জাদুকর সামাদ: যে পায়ের জাদুতে থমকে যেত ইতিহাস
জাদুকর সামাদ: যে পায়ের জাদুতে থমকে যেত ইতিহাস। অতিথি কলাম লিখেছেন ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক মাহমুদ নেওয়াজ জয়।

পার্বতীপুরের ইসলামপুর কবরস্থানে একটা স্মৃতিসৌধ আছে। খুব বড় কিছু না—সাদামাটা, শান্ত, মানুষের ভিড় নেই আশেপাশে। যে মানুষটার নামে এই সৌধ, তাঁর পায়ের জাদু একদিন গোটা উপমহাদেশকে থামিয়ে দিত। এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে শুধু কিছু শুকনো পাতা, আর মাঝেমধ্যে ফুটবলপ্রেমী কারও পা।
সৈয়দ আবদুস সামাদ। নামটা এখন অনেকের কাছেই অচেনা। অথচ এই মানুষটাকে নিয়ে একসময় লেখা হয়েছে গান, উপাধি দিয়েছেন খোদ বাংলার গভর্নর, আর ভারতীয় ফুটবলের কিংবদন্তি গোষ্ঠ পাল বলেছিলেন—তিনি ছিলেন সেই বিরাট অশ্বত্থ গাছ, যার ছায়ায় বেড়ে উঠেছে অন্য সব ফুটবলার।
ভুরি গ্রামের ছেলেটা
১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ভুরি গ্রামে জন্ম নিলেন এক শিশু। বাবা সৈয়দ ফজলুল বারী সরকারি চাকুরে, পরিবার পরে চলে যায় বিহারের পূর্ণিয়ায়। ছেলেটার নাম রাখা হলো আবদুস সামাদ। স্কুলজীবন খুব বেশিদূর গড়ায়নি তাঁর—অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই ছেড়ে দেন পড়ালেখা।
এখানেই গল্পটা অন্যরকম মোড় নেয়। বইখাতা ছেড়ে যে পথে হাঁটলেন সামাদ, সেটা তাঁকে নিয়ে গেল ফুটবলের এক অমর অধ্যায়ে। কে জানত, স্কুল ছেড়ে দেওয়া এই কিশোরই একদিন হয়ে উঠবেন উপমহাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত নাম।
সেই সময়ের বাংলা আর বিহারের মাঠগুলো ছিল অন্যরকম। নিয়মিত কোচ ছিল না, ছিল না আজকের মতো প্রশিক্ষণ কাঠামো। ছেলেরা খেলত রাস্তায়, খোলা মাঠে, প্রায়ই খালি পায়ে। ফুটবল তখনো ব্রিটিশ শাসিত ভারতে তুলনামূলক নতুন এক খেলা—কলকাতার মাঠগুলোতে সবে দানা বাঁধছে একটা সংস্কৃতি, যেখানে দেশীয় ক্লাবগুলো লড়ছে ইংরেজ দলের বিপক্ষে, প্রায় রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে। সামাদ বেড়ে উঠলেন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে।
১৯১২ সাল। কলকাতা মেইন টাউন ক্লাবে যোগ দিলেন সামাদ। তখনো কেউ জানত না, এই তরুণের পায়ে কী লুকিয়ে আছে। খেলার মাঠে তাঁর প্রথম পরিচয়টা হয়তো সাধারণই ছিল। কিন্তু সময় গড়াতেই বদলাতে থাকল সেই ছবি।
যেভাবে তিনি হয়ে উঠলেন জাদুকর
১৯১৫ থেকে ১৯৩৮—এই তেইশ বছর সামাদের খেলোয়াড়ি জীবনের স্বর্ণযুগ। এই সময়টাতেই ঘটেছে এমন সব ঘটনা, যা তাঁর নামের আগে জুড়ে দিয়েছে "জাদুকর" শব্দটা। কলকাতা এরিয়ান্সে খেলার সময় তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্যে ক্লাবটি প্রথম বিভাগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। পরে ১৯২০ সালে যোগ দেন ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ক্লাবে।
১৯২৪ সাল ছিল আরেক মাইলফলক। ভারতীয় জাতীয় দলের হয়ে বার্মা, যুক্তরাজ্য আর চীন সফরে যান সামাদ। চীনের বিপক্ষে এক ম্যাচে একাই করেন চার গোল। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে? মাত্র পনেরো মিনিটে হ্যাটট্রিক। ভাবা যায়? আজকের ফুটবলে যেটা বিরল কীর্তি, প্রায় একশো বছর আগে সেটাই করে দেখিয়েছিলেন এক বাঙালি।
তাঁর গোলসংখ্যা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। কেউ বলেন একশোর বেশি, কেউ আবার দাবি করেন তিনশোরও বেশি গোল করেছিলেন তিনি। সঠিক সংখ্যাটা হয়তো চিরকালই অস্পষ্ট থেকে যাবে—সেই যুগে রেকর্ড রাখার সংস্কৃতি এখনকার মতো ছিল না। কিন্তু সংখ্যাটা যাই হোক, প্রভাবটা ছিল অবিসংবাদিত।
এই অনিশ্চয়তাটাও এক অর্থে সামাদের গল্পের অংশ। তাঁকে নিয়ে যা কিছু জানা যায়, তার বড় অংশ এসেছে মুখে মুখে প্রচলিত গল্প থেকে, সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ থেকে। লিখিত দলিল কম, ভিডিও ফুটেজ নেই একটাও। তাই আজকের প্রজন্মের কাছে সামাদ কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন এক চরিত্র—সত্যি আর কিংবদন্তির মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ। কিন্তু তাতেও একটা সৌন্দর্য আছে; কিংবদন্তিরা তো এভাবেই তৈরি হয়, সময়ের কুয়াশার ভেতর দিয়ে।
ইংল্যান্ডের তৎকালীন সেরা লেফট আউট কম্পটন সামাদের খেলা দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, এমন খেলোয়াড় এদেশে দেখতে পাবেন—এটা তাঁর ধারণাতেই ছিল না। আরেক ইংরেজ ফুটবলার এলেক হোসি বলেছিলেন, বিশ্বমানের যেকোনো দলে খেলার যোগ্যতা সামাদের আছে। এসব মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, শুধু উপমহাদেশে নয়—বিশ্ব ফুটবলের মানদণ্ডেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী কিছু।
গোলপোস্ট মেপে দেখা লোকটা
একটা গল্প প্রায়ই ফিরে আসে সামাদকে নিয়ে। ইন্দোনেশিয়ার এক মাঠে খেলতে গিয়ে তিনি খেয়াল করেন, গোলপোস্টের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। আজকের দিনে এটা শুনতে হয়তো সামান্য মনে হয়—কিন্তু সেই যুগে, যখন প্রযুক্তি বা পরিমাপের সহজ উপায় ছিল না, একজন খেলোয়াড়ের এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁর ফুটবলীয় প্রজ্ঞারই প্রমাণ। মাঠ, বল, গোলপোস্ট—সবকিছুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল প্রায় শারীরিক, যেন নিজের শরীরের অংশের মতোই চিনতেন সেসব।
সন্তোষ নন্দী—যিনি নিজেও ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতের হয়ে খেলেছিলেন—সামাদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন, সামাদকে তিনি ফুটবলের ভগবান বলেই মানেন। সেসব খেলা ভোলার নয়, বলেছিলেন তিনি। এমন মন্তব্য একজন খেলোয়াড়ের মুখ থেকেই আসতে পারে, যে নিজেও কিংবদন্তি।
ভাবতে অবাক লাগে, সেই যুগে খেলোয়াড়দের জন্য কোনো বিজ্ঞান-সহায়তা ছিল না। ভিডিও রিপ্লে নেই, স্ট্যাটিসটিক্স নেই, ফিটনেস ট্রেনার নেই। যা কিছু শেখা যেত, তা শুধু মাঠে নেমে, ভুল করে, আবার উঠে দাঁড়িয়ে। সামাদের খেলার মধ্যে তাই এক ধরনের সহজাত প্রতিভা ছিল, যাকে আজকের ভাষায় হয়তো "ন্যাচারাল ইন্সটিংক্ট" বলা যায়। বল পায়ে তাঁর নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর কৌশল—সবকিছুই তিনি রপ্ত করেছিলেন নিজের মতো করে, কোনো বইয়ের সাহায্য ছাড়াই।
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর সামাদের খ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় মোহামেডান পরপর পাঁচবার আইএফএ শিল্ড আর লিগ জিতেছিল—আর এই সাফল্যের পেছনে সামাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। মাঠে নামলেই গ্যালারি ভরে উঠত। মানুষ আসত শুধু একজন খেলোয়াড়কে দেখতে—সামাদকে।
দেশভাগ, আর এক নতুন ঠিকানা
১৯৪৭ সাল। উপমহাদেশ ভাগ হলো দুই টুকরোয়—ভারত আর পাকিস্তান। এই বিভাজনের ঢেউ শুধু রাজনীতিতে না, বদলে দিল অসংখ্য মানুষের জীবনও। সামাদও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি চলে এলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রেলওয়ে শহর পার্বতীপুরে।
মজার ব্যাপার হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্ম না নিয়েও সামাদ এই মাটিকেই নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন—আর সেটা রয়ে গেল আমৃত্যু, ফিরে যাননি তিনি কলকাতায়, যদিও ফুটবল-খ্যাতির পুরোটাই তৈরি হয়েছিল সেখানে। খেলোয়াড়ি জীবনের ঝলমলে দিনগুলো তখন পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি। কলকাতা মোহামেডানে খেলে বিদায় নিয়েছিলেন মাঠ থেকে—আর তাঁর অবসরের পর অনেক ফুটবলপ্রেমীই নাকি খেলা দেখাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এতটাই প্রভাব ছিল এই একজন মানুষের।
পার্বতীপুরে এসে সামাদ থেমে থাকেননি। খেলোয়াড় থেকে হয়ে উঠলেন সংগঠক। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বেতনভুক্ত ফুটবল কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন। যে খেলাটা তাঁকে চিনিয়েছিল উপমহাদেশকে, সেই একই খেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।
১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপতি পদক পেলেন সামাদ। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কিন্তু ততদিনে তাঁর মাঠের দিনগুলো অনেক পেছনে। এক সময়ের বিদ্যুৎগতির পা এখন হয়তো একটু ধীর, চোখে জমেছে বয়সের ছাপ—কিন্তু নামের পাশে যে "জাদুকর" শব্দটা লেগে গিয়েছিল, সেটা মুছে যায়নি।
কোচ হিসেবে সামাদের কাজটা ছিল সহজ নয়। একদিকে তরুণ প্রজন্মকে শেখাতে হচ্ছে খেলার মৌলিক কৌশল, অন্যদিকে নিজের ভেতরে বহন করছেন এমন এক অতীত, যা কারও পক্ষেই পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়। যাঁরা তাঁর অধীনে অনুশীলন করেছেন, তাঁদের কাছে সামাদ ছিলেন প্রায় পুরাণের চরিত্র—যাঁর গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন, এখন সামনাসামনি তাঁকে দেখছেন, শিখছেন তাঁর কাছ থেকে। এই দ্বৈততা—কিংবদন্তি আর শিক্ষক, একই শরীরে—সামাদের শেষ জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়।
পার্বতীপুরের মানুষদের স্মৃতিতে সামাদ থেকে গেছেন অন্যভাবে। খেলোয়াড় সামাদের চেয়ে তাঁরা বেশি মনে রাখেন প্রতিবেশী সামাদকে—যিনি বিকেলে বসতেন চায়ের দোকানে, তরুণদের ডেকে বলতেন ফুটবলের গল্প, কখনো নিজের হাতে বলে টোকা মেরে দেখাতেন কোনো কৌশল। কিংবদন্তি হয়েও তিনি হয়ে উঠতে পারতেন সাধারণ মানুষের একজন—এই গুণটাই হয়তো তাঁকে আরও বেশি ভালোবাসার পাত্র করে তুলেছিল।
শেষ বাঁশি
১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ফুটবলের এই জাদুকর চিরবিদায় নিলেন। পার্বতীপুরের ইসলামপুর কবরস্থানে সমাহিত হলেন তিনি। ১৯৮৯ সালে সেখানে নির্মিত হয় একটা স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশ সরকার তাঁর স্মরণে ১৯৯৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতজন আজ চেনেন সৈয়দ আবদুস সামাদকে? পেলে, মারাদোনা, মেসি—এসব নাম মুখে মুখে ফেরে। অথচ একজন বাঙালি, যাঁর পায়ের কারিকুরিতে থমকে গিয়েছিল ব্রিটিশ ফুটবলাররা, যাঁকে খোদ বাংলার গভর্নর দিয়েছিলেন "Wizard of Football" উপাধি—তাঁর নাম আজ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে।
একটা স্মৃতিসৌধ, একটা স্মারক ডাকটিকিট, একটা মিলনায়তন—এই হলো তাঁর প্রাপ্য সম্মানের সাকুল্য। নতুন প্রজন্মের হয়তো জানা দরকার, আমাদেরও একজন ফুটবল জাদুকর ছিলেন। যিনি শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না—ছিলেন আত্মমর্যাদার প্রতীক, বাঙালির ক্রীড়াশক্তির এক জীবন্ত দলিল।
আজকের বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে সামাদের নাম প্রায় হারিয়ে গেছে বললেই চলে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ে তাঁর কথা নেই বললেই চলে, তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি অচেনা এক নাম। অথচ যে দেশটা মেসি-রোনালদোর জার্সি গায়ে চাপিয়ে রাস্তায় নামে বিশ্বকাপের সময়, সেই দেশেরই মাটিতে একদিন হেঁটে বেড়িয়েছেন একজন মানুষ, যাঁকে ইংল্যান্ডের সেরা খেলোয়াড়রাও সমীহ করতেন। ইতিহাস বিস্মৃতিপ্রবণ, আর সামাদের গল্প যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
সামাদের সময়ে ফুটবল ছিল না নিছক বিনোদন। ছিল একধরনের ভাষা—যে ভাষায় কথা বলত পা, বল, আর মাঠ। সেই ভাষাতেই একদিন উপমহাদেশকে চমকে দিয়েছিলেন এক বাঙালি তরুণ, যাঁর নাম আজ ইতিহাসের পাতায় প্রায় বিস্মৃত এক অধ্যায়। পার্বতীপুরের সেই শান্ত কবরস্থানে এখনো শুয়ে আছেন তিনি—যেখানে হয়তো মাঝেমধ্যে বাতাসে ভেসে আসে দূরের কোনো মাঠের হর্ষধ্বনি, কেউ গোল করেছে, কেউ উল্লাসে ফেটে পড়েছে। সামাদ শুনতে পান কিনা, কে জানে।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।