আর্জেন্টিনা ফুটবল
আর্জেন্টিনা দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় এত কম কেন?
কিকি রামোসই প্রথম নন

কিকি রামোস
আর্জেন্টিনার ফুটবলে নতুন এক অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভেলেজ সার্সফিল্ডের ফরোয়ার্ড কিকি রামোস সম্প্রতি আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলে অভিষেক করেছেন। হাইতিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণ একদিন আর্জেন্টিনার সিনিয়র জাতীয় দলে খেললে তা হবে বিরল ঘটনা।
কারণ ১৯৭৩ সালের পর আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে এমন কোনো ফুটবলার খেলেননি, যার আর্জেন্টাইন শেকড় ছিল না। সেই বছর প্যারাগুয়েতে জন্ম নেওয়া এরিবের্তো কোরেয়া নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছিলেন। রামোস একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার হওয়ারও সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

রামোসের গল্পটা অন্যরকম। ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল হাইতিতে জন্ম তার। জন্মের কয়েক মাস পরই দেশটিতে আঘাত হানে ভয়াবহ ভূমিকম্প। সরকারি হিসাবে প্রাণ হারান প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। গৃহহীন হয় লাখো মানুষ। সেই দুর্যোগে একটি এতিমখানায় বেঁচে যান রামোস। পরে তাকে দত্তক নেয় একটি আর্জেন্টাইন পরিবার। আর্জেন্টিনায় বড় হয়েছেন তিনি। নিজের ভাষায়, কখনো গায়ের রং বা পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হননি। ‘আর্জেন্টিনায় আসার পর কখনো বৈষম্য অনুভব করিনি। নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে হয়নি,’ বলেছেন রামোস।
এরপর, এক প্রতিবেশীর পরামর্শে ভেলেজ সার্সফিল্ডের একাডেমিতে ট্রায়াল দেন রামোস। দ্রুতই তার প্রতিভা নজরে পড়ে। তার গতি ও খেলার ধরন দেখে অনেকেই তাকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। ২০২৫ সালে চোটের কারণে কয়েক মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে আবার নিজের সামর্থ্য দেখান। আর্জেন্টিনার যুব প্রতিযোগিতায় করেন ১২ গোল। তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ দিয়েগো প্লাসেন্তের। জাতীয় দলের ডাক পাওয়ার খবরটিও রামোস পান বেশ অপ্রত্যাশিতভাবে। অনলাইন গণিত ক্লাস চলছিল। হঠাৎ ভেলেজের ফিটনেস কোচের কাছ থেকে বার্তা আসে, “অভিনন্দন।”
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেননি। পরে একের পর এক বার্তা আসতে থাকে। বুঝতে পারেন, আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ডাক এসেছে। ক্লাস থামিয়ে ছুটে যান বাবা-মায়ের কাছে। এখন নভেম্বরে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের দলেও জায়গা পাওয়ার দৌড়ে আছেন তিনি।
প্রসঙ্গে আসি, এই দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় এত কম কেন? আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার দেশ। কিন্তু জাতীয় দলের ইতিহাসে কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার খুবই কম। ২০২৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দলেও ছিলেন না কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। তবে ইতিহাসে এমন খেলোয়াড় একেবারেই নেই, এমন ধারণা ভুল। এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন মাত্র তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার, যাদের আর্জেন্টাইন সূত্রগুলো সাধারণত আফ্রো-আর্জেন্টাইন হিসেবে উল্লেখ করে।

আলেহান্দ্রো দে লস সান্তোস
প্রথমজন আলেহান্দ্রো দে লস সান্তোস। ১৯২২ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক করেন আলেহান্দ্রো দে লস সান্তোস। তার পারিবারিক শেকড় ছিল অ্যাঙ্গোলায়। তার বাবা-মা দাসত্ব থেকে পালিয়ে এক জাহাজে করে অ্যাঙ্গোলা থেকে আর্জেন্টিনায় আসেন। পরে তিনি ভাই ও বোনকে নিয়ে বুয়েনস এইরেসে বসবাস শুরু করেন। দে লস সান্তোস পরে ফুটবলে নিজের জায়গা করে নেন। ১৯২৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী আর্জেন্টিনা দলেও ছিলেন তিনি।

রামোস দেলগাদো
এরপর রামোস দেলগাদো। দেলগাদো ছিলেন আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। ‘এল নেগ্রো’ নামে পরিচিত এই ডিফেন্ডারের বাবা ছিলেন কেপ ভার্দের বাসিন্দা। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে খেলেছেন। ক্লাব ফুটবলে লানুস, রিভার প্লেট ও বানফিল্ডের পাশাপাশি ব্রাজিলের সান্তোসেও খেলেছেন। সেখানে সতীর্থ ছিলেন কিংবদন্তি পেলে।

হেক্টর বালে
তৃতীয়জন হেক্টর বালে। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ গোলরক্ষক হেক্টর বালে। ‘চকলেট’ নামে পরিচিত এই গোলরক্ষকের পারিবারিক শেকড় ছিল সেনেগালে। তিনি উবালদো ফিলিওলের বিকল্প গোলরক্ষক ছিলেন। তবু ১৯৭৮ ও ১৯৮২—দুই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনা দলের অংশ ছিলেন। এরপর আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে জায়গা পাননি।
অথচ একসময় জনসংখ্যার বড় অংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ
আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যা আজ খুব কম। দেশটির জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ০.৭ শতাংশ নিজেদের আফ্রো-আর্জেন্টাইন হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, উনিশ শতকের শুরুতে দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। কিছু অঞ্চলে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
স্বাধীনতার যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়েছিল। অনেকেই যুদ্ধে মারা যান। পরবর্তীতে কলেরা ও হলুদ জ্বরের মতো মহামারিতেও তাদের মৃত্যুহার ছিল বেশি। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ইউরোপ থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী আর্জেন্টিনায় আসতে শুরু করেন। একই সময়ে দেশটিতে ‘শ্বেতায়ন’ নীতিও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে সময়ের সঙ্গে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যায় এবং অনেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যান।
আর্জেন্টিনার সংস্কৃতিতে তাদের ছাপ স্পষ্ট

আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের প্রভাব শুধু ফুটবলে নয়, দেশটির সংস্কৃতিতেও গভীর। ঐতিহাসিকদের মতে, আফ্রিকান নৃত্য ও ইউরোপীয় সুরের মিশ্রণ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ট্যাঙ্গো। দেশটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আফ্রো-আর্জেন্টাইন নারী মারিয়া রেমেদিওস দেল ভায়েকেও আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই নারী আহতদের সেবা করার পাশাপাশি অস্ত্রও হাতে নিয়েছিলেন। তার সম্মানে ৮ নভেম্বর পালন করা হয় আফ্রো-আর্জেন্টাইন দিবস।
নতুন ইতিহাসের সামনে কিকি
এই দীর্ঘ ইতিহাসের পর এবার সামনে এসেছে কিকি রামোসের নাম। হাইতিতে জন্ম। আর্জেন্টিনায় বেড়ে ওঠা। ভেলেজের একাডেমি থেকে জাতীয় দলে। অনূর্ধ্ব-১৭ দলে অভিষেকের পর এখন তার সামনে আরও বড় স্বপ্ন, আর্জেন্টিনার সিনিয়র জাতীয় দলের জার্সি পরা। হয়তো একদিন ‘আলবিসেলেস্তে’র জার্সিতে দেখা যাবে এক নতুন মুখ কিকি রামোসকে। যে গল্পের শুরুটা হয়েছিল হাইতির এক ভূমিকম্প থেকে বেঁচে যাওয়া ছোট্ট এক শিশুর আর্জেন্টিনায় নতুন জীবন শুরু করার মধ্য দিয়ে।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফিচাররোনালদো কি এই মৌসুমেই ছেলের সঙ্গে মাঠে নামবেন?
ফিচারমার্কো ফন বাস্তেন: উট্রেখটের রাজহাঁস
ফিচারহাসান মাহমুদের বল যে ভাষায় সফল
ফিচারফুটবল ইতিহাসে সেরা ১০ : লোনে পাঠিয়ে মাথায় হাত
ফিচারযেভাবে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের পুনর্গঠন
ফিচার
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।