ছোট নাজির, বড় অবহেলার গল্প
সুনামগঞ্জের একটা ভাড়া বাসায় বয়স আর অসুখ মিলিয়ে একজন মানুষ প্রায় গৃহবন্দি। পাড়ার তরুণরা তাকে চেনে না। অথচ ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই কুয়ালালামপুরে যে এগারোজন মাঠে নেমেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন তিনি — নাম নাজির, ডাকনাম 'ছোট নাজির' বা নাজির জুনিয়র।

সংগৃহিত ছবি থেকে এআই দ্বারা আধুনিকায়ন করা
সুনামগঞ্জের একটা ভাড়া বাসায় বয়স আর অসুখ মিলিয়ে একজন মানুষ প্রায় গৃহবন্দি। পাড়ার তরুণরা তাকে চেনে না। অথচ ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই কুয়ালালামপুরে যে এগারোজন মাঠে নেমেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন তিনি — নাম নাজির, ডাকনাম 'ছোট নাজির' বা নাজির জুনিয়র।
সেদিন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতীয় দল হিসেবে আন্তর্জাতিক মাঠে নামে। প্রতিপক্ষ থাইল্যান্ড, ম্যাচ শেষ হয় ২-২ গোলে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তখন সদ্য গঠিত, মাত্র এক বছর আগে, ১৯৭২ সালে। এএফসির সদস্যপদ পায় সেই ৭৩ সালেই, ফিফার সদস্যপদ আসে আরও তিন বছর পর, ৭৬ সালে। অর্থাৎ মারদেকা কাপ ছিল আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশ ফুটবলের জন্মমুহূর্ত, আর নাজির সেই জন্মমুহূর্তের একজন সাক্ষী।
দলটা খেলত ৪-২-৪ ফরমেশনে। গোলে শহিদুর রহমান চৌধুরী সান্টু, রক্ষণে দুই স্টপার জাকারিয়া পিন্টু ও নাজির, দুই প্রান্তে আশরাফ আলী ও আব্দুল হাকিম। মাঝমাঠে কায়কোবাদ আর মনোয়ার হোসেন নান্নু, আক্রমণে প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, নওশেরুজ্জামান, এনায়েতুর রহমান ও কাজী সালাউদ্দিন। বদলি বেঞ্চে ছিলেন সুনীল কৃষ্ণ দে, ফিরোজ কবির, ফারুকুজ্জামান ফারুক, শরীফউজ্জামান আর দ্বিতীয় গোলরক্ষক মোতালেব। এই স্কোয়াডের প্রতিটা নামের পেছনে গল্প আছে, কিন্তু নাজিরের গল্পটা বলা হয় সবচেয়ে কম।
স্টপার পজিশনের ধর্মই এমন। সালাউদ্দিন গোল করলে তার নাম খবরের শিরোনাম হয়, নাজির প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকালে সেটা কেবল স্কোরশিটে থেকে যায় শূন্য একটা সংখ্যা হিসেবে। অথচ দিলীপ কুমার বড়ুয়ার মতো অভিজ্ঞ একজন স্টপারও সেই টুর্নামেন্টে মূল একাদশে জায়গা পাননি নিয়মিত, কারণ পিন্টু আর নাজিরের জুটিটা এতটাই ভরসার ছিল। কোচ শেখ সাহেব আলী, ম্যানেজার এন এ চৌধুরী কালু আর দলনেতা সালাহউদ্দিন ইউসুফ — তিনজনই এখন প্রয়াত — এই জুটির ওপর আস্থা রেখেছিলেন পুরো টুর্নামেন্টে।
সেই দলের ইতিহাস সংরক্ষণেও গাফিলতির ছাপ স্পষ্ট। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কিংবা বাফুফে, কোথাও দলের গ্রুপ ছবিটা নেই। সাবেক চিত্রগ্রাহক নাজমুল আমিন কিরণের ব্যক্তিগত সংগ্রহ আর কয়েকজন জীবিত ফুটবলারের স্মৃতির ওপর ভর করেই টিকে আছে সেই মুহূর্তের প্রমাণ। পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ২০২৩ সালে ঢাকা পোস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে এই দলের সতেরো ফুটবলারের হালহকিকত — সাতজন মারা গেছেন, তিনজন প্রবাসে, বাকি সাতজন দেশে। এই সাতজনের মধ্যেও দুজনের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ: মোহামেডানের কিংবদন্তি কায়কোবাদ পারকিনসন্সসহ নানা জটিল রোগে বাসায় বন্দি, আর নাজির সুনামগঞ্জে বার্ধক্য ও অসুখের ভেতর দিন কাটাচ্ছেন।
তুলনাটা এখানেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। পিন্টু জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন, স্বাধীনতা পদকও পেয়েছেন। সালাউদ্দিন চারবার বাফুফে সভাপতি হয়েছেন। কায়কোবাদের নাম এখনো মোহামেডান সমর্থকদের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু নাজিরের নামের পাশে এসবের কিছুই জোটেনি। রাজধানী ছেড়ে সুনামগঞ্জে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই সম্ভবত তাকে ঢাকার ক্রীড়া সাংবাদিকতার আলো থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
অথচ একজন স্টপারের কাজটাই তো এমন। বিপক্ষের ফরোয়ার্ডকে বল থেকে দূরে রাখা, নিজের গোলরক্ষককে বাড়তি চাপ থেকে বাঁচানো, প্রতিটা আক্রমণের আগেই জায়গা নেওয়া। এই কাজে সফল হলে কেউ প্রশংসা করে না, ব্যর্থ হলে সবাই দোষ দেয়। নাজির তার সময়ের সেরা স্টপারদের একজন ছিলেন, এই স্বীকৃতিটুকু অন্তত টিকে আছে সমসাময়িকদের স্মৃতিতে। কিন্তু স্বীকৃতি আর প্রাপ্য সম্মান এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশ ফুটবল দল এখন ফিফা র্যাংকিংয়ে অনেক নিচে, জামাল ভূঁইয়ার নেতৃত্বে খেলে, কোচ থমাস ডুলি। কিন্তু এই বর্তমানের ভিত্তিটা তৈরি হয়েছিল ৫২ বছর আগে কুয়ালালামপুরের সেই মাঠে, যেখানে নাজিরের মতো একজন স্টপার নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন যাতে বাকিরা আক্রমণে যেতে পারে। সেই স্থিরতার প্রতিদান তার নিজের জীবনে আর ফেরত আসেনি।
সুনামগঞ্জের ঘরটায় এখন কোনো সাংবাদিক যান না, কোনো ফেডারেশন কর্মকর্তা খোঁজ নেন না। শুধু একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে থাকেন, যার শরীরে এখনো লেগে আছে পঞ্চাশ বছর আগের সেই মাঠের ধুলো, যদিও তা দেখার মতো চোখ আজ আর কারও নেই।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
অতিথি কলামপেনাল্টি কর্নারের রাজা
অতিথি কলামমোনেম মুন্না : ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে জন্মানো এক ফুটবলার
অতিথি কলামনিজেকে কিনে নেওয়া রোনাল্ডোর গল্প
অতিথি কলামওয়াকা, ওয়াকা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে?
অতিথি কলামশাহ আলমকে মনে পড়ে?
অতিথি কলাম

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।