খেলারদেশ

বাংলাদেশ ফুটবল

‘বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা না, বাংলাদেশ’

একদিন বিশ্বকাপে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে উল্লাস করতে হবে না, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ফুটবলে সেই নতুন ঢেউ তুলতে সুলিভান ভাইদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে প্রবাসী প্রতিভার খোঁজ

‘বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা না, বাংলাদেশ’

রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

বাংলাদেশের ফুটবলে বদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সেই পরিবর্তনের গল্পে এবার সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুলিভান পরিবারের দুই ভাই রোনান ও ডেকলান সুলিভান। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার ছেলে হয়েও মাতৃসূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে নিয়ে তারা এখন বাংলাদেশের ফুটবলের অংশ।

তাদের গল্পের শুরুটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। একদিকে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে এমএলএস মাতাচ্ছেন তাদের ভাই কাভান ও কুইন সুলিভান। অন্যদিকে রোনান ও ডেকলান বেছে নিয়েছেন নিজেদের দক্ষিণ এশীয় শিকড়কে। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে খেলেই সেই পরিচয়কে নতুন মাত্রা দিয়েছেন তারা। গত এপ্রিলে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচের পর টাইব্রেকারে নায়ক হন রোনান। শিরোপা নির্ধারণী পেনাল্টিতে তিনি করেছিলেন পানেনকা।

রোনানের যমজ ভাই ডেকলানের কাছে অবশ্য সেটি কোনো চমক ছিল না। কারণ রোনান জীবনে মাত্র দুইবার অনুশীলনে পানেনকা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দুবারই বিশ্বের অন্য প্রান্তে অনুশীলনের সময়। তার একটি আবার ক্রসবারে লেগেছিল। কিন্তু ফাইনালে শেষ পেনাল্টি নেওয়ার আগে রোনান যখন ডেকলানকে বলেছিলেন, বলটি চিপ করবেন, তখন ভাইয়ের কোনো সংশয় ছিল না। ডেকলানের ভাষায়, রোনান শেষ পেনাল্টি পেলে এমন কিছুই করবেন, তিনি আগেই জানতেন।

শেষ পর্যন্ত বল জালে জড়ায়। মালদ্বীপের গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন হাজারো বাংলাদেশি সমর্থক। বাংলাদেশ জিতে নেয় সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ।

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ

কিন্তু এই গল্পের শুরু তারও আগে। বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগটি সুলিভান ভাইদের সামনে আসে ইনস্টাগ্রামের একটি বার্তা থেকে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি ফ্যান পেজ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। শুরুতে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি রোনান ও ডেকলান। তাদের তখনও বাংলাদেশের পাসপোর্ট পর্যন্ত ছিল না। পরে তারা বুঝতে পারেন, ওই অ্যাকাউন্টটি বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এরপর ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। সুলিভান ভাইয়েরা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কলেজে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় ছিল তাদের হাতে। তাই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা এবং নিজেদের শিকড়কে কাছ থেকে জানার সুযোগটি তারা হাতছাড়া করতে চাননি। তবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। প্রায় তিন মাসের জটিল প্রক্রিয়া শেষে মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন তারা। সেটিই ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম ভ্রমণ।

বাংলাদেশে এসেই অবশ্য তাদের জন্য কোনো লালগালিচা বিছানো ছিল না। অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্যাম্পে ছিলেন ৩০ জনের বেশি ফুটবলার। জায়গা নিশ্চিত ছিল না সুলিভান ভাইদেরও। বরং নিজেদের প্রমাণ করেই দলে জায়গা করে নিতে হয়েছে তাদের। প্রথমদিকে ভাষাও ছিল বড় বাধা। রোনানের ভাষায়, বিদেশে বড় হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে শুরুতে সতীর্থদের কাছ থেকে বল পাওয়াটাও কঠিন ছিল। কারণ তারা বাংলা বলতে পারতেন না, আর সতীর্থদের অনেকেই প্রথমে তাদের উপস্থিতি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। কিন্তু কয়েকবার বল পেয়ে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মাঠের পাশাপাশি ড্রেসিংরুমেও ধীরে ধীরে দলের সঙ্গে মিশে যান তারা। শেষ পর্যন্ত দুজনই জায়গা করে নেন চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলে।

রোনান ও ডেকলানের গল্পটি বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এটা শুধু দুজন ফুটবলারের গল্প নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনাও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৮১তম অবস্থানে থাকলেও দেশটির রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা এবং বিশ্বের অন্যতম বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ।

সুলিভান ভাইদের সাফল্য সেই প্রবাসী ফুটবলারদের কাছেও নতুন বার্তা দিয়েছে। ডেকলানের মতে, তারা বাংলাদেশে ভালো অভিজ্ঞতা পাওয়ার পর থেকেই বিদেশে থাকা আরও অনেক ফুটবলারকে বাংলাদেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে আগ্রহী হতে দেখছেন। এখন মূল কাজ হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সেই প্রতিভাগুলোকে খুঁজে বের করা এবং কাজে লাগানো।

থমাস ডুলি

থমাস ডুলি

বাংলাদেশের জাতীয় দলের নতুন কোচ থমাস ডুলিও এই পরিকল্পনার বড় অংশ। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডুলির নিজের গল্পেও আছে ভিন্ন দেশে শিকড় খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা। জার্মানিতে বেড়ে ওঠা ডুলি পরে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছেন। এবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘ কোচিং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন প্রকল্প শুরু করেছেন তিনি। ডুলি মনে করেন, বাংলাদেশের হয়ে খেলার অধিকার যাদের আছে, তাদের জাতীয় দল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।

লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীর উদাহরণও তিনি সামনে আনছেন। তার মতে, বিদেশে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা শুধু মাঠের মান বাড়ান না, স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য কাজের ধরন, মানসিকতা ও পেশাদারিত্বের উদাহরণও তৈরি করেন।

হামজা চৌধুরী (ডানে), জামাল ভূঁইয়া (বাঁয়ে)

হামজা চৌধুরী (ডানে), জামাল ভূঁইয়া (বাঁয়ে)

তবে ডুলি সতর্কও। বিদেশে থাকা প্রত্যেক খেলোয়াড়কে শুধু পরিচয়ের ভিত্তিতে দলে নেওয়ার পক্ষে তিনি নন। তার লক্ষ্য এমন খেলোয়াড় খুঁজে বের করা, যারা সত্যিই জাতীয় দলের মান বাড়াতে পারবেন। কারণ সীমিত বাজেটের মধ্যে বিদেশি খেলোয়াড় এনে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই। একই অর্থ স্থানীয় খেলোয়াড়দের ক্যাম্পে এনে নিয়মিত অনুশীলনেও ব্যয় করা যায়।

বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন অবশ্য বিশ্বকাপ। দেশটি এখনো পুরুষ কিংবা নারী—কোনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। তবে প্রবাসী খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ঘরোয়া কাঠামো উন্নত করতে পারলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মনে করেন ডুলি। তার বিশ্বাস, সঠিক খেলোয়াড়দের খুঁজে পাওয়া, স্থানীয় প্রতিভার উন্নয়ন এবং কোচিংয়ের মান বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ১৫০-এর আশপাশে উঠতে পারে।

আর সুলিভান ভাইদের স্বপ্ন আরও বড়। ডেকলানের চোখে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের একত্র করা গেলে একদিন বিশ্বকাপ বাছাই পেরোনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, এটাই তার বিশ্বাস।

ডুলি তাই সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের শুধু দলে আসতে বলছেন না, তাদের সামনে তুলে ধরছেন বড় স্বপ্ন, বাংলাদেশের হয়ে এমন কিছু করে যাওয়া, যা এই দেশের ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

জাতীয় দলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে একবারই এই টুর্নামেন্ট জিতেছে বাংলাদেশ। এবার সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তিই ডুলির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। এরপর তার পরিকল্পনা আরও গভীরে যাওয়ার। জাতীয় দলের সাফল্যকে ব্যবহার করে ফুটবলে দর্শক, স্পনসর ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ধীরে ধীরে শক্তিশালী একটি ফুটবল কাঠামো তৈরি করা।

২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি মাঠের বাইরে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাকালে শিশুদের খেলার মাঠের সংকট চোখে পড়ে। ডুলির স্বপ্ন তাই শুধু জাতীয় দলকে উন্নত করা নয়, এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক হতে চাইবে না। তারা একদিন আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চাইবে। আর রোনান-ডেকলান সুলিভানদের গল্প হয়তো সেই পরিবর্তনেরই প্রথম দৃশ্য।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।