একুয়েডরের কালোদের গল্প: দাসজাহাজের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বকাপে
একুয়েডরের ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু মাঠের খেলা দেখলে হবে না; জানতে হবে এসমেরালদাসের ইতিহাস, দাসজাহাজের ধ্বংসাবশেষ, এবং সেই মানুষদের গল্প, যারা দাস হিসেবে এসেছিলেন—কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন স্বাধীনতার উত্তরাধিকার।

যখন একুয়েডর জাতীয় দল মাঠে নামে, তখন একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে—দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফুটবলারের গায়ের রং কালো। অনেকেই প্রশ্ন করেন, দক্ষিণ আমেরিকার একটি স্প্যানিশ-ভাষাভাষী দেশে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের উপস্থিতি এত বেশি কেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে। উত্তরটি কেবল ফুটবলের নয়;—এটি উপনিবেশবাদ, অত্যাচার, দাসপ্রথা, একটি জাহাজডুবি, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় গঠনের ইতিহাস।

আমেরিকাগামী দাস বোঝাই জাহাজ
পঞ্চদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা লাখ লাখ আফ্রিকান নারী, পুরুষ ও শিশুকে জোর করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় নিয়ে আসতো।
আফ্রিকা থেকে আমেরিকা—কালো মানুষের ওপর সবচেয়ে নিষ্ঠুর এই বাণিজ্যকে ইতিহাসে ‘ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য’ নামে আখ্যা দেয়া হয়। যেখানে কালোদেরকে মানুষ নয়, সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। হাতে-পায়ে শিকল বেঁধে জাহাজে গাদাগাদি করে রাখা হতো কোনো সস্তা পণ্যের মতোই।
আর এতে এই মানুষরূপী পণ্যদের অধিকাংশই তখন—খিদে, রোগ, নির্যাতন ও অমানবিক পরিবেশের প্রতিকূলতায় সমুদ্রযাত্রাতেই মারা পড়তেন। যারা বেঁচে থাকতেন, মৃতদের ভাগ্যবান বলেই মনে করতেন। কেননা, বেঁচে থাকাদেরকে আমেরিকায় এনে বিক্রি করে দেয়া হতো খামার, খনি ও উপনিবেশিক অর্থনীতির বিভিন্ন শ্রমক্ষেত্রে। যেখানেও কালোদের প্রতি নির্যাতন ছিল গৎবাঁধা রুটিন।
কিন্তু ১৫৫৩ সালের একটি জাহাজডুবি বদলে দেয় ইতিহাস। জাহাজটি এমনই আফ্রিকান দাস বোঝাই করে যাচ্ছিল আমেরিকার উদ্দেশে। কিন্তু মহাসাগরীয় তীব্র প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে একুয়েডরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের ‘এসমেরালদাস’ অঞ্চলের কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে। এসমেরালদাসের এই উপকূলীয় অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং পাথুরে। জাহাজটি দিকভ্রান্ত হয়ে উপসাগরে ঢোকার সময় অগভীর পানির নিচে লুকিয়ে থাকা চরে বা পাথরে সজোরে ধাক্কা খেতে খেতে আটকে যায়।
জাহাজটির চালক মূলত স্রোতের কারণে গতিপথ ঠিক রাখতে না পেরে সাময়িকভাবে এসমেরালদাসের সান মাতেও উপসাগরে নোঙর বা আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
পাথুরে চরে প্রায় বিদ্ধস্ত অবস্থায় আটকে যাওয়ার পর জাহাজকে আর সচল করা সম্ভব হয়নি। জোয়ারের সময় ডুবে যেতে থাকা জাহাজ থেকে নাবিক, যাত্রী এবং দাসদের সবাইকে বাধ্য হয়ে তীরের দিকে সাঁতরে যেতে হয়। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই আলোনসো দে ইলেস্কাসসহ আফ্রিকান দাসেরা পাশের গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যান। যারা আর দাসত্বে ফিরে যাননি। ঘন জঙ্গল, নদী ও দুর্গম ভূখণ্ডে আশ্রয় নেন, গড়ে তোলেন স্বাধীন বসতি।
সেই সময় আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, এসমেরালদাসে গড়ে ওঠা এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো ছিল ব্যতিক্রম। তাঁরা নিজেদের নেতৃত্ব, সামাজিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর নেপথ্য ভূমিকায় ছিলেন এই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম বা নায়ক আলোনসো দে ইলেস্কাস; আফ্রিকান মেরুন নেতা, যাঁকে ঔপনিবেশিক উত্তর-পশ্চিম একুয়েডরের এসমেরালদাস অঞ্চলের এককভাবে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো।

আলোনসো দে ইলেস্কাস
দাস থেকে নেতা হয়ে ওঠা এই কিংবদন্তী শৈশবে আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে স্পেনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জাহাজডুবির ঘটনার পর তিনি স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং এসমেরালদাসে কার্যত একটি স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতা অর্জন করে কালোদের এই জনগোষ্ঠী। এ কারণে তাঁকে আজ একুয়েডরে আফ্রো-একুয়েডরীয়দের অন্যতম ঐতিহাসিক নেতা হিসেবে সম্মান করা হয়।
স্বাধীনতা অর্জনের পরও সংগ্রাম শেষ হয়নি। নতুন ভূখণ্ডে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের বেঁচে থাকার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছে; নিজেদের শেকড়—ভাষা, সঙ্গীত, নৃত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক বন্ধন রক্ষা করতে হয়েছে। এসমেরালদাসে আজও আফ্রিকান ছন্দের প্রভাব, ঐতিহ্যবাহী ‘মারিম্বা’ সঙ্গীত, নৃত্য এবং পারিবারিক সংস্কৃতি সেই অতীতের স্মৃতি বহন করে।
উনবিংশ শতকে একুয়েডরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও বৈষম্য শেষ হয়ে যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রো-একুয়েডরীয় জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বঞ্চনার মুখোমুখি হয়েছে। তবু তাঁরা সঙ্গীত, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং বিশেষ করে ফুটবলের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় ও সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে গেছেন।

ফুটবলই তাঁদের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ও সুযোগ :
আজকের একুয়েডর জাতীয় দলে আফ্রো-একুয়েডরীয় ফুটবলারদের শক্তিশালী উপস্থিতি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
একুয়েডর জাতীয় দলে আফ্রো-ইকুয়েডরীয় ফুটবলারদের আধিক্যের মূল কারণ হলো ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, সেই সাথে এই জনগোষ্ঠীর অসাধারণ শারীরিক ক্ষমতা এবং ফুটবলকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেওয়া।
একুয়েডরের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশই প্রধানত দুটি অঞ্চল—এসমেরালদাস (উত্তর-পশ্চিম উপকূলীয় প্রদেশ) এবং ইমবাবুরার ছোটা উপত্যকায় বাস করে। এই অঞ্চলগুলো প্রথাগতভাবেই চরম দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতার শিকার। তা সত্ত্বেও, এই জায়গাগুলো একুয়েডরের সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান ফুটবলার উৎপাদন করে। কীভাবে?
অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে এই অঞ্চলের তরুণদের জন্য সাধারণ শিক্ষা বা পেশাদার চাকরি পাওয়া বেশ কঠিন। ফুটবল খেলায় কোনো দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না, শুধু একটি বল থাকলেই খেলা যায়। তাই ফুটবলকেই অনেকে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলের এবং ইউরোপে বা বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।
এতে তাঁরা সফলও হন। কেননা, আফ্রো-একুয়েডরীয় ফুটবলাররা শারীরিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় ও শক্তিশালী এবং গতিশীল। তাই একুয়েডরের ক্লাবগুলোও (যেমন: ইন্দিপেনদিয়েন্তে দেল ভালে) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে স্কাউটিং করে ফুটবল-প্রতিভাদের তুলে আনে। আর কালো এই তরুণ খেলোয়াড়দের একদম শূন্য থেকে উঠে এসে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পায়।
২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে একুয়েডর দলের মূল খেলোয়াড়রাই ছিলেন আফ্রো-একুডেরীয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপে দলের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে এসমেরালদাসের কালো খেলোয়াড়েরা।

নিলসন এঙ্গুলো : জার্মানিকে চমকে দিয়ে একুয়েডরের জয় লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন
এঁদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন বহু আন্তর্জাতিক তারকা, যারা বিশ্বকাপে একুয়েডরের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছেন। যেমন, আলবার্তো স্পেন্সার; সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একুয়েডরীয় খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত স্পেন্সার ছিলেন প্রদেশের একজন আফ্রো-একুয়েডরীয় ফরোয়ার্ড এবং কোপা লিবার্তাদোরেসে সর্বোচ্চ গোলদাতার সর্বকালের রেকর্ডধারী। তিনি ১৯৬০-এর দশকে পেনিয়ারোলের হয়ে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেন।
এই তালিকায় বিখ্যাতদের মধ্যে আছেন, পিয়েরে ইনকাপিয়ে। এসমেরালদাসে জন্মগ্রহণকারী ইনকাপিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারদের একজন। বায়ার লেভারকুসেনের ঐতিহাসিক বুন্দেসলিগা অপরাজিত অভিযানে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে আর্সেনালে যোগ দেন।
এনার ভ্যালেন্সিয়ার কথাও না বললেই নয়। এসমেরালদাসের সান লরেঞ্জোতে জন্মগ্রহণকারী এনার ভ্যালেন্সিয়া একুয়েডর জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং একুয়েডরের ফুটবল ইতিহাসের একজন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, যিনি ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড এবং পাচুকার মতো শীর্ষ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।
আছেন, মোইসেস কাইসেদোসান্তো। ডোমিঙ্গোতে জন্ম হলেও, কাইসেদোর গভীর আফ্রো-একুয়েডরীয় ঐতিহ্য রয়েছে যা এসমেরালদাসের সাথে সম্পর্কিত। চেলসির হয়ে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম দামী ও প্রতিভাবান মিডফিল্ডার হিসেবে তিনি একুয়েডরের বর্তমান সোনালী প্রজন্মের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এছাড়া, উইলিয়াম পাচো, এসমেরালদাস প্রদেশের বাসিন্দা প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের হয়ে ঘরোয়া শিরোপা জেতা এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখিয়ে একজন বিশ্বমানের সেন্টার-ব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এসি মিলানের পারভিস এস্তুপিনান, ফেলিক্স টরেস এবং অ্যাঞ্জেলো প্রেসিয়াডোর কথাও বলতে হয় প্রসঙ্গসূত্রে।

একটি জার্সির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস :
আজ যখন একুয়েডরের জাতীয় দলের কালো ফুটবলাররা বিশ্বকাপে গোল করেন, তখন সেটি শুধু একটি গোল নয়। সেটি সেই মানুষদের উত্তরসূরিদের সাফল্য, যাদের একদিন শিকল পরিয়ে দাস বানানো হয়েছিল। যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন স্বাধীন ইচ্ছায় নয়, বরং বন্দি হয়ে। যারা অত্যাচার, বৈষম্য ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে লড়ে নিজেদের জন্য স্বাধীন ভূমি গড়ে তুলেছিলেন।
আর সেই কারণেই একুয়েডরের ফুটবলকে বুঝতে হলে শুধু মাঠের খেলা দেখলে হবে না; জানতে হবে এসমেরালদাসের ইতিহাস, দাসজাহাজের ধ্বংসাবশেষ, এবং সেই মানুষদের গল্প, যারা দাস হিসেবে এসেছিলেন—কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন স্বাধীনতার উত্তরাধিকার।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।