খেলারদেশ

শাহ আলমকে মনে পড়ে?

দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব, সাফ গেমসে স্বর্ণপদকজয়ী শাহ আলমকে মনে পড়ে? অতিথি কলাম লিখেছেন ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক মাহমুদ নেওয়াজ জয়।

শাহ আলমকে মনে পড়ে?

১৯৮৫ ঢাকা সাফ গেমসে শাহ আলম

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
By মাহমুদ নেওয়াজ জয়

মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলা। সাহেবনগর নামের একটা গ্রাম। সেখানে কবির হোসেন নামের এক কৃষকের ঘরে ১৯৫৮ সালের ৫ মে জন্ম নিয়েছিল একটা ছেলে। নাম শাহ আলম। সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, তাই পড়াশোনাটা দশম শ্রেণির বেশি এগোয়নি। বইখাতা রেখে একদিন সেনাবাহিনীতে ঢুকে গেল ছেলেটা — পেটের দায়ে, ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন মাথায় নিয়ে নয়। অথচ সেই সেনাবাহিনীর ট্র্যাকেই, কে জানত, লুকিয়ে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুতগামী পায়ের জোড়া।

১৯৮৪ সাল। কাঠমান্ডুর সাফ গেমস। শাহ আলম তখনও অচেনা মুখ, কিন্তু ট্র্যাকে নেমে সবাইকে চমকে দিলেন। দ্রুততম মানবের খেতাবটা তখনো তার হাতে আসেনি অবশ্য — সেই মুকুট তখন ভারতের আদিল সুমারিওয়ালার মাথায়। কিন্তু একটা বার্তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেই আসরেই: এই ছেলে থামার নয়।

১৯৮৭ কলকাতা সাফ গেমসে শাহ আলম

১৯৮৭ কলকাতা সাফ গেমসে শাহ আলম

পরের বছর, ১৯৮৫ সালে, নিজের দেশের মাটিতেই সেই বার্তার প্রমাণ দিলেন শাহ আলম। ঢাকার সাফ গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে নতুন রেকর্ড গড়ে সোনা জিতলেন। সুমারিওয়ালার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন 'দ্রুততম মানব' খেতাব। স্টেডিয়ামভর্তি দর্শক, নিজের মাটিতে নিজের রেকর্ড — এমন সুযোগ ক্রীড়াজীবনে ক'বারই বা আসে। দুই বছর বাদে কলকাতায় আবার মঞ্চে ফিরলেন, আর নিজের রেকর্ডকেই ভেঙে ফেললেন। ১০.৭৯ সেকেন্ড — আগেরটা ছিল ১০.৮০। পার্থক্য এক শতাংশ সেকেন্ডেরও কম, কিন্তু সেই ছোট্ট ব্যবধানটাই তাকে ইতিহাসে জায়গা করে দিল। পরপর দুইবার সাফ গেমসে দ্রুততম মানবের খেতাব ধরে রাখা একমাত্র বাংলাদেশি স্প্রিন্টার হয়ে রইলেন তিনি — আজও সেই রেকর্ড অক্ষত। ১৯৮৮ সালে সিউল অলিম্পিকের ট্র্যাকেও লাল-সবুজ পতাকা বুকে নিয়ে দৌড়েছিলেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরার সেই মুহূর্তটা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গর্বের অধ্যায়।

১৯৮৭ কলকাতা সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী শাহ আলম (মাঝে)

১৯৮৭ কলকাতা সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী শাহ আলম (মাঝে)

স্বাধীনতা পুরস্কারজয়ী ক্রীড়াবিদদের তালিকায়ও নাম উঠেছিল তার — একজন কৃষকের ছেলের জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারত।

তারপর ১৯৮৯ সাল। ইসলামাবাদের সাফ গেমসে নামলেন শাহ আলম, কিন্তু এবার সোনা নয় — ব্রোঞ্জ। প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই কম। যারা তাকে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হতে দেখেছে, তাদের কাছে এই ব্রোঞ্জ একরকম ধাক্কাই। কিন্তু শাহ আলম হতাশায় বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। সেই ব্যর্থতাকেই জ্বালানি বানিয়ে নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। সামনে বড় লক্ষ্য — ১৯৯০ সালের বেইজিং এশিয়ান গেমস। এশিয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। জাতীয় দলের ক্যাম্পে যোগ দিতে হবে, নতুন করে গড়তে হবে নিজেকে।

Image

সেই ক্যাম্পের ডাকেই শেষবারের মতো বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালের ২৯ মে। মোটরসাইকেলে চড়ে মেহেরপুরের সাহেবনগর থেকে ঢাকার পথে রওনা দিলেন — যেভাবে আগেও বহুবার গেছেন, গ্রামের বাড়ি থেকে রাজধানীর ট্র্যাকে। পাবনার বেড়া উপজেলার দাড়িয়াপুর এলাকায় হঠাৎ একটা তেলবাহী ট্রাক এসে ধাক্কা দিল মোটরসাইকেলে। রাস্তায় ছিটকে পড়লেন দেশের সবচেয়ে দ্রুতগামী মানুষটা। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলো তাকে। সাড়ে চার ঘণ্টা যুদ্ধ করলেন জীবনের সঙ্গে। তারপর থেমে গেল সেই দৌড়, চিরতরে। বয়স তখন সবে বত্রিশ পেরিয়েছে।

খবরটা যখন ছড়িয়ে পড়ল, দেশের ক্রীড়াঙ্গন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে মানুষটা এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুতগামী পায়ে বাংলাদেশের নাম তুলেছিলেন, সেই মানুষটাই মহাসড়কের এক দুর্ঘটনায় থেমে গেলেন — এমন এক পরিহাস যা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল সবার পক্ষেই। বেইজিং এশিয়ান গেমসের স্বপ্নটা অপূর্ণই থেকে গেল।

কিন্তু শোক চিরস্থায়ী হয় না, বিশেষত যখন তাকে ধরে রাখার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকে না। ২০১৭ সালে দৈনিক যুগান্তরের একটা প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল — বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন অ্যাথলেট শাহ আলম। শিরোনামটাই যথেষ্ট বলে দেয় বাকিটা। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নথিতে হয়তো নামটা আছে, কিন্তু জাতীয় স্মৃতিতে তার জায়গাটা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এসেছে। যে ট্র্যাকে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন, সেই ট্র্যাকের নতুন প্রজন্মের কাছেও তার নামটা প্রায় অচেনা।

শাহ আলমের গল্পটা একা নয় অবশ্য। তার সঙ্গেই মনে পড়ে মাহবুব আলমের কথা — আরেক কিংবদন্তি স্প্রিন্টার, যিনিও চলে গিয়েছিলেন অকালে। আর ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা — তারও জীবন থেমেছিল সড়ক দুর্ঘটনায়, বহু বছর পর। বাংলাদেশের সড়ক যেন এক অদ্ভুত, নির্মম প্যাটার্নে দেশের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ক্রীড়াবিদদের বেছে বেছে কেড়ে নিয়েছে — ঠিক তখন, যখন তারা সবচেয়ে বেশি কিছু দেওয়ার জায়গায় পৌঁছেছিলেন। এই তিনজনের নাম পাশাপাশি রাখলে একটা প্রশ্ন এসেই যায়: এই দেশের সড়ক-নিরাপত্তা কি সত্যিই কখনো তার প্রাপ্য গুরুত্ব পেয়েছে?

মেহেরপুরে প্রতি বছর ২৯ মে তারিখটা আসে, চলেও যায় — বেশিরভাগ বছর নীরবেই, কোনো আনুষ্ঠানিক স্মরণ ছাড়াই। যে গ্রামের মাটিতে তার শৈশব কেটেছে, সেই সাহেবনগরেও এখন হয়তো তরুণ প্রজন্মের কাছে শাহ আলম নামটা শুধু একটা রাস্তার নাম, বা স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পড়া একটা লাইন। অথচ এই মানুষটার পায়েই একসময় গোটা বাংলাদেশ নিজের গতির সবচেয়ে জোরালো প্রমাণটা দেখেছিল — একজন কৃষকের ছেলে, যার দৌড়ের গতি হার মানিয়েছিল গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে।

দ্রুততম মানব হওয়ার জন্য যে ট্র্যাকে ছুটতে হয়, সেই ট্র্যাকে তাকে থামাতে য্যপারেনি কেউ। থামিয়ে দিল পাবনার একটা মহাসড়ক, একটা তেলের ট্রাক, আর একটা দেশ যে আজও তার সড়ককে পুরোপুরি নিরাপদ করে তুলতে পারেনি।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।