ক্লাসিকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বললে কি অত্যুক্তি হয়? মনে হয় না। তার পারফর্ম্যান্স সাদামাটা না হলেও তার জীবনের গল্প অনেকটাই সাদামাটা। স্পেনের কাতালুনিয়া অঞ্চলের এক শান্ত ও নিভেৃত গ্রাম থেকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে পাউ কুবার্সির বাড়ি।

চলতি বিশ্বকাপে স্পেন এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি। তার অনেকটাই কৃতিত্ব কুবার্সির।
শান্ত এস্তানিওল থেকে ফুটবলের আঙিনায় জিরোনা বিমানবন্দরের কাছাকাছি শিল্পাঞ্চলগুলোর কোলাহল পেরিয়ে পশ্চিম দিকে এগোলেই চোখে পড়ে এক শান্ত, সবুজ ল্যান্ডস্কেপ—যার সৌন্দর্য রূপকথার ‘দ্য শায়ার’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই প্রকৃতির মাঝখানে অবস্থিত মাত্র ১৯৫ জন বাসিন্দার ছোট্ট গ্রাম এস্তানিওল, যা কুবার্সির আদি বাড়ি। কুবার্সির পরিবার প্রজন্মান্তর ধরে সেখানে কাঠের ব্যবসা (ছুতার কাজ) করে আসছে। গ্রামটিতে কোনো ফুটবল মাঠ বা স্কুল না থাকায়, তার শৈশবের পড়াশোনা এবং ফুটবলের হাতেখড়ি হয়েছিল পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভিলাবলারেইক্সে। সেখানকার স্থানীয় ক্লাবেই তার বাবা-মা রবার্ট এবং গ্লোরিয়া তাকে ভর্তি করিয়ে দেন। শৈশবের সতীর্থ জানা রেদেন্দোর মতে, কুবার্সি রক্ষণভাগে খেললেও বল পায়ে পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ে গিয়ে গোল করতেন এবং তার কল্যাণেই দল সবসময় লীগে চ্যাম্পিয়ন হতো। ছোটবেলা থেকেই বল পায়ে নিচে না তাকিয়ে, মাথা উঁচু করে সামনে দেখার এক বিরল সহজাত প্রতিভা ছিল তার মাঝে।

লা লিগায় তার রয়েছে একাধিক এসিস্টেরও রেকর্ড
জিরোনা হয়ে বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ আট বছর বয়সে জিরোনা এই প্রতিভাবান ডিফেন্ডারকে নিজেদের যুব দলে নিয়ে আসে। এরপর ২০১৮ সালে, ১১ বছর বয়সে বার্সেলোনার যুব একাডেমির পরিচালক জর্ডি রৌরা এবং অরেলি আলতামিরা তার খেলার প্রতিভা দেখে তাকে বার্সার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে নিয়ে আসেন। বার্সার ফুটবল দর্শনে একজন সেন্টার-ব্যাকের দায়িত্ব অনেক বেশি। কুবার্সির মধ্যে ঠিক সেই গুণগুলোই ছিল যা বার্সা খুঁজছিল—চমৎকার পায়ের কাজ, দূরদর্শিতা, রক্ষণভাগ ভেঙে নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতা এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ার ক্ষিপ্রতা। তার তৎকালীন অনূর্ধ্ব-১২ কোচ আলবার্ট পুইগ একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন, যেখানে মাত্র ১১ বছর বয়সেই একটি ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার পর কোনো কান্নাকাটি বা চিৎকার না করে কুবার্সি অত্যন্ত শান্তভাবে মাঠের বাইরে চলে যান। এই শান্ত ভাব ও পরিপক্বতাই তাকে আর দশটা বাচ্চার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

স্পেনের হয়ে এবারের বিশ্বকাপে সবগুলো ম্যাচের শুরুর একাদশে ছিলেন এই তরুণ ডিফেন্ডার
উল্কাবেগে উত্থান ও বিশ্বমঞ্চে অভিষেক কুবার্সি বার্সেলোনার সিনিয়র দলে খেলার সুযোগ পান ২০১৮ সালে। ক্লাব লিজেন্ড জাভি যখন কোচ হয়ে আসে তখন। কুবার্সির বয়স তখন কত? ষোল বছর। হ্যা, লামিন ইয়ামালেরও সেবারই অভিষেক হয়। সে বছর জানুয়ারিতে কোপা দেল রে-তে ইউনিয়নিতাস দে সালামানকার বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। এরপর নিজের ১৭তম জন্মদিনের ঠিক আগের দিন লা লিগায় প্রথম ম্যাচ খেলেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নাপোলির তারকা স্ট্রাইকার ভিক্টর ওসিমেন এবং পিএসজির কিলিয়ান এমবাপেকে যেভাবে তিনি সামলেছেন, তা ফুটবল দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। পার্ক দেস প্রিন্সেসে পিএসজি সমর্থকদের আপত্তিকর স্লোগানের মুখেও তার পকেটে হাত দিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি তার ইস্পাতকঠিন মানসিকতার পরিচয় দেয়। ইয়ামালের পর বার্সেলোনার ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ১০০টি ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেছেন কুবার্সি। ক্লাবের হয়ে এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকার মাটিতে চলমান ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬™-এ স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। স্পেনের হয়ে এবারের বিশ্বকাপে সবগুলো ম্যাচের শুরুর একাদশে খেলেছেন এবং দল কোনো গোল না খেয়ে (ক্লিন শিট) অপরাজিত রয়েছে। এর আগে ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকেও স্পেনের হয়ে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন তিনি।

বল পায়ে এমন স্বচ্ছন্দ যেন, মনে হয় দীর্ঘ সময় ধরে খেলে আসছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে
শেকড় ভোলা এক সাধারণ তরুণ মাঠের বাইরে কুবার্সির পরিচিতি অত্যন্ত বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ হিসেবে। শৈশবের বন্ধু ও সতীর্থদের মতে, এত খ্যাতির মাঝেও তিনি নিজেকে সবসময় সাধারণ ও আড়ালে রাখতেন। বার্সার সাবেক সতীর্থ গিবার্ট জর্ডানা রসিকতা করে জানান, বাড়িতে ভিডিও গেম কনসোল না থাকায় বন্ধুদের সাথে গেম খেলায় কুবার্সি ছিলেন সবচেয়ে আনাড়ি! কুবার্সির এই অবিচল শান্ত মেজাজের মূল নিহিত রয়েছে তার পারিবারিক শিক্ষার মাঝে। তার বাবা-মা এখনো এস্তানিওলে তাদের কাঠের কাজ করে যাচ্ছেন এবং সংবাদমাধ্যমের স্পটলাইট থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। কুবার্সিও যখনই সময় পান, গ্রামে ফিরে বাবার কাঠের ব্যবসায় সাহায্য করতে কাঠ বহন করেন। ফুটবলের আধুনিক চাকচিক্য আর আতিশয্যের মাঝেও কুবার্সি যেন সেই এস্তানিওলের শান্ত কিশোরটিই রয়ে গেছেন, যিনি ফুটবলকে কেবলই একটি খেলা মনে করেন এবং মাঠে নামেন কিছুটা ভালো সময় কাটাতে।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।