খেলারদেশ

স্টেডিয়ামের গেটে যার নাম, খেলার মাঠে যার ছায়া

একজন খেলোয়াড় মারা গেলে প্রথমে থেমে যায় তাঁর দৌড়। তারপর ধীরে ধীরে থেমে যায় দর্শকের স্মৃতি। কয়েক বছর পর নতুন খেলোয়াড় আসে, নতুন ম্যাচ হয়, নতুন প্রজন্ম পুরোনো নামগুলো আর চেনে না।

স্টেডিয়ামের গেটে যার নাম, খেলার মাঠে যার ছায়া

রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টু ছবি: বৈকালী সংঘ, রাজশাহী

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
By মাহমুদ নেওয়াজ জয়

একজন খেলোয়াড় মারা গেলে প্রথমে থেমে যায় তাঁর দৌড়। তারপর ধীরে ধীরে থেমে যায় দর্শকের স্মৃতি। কয়েক বছর পর নতুন খেলোয়াড় আসে, নতুন ম্যাচ হয়, নতুন প্রজন্ম পুরোনো নামগুলো আর চেনে না।

কিছু নাম অবশ্য পুরোপুরি হারায় না। রাজশাহীর হকির ইতিহাসে রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টু তেমনই একটি নাম। জীবনটা ছিল ছোট, ক্রীড়াজীবন দীর্ঘ হওয়ার সময় পায়নি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে, ১৯৯৯ সালে, ঢাকায় শারীরিক শিক্ষা কলেজে খেলার সময় এক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। অথচ মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরও রাজশাহী তাঁকে ভোলেনি। বৈকালী সংঘের মানুষ এখনো তাঁর নাম উচ্চারণ করেন, আর নগরীর মিন্টু চত্বরে সেই নামটা নামফলকে খোদাই হয়ে আছে। ঢাকার মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের প্রধান গেটের নামও তাঁকে মনে করিয়ে দেয়—'রবিউদ্দীন গেট'।

একজন খেলোয়াড়ের জন্য এর চেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন হয়তো খুব বেশি নেই। স্মৃতিস্তম্ভ মানুষকে শুধু মৃতের কথা মনে করায় না, কখনো কখনো সেটি বলে দেয়, এই মানুষটি একসময় সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে রাজধানীর বাইরের খেলোয়াড়দের পথ কখনো খুব সহজ ছিল না। প্রতিভা থাকলেই জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানো যায় না, প্রয়োজন হয় ক্লাব, প্রশিক্ষণ, সুযোগ, আর এমন কিছু মানুষের, যারা একজন তরুণ খেলোয়াড়কে স্থানীয় মাঠের সীমা পেরিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখায়। রাজশাহীর বৈকালী সংঘ ছিল তেমনই একটি জায়গা।

এই সংঘ থেকেই জাতীয় পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টু। বৈকালী সংঘের ইতিহাসে তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, একটি দরজা খোলার মতো ঘটনা ছিল। একটি স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠন যখন তার একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় পর্যায়ে পাঠাতে পারে, সেই খেলোয়াড় আর একা থাকেন না। তাঁর সাফল্য ক্লাবের অন্য ছেলেদেরও বদলে দেয়, মাঠে দাঁড়িয়ে তারা বুঝতে পারে—রাজশাহী থেকে শুরু করেও জাতীয় দলের দিকে যাওয়া সম্ভব। মিন্টু সেই সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছিলেন।

মাওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের রবিউদ্দিন গেইট।                       ছবি: গুগল ম্যাপ থেকে নেয়া

মাওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের রবিউদ্দিন গেইট। ছবি: গুগল ম্যাপ থেকে নেয়া

রাজশাহীর ক্রীড়া ইতিহাসে তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হকি খেলোয়াড় হিসেবে স্মরণ করা হয়। কিন্তু একজন ক্রীড়াবিদের প্রকৃত গুরুত্ব অনেক সময় পুরস্কারের তালিকায় ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে তাঁর রেখে যাওয়া পথে।

খেলাধুলায় উত্তরাধিকার সব সময় বইয়ে লেখা থাকে না। কখনো একজন সিনিয়রের উপস্থিতি একজন জুনিয়রকে বদলে দেয়, কখনো কোনো খেলোয়াড়ের সাফল্য অন্যদের সাহসী করে তোলে। কেউ প্রথমবার জাতীয় পর্যায়ে গেলে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরও দশজন তরুণের স্বপ্নও একটু বড় হয়ে যায়। বৈকালী সংঘের পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে ওঠার কাহিনিতেও মিন্টুর নাম ফিরে আসে, আর সেই ধারাবাহিকতাতেই তিনি নিজে একটা পথ তৈরি করে গেছেন।

১৯৯৯ সাল। রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টু তখন মাত্র ২৭ বছরের একজন খেলোয়াড়। সামনে কী ছিল, তা আজ আর জানার উপায় নেই। একজন ক্রীড়াবিদের জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা কখনো নিশ্চিত নয়। চোট আসতে পারে অসময়ে, অবহেলা জমতে পারে বছরের পর বছর, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন কেড়ে নিতে পারে সময়টাই। মিন্টুর ক্ষেত্রে জীবনই থেমে গেল, খেলার মাঝখানে, ২৭ বছর বয়সেই। ১৯৯৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা কলেজে প্র্যাকটিসের সময় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

একটি মৃত্যু তখন শুধু পরিবারের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্লাব হারায় তার একজন মানুষকে, শহর হারায় তার প্রতিনিধিকে; আর খেলাধুলার খাতায় থেকে যায় একটা সম্ভাবনার নাম, যার শেষ অধ্যায় লেখাই হলো না।

আমরা জানি তিনি কোথা থেকে উঠে এসেছিলেন, জানি তিনি জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাঁর কৃতিত্ব স্বীকৃতি পেয়েছিল, নামটা পরে একটি স্টেডিয়ামের গেটে জায়গা পেয়েছে। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকলে আর কত দূর যেতেন, সেটা আমরা কখনোই জানব না।

তিনি ছিলেন রাজশাহীর সন্তান, জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃত হকি খেলোয়াড়, এমন একজন ক্রীড়াবিদ যাঁকে অকালমৃত্যুও শহরের স্মৃতি থেকে মুছে দিতে পারেনি। আর তাঁর নামেই ঢাকার হকির অন্যতম প্রধান ভেন্যুর একটি প্রবেশপথ স্মৃতি বহন করছে। এটি নিছক নামকরণ নয়—বাংলাদেশের ক্রীড়া-সংস্কৃতিতে এক ধরনের স্বীকৃতি যে, রাজধানীর বাইরের একটি শহর থেকে উঠে আসা একজন খেলোয়াড় দেশের হকির স্মৃতিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন।

রাজশাহীতেও তাঁর স্মৃতি কেবল বার্ষিক অনুষ্ঠানের মধ্যে আটকে নেই। মিন্টু চত্বর তাঁর নাম বহন করছে, বৈকালী সংঘ তাঁর নাম আগলে রেখেছে, পুরোনো ক্রীড়ামহলের মানুষ এখনো তাঁর কথা বলেন।

বাংলাদেশে হকি একসময় ছিল দেশের অন্যতম আলোচিত খেলা। ক্রিকেটের সর্বব্যাপী উত্থানের আগে হকির নিজস্ব দর্শক ছিল, ক্লাব সংস্কৃতি ছিল—মাঠের ধারে ভিড় জমাতেন দর্শক, সন্ধ্যা নেমে আসার আগ পর্যন্ত মাঠজুড়ে লেগে থাকত স্টিকের ঠকঠক শব্দ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসতেন। রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টু ছিলেন সেই ধারারই একজন।

আজ বাংলাদেশের খেলাধুলার আলোচনায় ক্রিকেট প্রায় সবকিছু ঢেকে রাখে, ফুটবলেরও নিজস্ব জনস্মৃতি আছে। কিন্তু হকির বহু খেলোয়াড় ধীরে ধীরে বিস্মৃতির দিকে চলে গেছেন। তাঁদের নিয়ে বই নেই, পূর্ণাঙ্গ জীবনী নেই, পর্যাপ্ত আর্কাইভও নেই। একটি নাম তখন বেঁচে থাকে কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদন, পুরোনো সহখেলোয়াড়ের স্মৃতি, ক্লাবের বার্ষিক আয়োজন আর কোনো কোনো স্থানের নামের মধ্যে।

মিন্টুর ক্ষেত্রেও তাই। তাঁর জীবন নিয়ে আজ আমাদের কাছে খুব বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার নেই, প্রতিটি ম্যাচের হিসাব সহজে পাওয়া যায় না, ক্রীড়াজীবনের প্রতিটি মৌসুমের গল্পও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু যে অল্প তথ্য আছে, সেটিই যথেষ্ট একটি বিষয় বোঝার জন্য—তিনি রাজশাহীর হকিতে এমন একজন ছিলেন, যাঁকে হারানোর পরও মানুষ তাঁকে মনে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেছে।

রবিউদ্দীন আহমেদ মিন্টুর গল্প বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের একটি বড় সমস্যার কথাও বলে। আমরা খেলোয়াড় তৈরি করি, তাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস করি, তারা জেতে, হারে, অবসর নেয়। কেউ কেউ অকালে চলে যায়, তারপর সময় এগিয়ে যায়—আর তাদের জীবনকাহিনি লেখার দায়িত্ব কারোরই থাকে না।

একটি গেটের নাম গুরুত্বপূর্ণ, একটি চত্বরের নামও গুরুত্বপূর্ণ, বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠান মানুষের ভালোবাসার প্রমাণ। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের জীবনের সম্পূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। মিন্টুর মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ হওয়া উচিত, পুরোনো সহখেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকার নেওয়া উচিত। তাঁদের খেলা, ক্লাবজীবন, সংগ্রাম আর সময়টাকে নথিবদ্ধ করার কাজটা এখনো বাকি। কারণ, ক্রীড়া ইতিহাস শুধু ট্রফির ইতিহাস নয়, মানুষের ইতিহাসও।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।