খেলারদেশ

শেন বন্ড

শরীর যাঁকে বারবার থামিয়েছে

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ। পোর্ট এলিজাবেথের মাঠে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া। তখনকার সবচেয়ে ভয়ংকর দল। ব্যাটিংয়ে পন্টিং, গিলক্রিস্ট, হেইডেন, মার্টিন। তাঁদের সামনে ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করছেন এক লম্বা, চওড়া কাঁধের পেসার। ২৩ রানে ৬ উইকেট নিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া থামল ২০৮ রানে।

শরীর যাঁকে বারবার থামিয়েছে

২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রবল প্রতাপশালী ব্যাটিং লাইনআপ একাই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন শেন বন্ড।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
By মাহমুদ নেওয়াজ জয়

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ। পোর্ট এলিজাবেথের মাঠে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া। তখনকার সবচেয়ে ভয়ংকর দল। ব্যাটিংয়ে পন্টিং, গিলক্রিস্ট, হেইডেন, মার্টিন। তাঁদের সামনে ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটারের বেশি গতিতে বল করছেন এক লম্বা, চওড়া কাঁধের পেসার। ২৩ রানে ৬ উইকেট নিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া থামল ২০৮ রানে।

ম্যাচটা নিউজিল্যান্ড জেতেনি। তবু সেদিন ক্রিকেট-দুনিয়া একটা নাম মনে রেখে দিল। শেন বন্ড।

পুলিশের চাকরি থেকে ক্রিকেটে

শেন এডওয়ার্ড বন্ডের জন্ম ১৯৭৫ সালের ৭ জুন, ক্রাইস্টচার্চে। তাঁর শুরুটা ঠিক পরিকল্পিত ক্রিকেটারের মতো ছিল না। পুরো সময় ক্রিকেটে আসার আগে তিনি নিউজিল্যান্ড পুলিশে কাজ করতেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্যান্টারবেরির হয়ে খেলতে শুরু করেন।

জাতীয় দলে আসেন দেরিতে। ২০০১-০২ মৌসুমে, বয়স তখন ছাব্বিশ। ফাস্ট বোলারদের জন্য এটা কম বয়স নয়। কিন্তু আসার পর সময় নষ্ট করেননি।

বোলিংয়ে কী ছিল

বন্ডের প্রথম পরিচয় গতি। নিউজিল্যান্ড সাধারণত স্যুইং আর সিম-নির্ভর বোলার তৈরি করে। সেই দেশে এমন নিখাদ গতির পেসার বিরল ছিলেন। তবে শুধু গতিতে তাঁকে মাপা যেত না। বল ব্যাটসম্যানের ভেতরের দিকে ঢোকাতে পারতেন। ইয়র্কার করতেন প্রায় নির্ভুল। দ্রুত বোলাররা সাধারণত লাইন-লেংথ নিয়ে ভোগেন। বন্ড ভুগতেন কম। এই কারণেই ব্যাটসম্যানরা তাঁকে ভয় পেতেন। শুধু জোরে আসছে বলে নয়, কোথায় পড়বে তা আগে থেকে ধরা কঠিন ছিল বলে।

সংখ্যায় বন্ড

ক্যারিয়ারের হিসাব দেখলে অবাক হতে হয়। টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৮টি। উইকেট ৮৭, গড় প্রায় ২২। ওয়ানডে খেলেছেন ৮২টি। উইকেট ১৪৭, গড় প্রায় ২১।

এই গড় যেকোনো যুগের সেরা পেসারদের পাশে বসানো যায়। বিশেষ করে ওয়ানডেতে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এত কম গড়ে এত উইকেট নেওয়া সহজ কথা নয়।

কিন্তু সংখ্যার আরেকটা দিকও আছে। যে সময়টায় তিনি খেলেছেন, নিউজিল্যান্ড তার মধ্যে অনেক টেস্ট খেলেছে। বন্ড ছিলেন তার সামান্য অংশে। বাকি সময়টা তিনি মাঠের বাইরে ছিলেন।

চোটের ধারাবাহিকতা

বন্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল তাঁর নিজের শরীর। পিঠের স্ট্রেস ফ্র্যাকচার তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে। এর বাইরেও নানা চোট ছিল। একবার ফেরেন, কয়েকটা ম্যাচ খেলেন, আবার ছিটকে যান। এই চক্র চলেছে বছরের পর বছর। ফাস্ট বোলিংয়ে এটা নতুন কিছু নয়। শরীরকে এখানে প্রতি বলে প্রচণ্ড ধাক্কা সামলাতে হয়। পিঠ, হাঁটু, গোড়ালি, কোনো কিছুই ছাড় পায় না। বন্ডের মতো যাঁরা সত্যিকারের দ্রুত বল করেন, তাঁদের জন্য ঝুঁকিটা আরও বেশি।

ফলে তাঁর ক্যারিয়ার হয়ে গিয়েছিল টুকরো টুকরো। একটা সিরিজে আগুন ঝরালেন। পরের সিরিজে নেই। তারপর হঠাৎ ফিরে এসে আবার সেই পুরোনো বন্ড। দর্শক অপেক্ষা করত। দলও অপেক্ষা করত। কখনো কখনো শরীর সে অপেক্ষার মর্যাদা রাখত না।

আইসিএল-বিতর্ক

২০০৭ সালে ভারতে শুরু হয় ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ। সুভাষ চন্দ্রের এসেল গ্রুপের এই লিগকে বিসিসিআই স্বীকৃতি দেয়নি। যেসব ক্রিকেটার যোগ দেন, তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। বন্ডও যোগ দিয়েছিলেন। জবাবে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট তাঁর কেন্দ্রীয় চুক্তি বাতিল করে। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। বারবার চোটে পড়া এক ক্রিকেটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি আর্থিক নিরাপত্তা খুঁজছিলেন। তাঁর অবস্থানে অনেকেই তা-ই করতেন। কিন্তু এর দাম ছিল। জাতীয় দলের দরজা কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সময়টাও খারাপ ছিল, কারণ তাঁর হাতে যে বছরগুলো ছিল, সেগুলো এমনিতেও যথেষ্ট ছিল না।

শেষ অধ্যায়

পরে তিনি আইসিএল ছেড়ে আবার জাতীয় দলের কাছে ফেরেন। কিন্তু ততদিনে বয়স আর চোট দুটোই ভারী হয়ে এসেছে। ২০১০ সালে, চৌত্রিশ বছর বয়সে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। বিদায়টা ছিল নিঃশব্দ। কোনো বড় ফেয়ারওয়েল সিরিজ নয়। এমন কোনো মুহূর্ত নয়, যেটা সবাই মনে রাখবে। একজন শক্তিশালী পেসার ধীরে ধীরে সরে গেলেন।

কোচের ভূমিকায়

বন্ড ক্রিকেট ছাড়েননি। কোচিংয়ে এসেছেন। ২০১২ সাল থেকে নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলের বোলিং কোচ ছিলেন। পরে ২০১৫ সাল থেকে বহু মৌসুম আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। মুম্বাইয়ে কাজ করেছেন জসপ্রীত বুমরাহর মতো বোলারদের সঙ্গে। এটা একটা মজার ঘুরে আসা। যিনি নিজের শরীরের সঙ্গে লড়াই করে হেরেছেন, তিনি এখন অন্যদের শেখাচ্ছেন কীভাবে শরীর বাঁচিয়ে চলতে হয়। কীভাবে কাজের চাপ সামলাতে হয়। কখন থামতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা তাঁর চেয়ে ভালো আর কে দিতে পারেন?

যা রেখে গেলেন

বন্ডকে নিয়ে বিতর্ক একটাই। তিনি কতটা বড় হতে পারতেন? যাঁরা তাঁকে খেলতে দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই বলেন, সুস্থ থাকলে তিনি যুগের সেরা পেসারদের একজন হতেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক গড় আর বিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের মুখের ভাব, তিনটিই এই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তবে ‘হতে পারতেন’ দিয়ে ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হয় না। ইতিহাসে আছে ১৮টি টেস্ট, ৮২টি ওয়ানডে, আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই এক বিকেল। বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এই গল্পের একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে। আমাদের তরুণ পেসাররাও আসেন ঝড় তুলে, তারপর চোটে হারিয়ে যান। গতি থাকলেই হয় না। সেটা বইবার মতো শরীর আর সেই শরীরকে যত্ন করার ব্যবস্থাও লাগে। বন্ডের ক্যারিয়ার সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। তিনি যতটুকু খেলেছেন, ততটুকুতেই ব্যাটসম্যানদের ঘুম কেড়েছেন। বাকিটা তাঁর হাতে ছিল না।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।