ইসমাইল সাইবারির রূপকথা
যে শিশুকে চিকিৎসকেরা ঘোষণা করে দিয়েছিল, ‘আর কোনোদিন হয়ত স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবে না।’—আজ সেই শিশুর পা বিশ্বকাপে মরক্কোর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছে।

যে শিশুকে চিকিৎসকেরা ঘোষণা করেছিল, ‘আর কোনোদিন হয়ত স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবে না।’—আজ সেই শিশুর পা বিশ্বকাপে মরক্কোর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু গোল, ট্রফি কিংবা মহা-তারকাদের গল্প নয়। ফুটবল বিশ্বকাপ এমন কিছু মানুষের গল্পও, যারা অসম্ভবকে সম্ভব করে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সামনে এসে দাঁড়ান সদর্পে। একটি দেশ ও জাতিকে স্বপ্ন দেখান, পূরণ করে চলেন।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ইসমাইল সাইবারির গল্পটা এমনই। যে শিশুকে চিকিৎসকরা ঘোষণা করে দিয়েছিল, ‘আর কোনোদিন হয়ত স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবে না।’—আজ সেই শিশুর পা বিশ্বকাপে মরক্কোর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছে।
মরক্কোর এই মিডফিল্ডার-ফরোয়ার্ড টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যেই তিন গোল করে অ্যাটলাস লায়ন্সকে নকআউট পর্বে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শক্তি, গতি, বুদ্ধিমত্তা, কৌশলগত খেলা এবং আক্রমণভাগে প্রভাব—তাঁকে পরিণত করেছে মরক্কোর অন্যতম সেরা পারফর্মারে।
অথচ বিশ্বকাপ মঞ্চে আজ যাঁকে পুরো পৃথিবী দেখছে, তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার তো দূর—একসময় স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারাটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আজ ৯০ মিনিট ধরে তাঁকে যখন অবিশ্বাস্য গতিতে দৌড়াতে দেখা যায়, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে গোল করতে দেখা যায়, গ্যালারিতে বসা দর্শক কিংবা টেলিভিশনের পর্দার সামনে থাকা কোটি কোটি মানুষ তখন হয়তো কল্পনাও করতে পারেন না—এক সময় এই ছেলেটির জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল কেবল হাঁটতে পারা।

অলৌকিক ঘটনা সব সময় ঘটে না, ঘটাতে হয়
পুরো বিশ্ব এখন তাঁর ফুটবলশৈলীর প্রেমে পড়ছে। কিন্তু এর পেছনের গল্পটা ফুটবল দিয়ে শুরু নয়। এর শুরু হাসপাতালের কক্ষ থেকে।
২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি স্পেনের মুরসিয়ায় মরক্কান অভিবাসী এক পরিবারে জন্ম নেন ইসমাইল সাইবারি।
জন্মের কিছুদিন পরই চিকিৎসকরা তাঁর পায়ে জন্মগত জটিলতা এবং মোটর ডেভেলপমেন্টে সমস্যা শনাক্ত করেন। তাঁর শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও হাঁটার বিকাশ ঠিকভাবে হচ্ছিল না।
সংবাদটা ছিল ভয়ংকর।
চিকিৎসকরা তাঁর বাবা-মাকে বলেছিলেন, হয়তো তাঁদের ছেলে কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবে না। ভাবুন, একজন মা-বাবার কাছে এর চেয়ে অসহায় মুহূর্ত আর কী হতে পারে?
যখন অন্য শিশুরা প্রথম পা ফেলে হাঁটা শিখছে, তখন ছোট্ট সাইবারি হাসপাতাল, চিকিৎসা আর থেরাপির মধ্যে বড় হচ্ছিল। দুই বছর বয়স পর্যন্ত সে নিজের পায়ে হাঁটতেই পারেনি। তার ছোট্ট দুই পা জড়িয়ে থাকত ব্রেসে। হাঁটার জন্য লাগত বিশেষ সহায়ক যন্ত্র। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলেছে চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি আর অনুশীলন। হয়তো অনেক শিশুই এই লড়াইয়ে হেরে যেত।
কিন্তু ইসমাইল সাইবারি হারেনি। ধীরে ধীরে হাঁটতে শিখল। তারপর দৌড়াতে। সেই দৌড় একদিন তাকে পৌঁছে দিল ফুটবল মাঠে।

শৈশবে স্পেনের স্থানীয় ক্লাবগুলোতে ফুটবল শেখা শুরু করেন সাইবারি। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দ্রুতই নজর কাড়ে।
শৈশবে স্পেনের স্থানীয় ক্লাবগুলোতে ফুটবল শেখা শুরু করেন সাইবারি। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা দ্রুতই নজর কাড়ে।
কিন্তু জীবন তখনও তাকে সহজ রাস্তা দেয়নি। ১৪ বছর বয়সে আবারও ভেঙে পড়ার মতো মুহূর্ত আসে। যে ফুটবলকে সে নিজের স্বপ্ন বানিয়েছিল, সেই ফুটবলই যেন তাকে প্রত্যাখ্যান করে। ১৪ বছর বয়সে অতিরিক্ত ওজনের কারণে বেলজিয়ান ক্লাব আন্ডারলেখট (Anderlecht) একাডেমি থেকে তাকে বাদ দিয়েছিল।
যে বয়সে একজন একাডেমি খেলোয়াড় ফুটবল মাঠে নিজের দক্ষতার উন্নতিতে মনোনিবেশ করে, সেই বয়সে কিশোর সাইবারিকে মোকাবিলা করতে হয় মানসিক আঘাতের সঙ্গে। যে ছেলেটি ছোটবেলায় হাঁটতে পারবে কি না—তা নিয়েই সন্দেহ ছিল, তাকেই এবার বলা হলো—তুমি ফুটবলের জন্য অপ্রস্তুত।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো স্বপ্নটাকে চিরদিনের মতো গুছিয়ে রেখে দিত। কিন্তু সাইবারি তা করেননি। না কোনো অভিযোগ কারো প্রতি, না ভাগ্যকে দোষারোপ। তিনি যা করেছেন তা যে কারো জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
তিনি নিজেকেই বদলে ফেললেন। খাদ্যাভ্যাস বদলালেন। অমানুষিক পরিশ্রম করলেন। ওজন কমালেন। নতুন করে গড়ে তুললেন নিজের শরীর। আর প্রতিজ্ঞা করলেন—একদিন সবাইকে ভুল প্রমাণ করবেন।
সেই প্রতিজ্ঞাই তাঁকে নিয়ে গেল নেদারল্যান্ডসে। পিএসভি একাডেমিতে। সেখান থেকে মূল দলে। বল পায়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস, ড্রিবলিং, শক্তিশালী দৌড়, প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠার দক্ষতা এবং গোল করার ক্ষমতা তাঁকে ইউরোপের অন্যতম সম্ভাবনাময় ও সেরা মিডফিল্ডার-ফরোয়ার্ডে পরিণত করে।
একসময় যে ছেলেটিকে ওজনের কারণে একাডেমি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেই তিনিই পরে পিএসভির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। পিএসভিকে শিরোপা জেতান। হন এরেডিভিসির বর্ষসেরা খেলোয়াড়।
‘হয়তো হাঁটতেই পারবে না,’—শোনা সেই ছেলে এখন বল পায়ে এমন গতিতে ছুটে চলেন, যা থামাতে ইউরোপের সেরা ডিফেন্ডারদেরও এখন ঘাম ঝরাতে হয়।

এরেডিভিসির বর্ষসেরা খেলোয়াড়
তারপর এলো বিশ্বকাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চ। যেখানে ইসমাইল সাইবারি শুধু খেলছেন না—লিখছেন নিজ জীবনের গল্প। তাঁর প্রতিটি দৌড় যেন চিকিৎসকদের সেই আশঙ্কার জবাব। প্রতিটি গোল যেন সেই মানুষদের উদ্দেশে প্রত্যুত্তর, যারা ভেবেছিল তাঁর পক্ষে আর ফুটবল অন্তত সম্ভব নয়।
গোলের প্রতিটি উদযাপন যেন তাঁর বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত সংগ্রামের প্রতিদান।

মায়ের সঙ্গে সাইবারি, বিশ্বকাপ ২০২৬
ফুটবলে আমরা প্রায়ই বলি, নায়করা জন্মায়। বস্তুত নায়ক তৈরি হয়;—হাসপাতালের বিছানায়। ফিজিওথেরাপির কক্ষে। প্রত্যাখ্যানে। ব্যর্থতায়। অনেক কান্নার রাত পার করে।
হ্যাঁ, ইসমাইল সাইবারিই এর জীবন্ত প্রমাণ।

বিশ্বকাপ মিশনে অপ্রতিরোধ্য সাইবারি, মরক্কোর নতুন প্রজন্মের প্রিয় মুখ, লাখো তরুণের প্রেরণা
আজ বিশ্বকাপে যখন তিনি মরক্কোর জার্সি পরে মাঠে নামেন, তখন তিনি শুধু ১১ জন ফুটবলারের একজন নন।
তিনি বরং সেই সব শিশুর প্রতিনিধি, যাদের বলা হয়—'তুমি পারবে না।' তিনি সেই সব তরুণের প্রতিনিধি, যাদের বলা হয়—'তোমাকে দিয়ে হবে না।' তিনি সেই সব পরিবারের প্রতিনিধি, যারা কঠিন সময়েও আশা হারাননি।
স্পষ্ট করে বললে, ইসমাইল সাইবারির সবচেয়ে বড় জয় বিশ্বকাপের তিন গোল বা প্রতি ম্যাচে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করতে অবদান রাখার মধ্য দিয়ে নয়। তিনি জিতে গেছেন বহু আগেই—যেদিন প্রথমবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিন থেকেই অগোচরে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের এই অবিশ্বাস্য গল্প।
কারণ কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় ট্রফি বিশ্বকাপ নয়—যে জীবন একসময় থেমে যাওয়ার কথা ছিল, সেই জীবনকে আবার ছুটতে শেখানোই অমূল্য ট্রফি। এবং আজ সেই পা-ই ছুটছে পুরো বিশ্বের সামনে।
সাইবারির প্রতিটি দৌড় কোটি মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—অলৌকিক ঘটনা কখনও কখনও ঘটে না, ঘটাতে হয়।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।