যেভাবে চলছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের পুনর্গঠন
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউএস সকারও মনে করছে, বড় পরিবর্তন আনতে হলে শুরু করতে হবে তৃণমূল থেকেই। তাই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যুব ফুটবলের কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারা।

যুব ফুটবলে গুরুত্ব দিয়ে মূল দল আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
বিশ্বকাপের উত্তেজনা শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে শুরু হয়েছে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি। মাঠের ফলাফল বদলানোর পাশাপাশি এবার নজর দেওয়া হচ্ছে ফুটবলের ভিত্তি বা যুব কাঠামোর দিকে। লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলকে আরও সহজলভ্য, কম খরচের এবং সবার জন্য উন্মুক্ত করা।
দেশটির পুরুষ জাতীয় দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা অগ্রগতি করলেও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ দলগুলোর কাতারে এখনও নিজেদের স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেনি। এর পেছনে শুধু জাতীয় দলের কোচ, খেলোয়াড় বা কৌশলকে দায়ী করা হচ্ছে না। বরং সমস্যার শিকড় খোঁজা হচ্ছে আরও নিচে, যুব ফুটবলের কাঠামোয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউএস সকারও মনে করছে, বড় পরিবর্তন আনতে হলে শুরু করতে হবে তৃণমূল থেকেই। তাই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যুব ফুটবলের কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারা।

বদলাতে হবে ‘পে-টু-প্লে’ সংস্কৃতি
যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা ‘পে-টু-প্লে’ ব্যবস্থা। অর্থাৎ, একটি শিশুকে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে খেলতে হলে তার পরিবারকে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। ভালো ক্লাবে খেলা, প্রশিক্ষণ নেওয়া, টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া, দূরের শহরে ম্যাচ খেলতে যাওয়া—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বাড়তি খরচ। ফলে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরা বেশি সুযোগ পায়। অন্যদিকে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ফুটবল থেকে ঝরে পড়ে। ইউএস সকারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ড্যান হেলফ্রিচও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ফুটবলকে যতটা সাশ্রয়ী করা দরকার ছিল, তারা তা করতে পারেনি। তবে এবার শুধু খরচ কমানোর পরিকল্পনা নয়। ইউএস সকার চাইছে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেখানে শুরু থেকেই ফুটবল হবে সাশ্রয়ী। অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থাকে সস্তা করার বদলে পুরো ব্যবস্থাটিই নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায় তারা।
চার স্তম্ভে নতুন পরিকল্পনা
এই বড় পরিবর্তনের জন্য চারটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইউএস সকার—সমন্বয়, কোচিং, খরচ এবং অবকাঠামো। প্রথমেই আসছে সমন্বয়। যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবল ব্যবস্থা বর্তমানে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন লিগ, ক্লাব ও সংগঠন নিজেদের মতো করে কার্যক্রম চালায়। এর ফলে একটি দলের কাছাকাছি এলাকায় পর্যাপ্ত প্রতিপক্ষ থাকলেও অনেক সময় তাদের খেলতে যেতে হয় দূরের শহর বা অন্য অঙ্গরাজ্যে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের ওপর। যাতায়াত, হোটেল, খাবারসহ বিভিন্ন খরচ বেড়ে যায়। ফুটবলের এই দীর্ঘ ভ্রমণনির্ভর সংস্কৃতিকে অনেকেই ‘সকার ট্যুরিজম’ বলে থাকেন। এই পরিস্থিতি বদলাতে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতাকে আরও বেশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনা করছে ইউএস সকার। এতে কাছাকাছি ক্লাবগুলোর মধ্যে বেশি ম্যাচ হবে, কমবে দীর্ঘ ভ্রমণ। একই সঙ্গে অভিভাবকদের খরচও কমবে।

প্রতিভা খোঁজার নতুন পদ্ধতি
শুধু খরচ কমানো নয়, প্রতিভা খুঁজে বের করার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে চায় ইউএস সকার। এ জন্য একটি জাতীয় ‘ট্যালেন্ট আইডি’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়কে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের আওতায় আনা হবে। সে কোন ক্লাব বা লিগে খেলছে, সেটি তখন আর বড় বাধা হবে না। জাতীয় দলের স্কাউট ও কোচরা একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, ম্যাচ ও ভিডিও ফুটেজ অনুসরণ করতে পারবেন। ফলে কোনো ছোট ক্লাবের প্রতিভাবান খেলোয়াড় শুধু বড় ক্লাবে না খেলার কারণে স্কাউটদের নজরের বাইরে থাকবে না।
বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলে আরেকটি বড় পরিবর্তন আনতে চায় ইউএস সকার—শিশুদের উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও সহজ করা। বর্তমানে অনেক পরিবারকে একটি শিশুর ফুটবল ক্যারিয়ার চালিয়ে নিতে প্রতিবছর হাজার হাজার ডলার খরচ করতে হয়। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় অল্প বয়সেই ফুটবল ছেড়ে দেয়। ইউএস সকারের পরিকল্পনা হলো, শিশুদের স্থানীয় লিগে খেলার সুযোগের পাশাপাশি বিনামূল্যে বা কম খরচে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া। অবশ্য এর জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। ইউএস সকারের প্রধান নির্বাহী জেটি ব্যাটসনও মনে করেন, ‘বিনামূল্যে’ কোনো কিছু দেওয়া হলেও তার পেছনে অর্থের প্রয়োজন হয়। সেই অর্থ আসতে হবে বিভিন্ন উৎস থেকে। ইউএস সকারের বার্ষিক আয় ইতোমধ্যেই ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদার, স্পনসর, ফিফার উন্নয়ন তহবিল এবং সরকারি সহায়তা যোগ করে যুব ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য পরিষ্কার—শুধু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কারণে যেন কোনো প্রতিভাবান শিশু ফুটবল থেকে হারিয়ে না যায়।
ফুটবলের নতুন ঠিকানা হতে পারে স্কুল
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিতে স্কুলকেও বড় ভূমিকা দিতে চায় ইউএস সকার। শিশুদের ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ জায়গাগুলোর একটি হলো স্কুল। এ কারণেই ‘সকার ইন স্কুলস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি স্কুলে ফুটবলকে সহজলভ্য করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলভিত্তিক খেলাধুলার মধ্যে বাস্কেটবল, আমেরিকান ফুটবল ও বেসবলের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। ইউএস সকার চাইছে ফুটবলও একইভাবে স্কুলের নিয়মিত ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠুক। এর ফলে শুধু সুবিধাভোগী পরিবারের সন্তান নয়, দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের শিশুরাও ফুটবল খেলার সুযোগ পাবে। আর এখান থেকেই ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হবে।

তৈরি হবে আরও ভালো কোচ
ভালো খেলোয়াড় তৈরির জন্য ভালো কোচের প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলে দক্ষ কোচের ঘাটতিও বড় সমস্যা। যেসব কোচ ভালো, তাদের অনেকেই বেশি পারিশ্রমিকের আশায় বয়সভিত্তিক ছোট দলের বদলে কলেজ বা পেশাদার ফুটবলে চলে যান। ফলে শিশুদের প্রশিক্ষণের জায়গায় মানসম্পন্ন কোচের সংকট তৈরি হয়। এই সমস্যা সমাধানে কলেজ ফুটবল শেষ করা হাজার হাজার খেলোয়াড়কে কোচিং পেশায় আনার পরিকল্পনা করছে ইউএস সকার। তাদের দ্রুত কোচিং লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগ তৈরি করার চিন্তা রয়েছে। এ ছাড়া ‘টিচ ফর আমেরিকা’ বা ‘পিস কর্পস’-এর আদলে একটি কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ কোচদের এমন সব এলাকায় পাঠানো হবে, যেখানে ভালো কোচের সংখ্যা কম। অর্থাৎ নতুন খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি নতুন কোচ তৈরির ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বদল আসবে ধীরে
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল সংস্কারের চেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বড় বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়নি। এবারের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু জাতীয় দলকে শক্তিশালী করার দিকে নজর না দিয়ে পুরো ব্যবস্থাটিকেই বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর ফল রাতারাতি পাওয়া যাবে না। আজ যে শিশুকে স্কুলের মাঠে ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, সে হয়তো ১০-১৫ বছর পর জাতীয় দলের জার্সি পরবে। তাই এই সংস্কারের সাফল্য মাপতে সময় লাগবে। তারপরও ইউএস সকারের উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শক্তিশালী জাতীয় দল তৈরি করতে হলে শক্তিশালী হতে হয় তৃণমূলকে। ফুটবলকে যদি শুধু ধনী পরিবারের শিশুদের খেলা না রেখে সবার জন্য উন্মুক্ত করা যায়, তাহলে প্রতিভার পরিধিও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে ঘিরে থাকা ব্যয়বহুল ও বিচ্ছিন্ন কাঠামো বদলে যদি আরও সমন্বিত, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তাহলে এর সুফল শুধু যুব ফুটবলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে জাতীয় দলেও তার প্রভাব পড়বে। হয়তো এই পরিবর্তনের ফল দেখতে এক বিশ্বকাপ বা দুই বিশ্বকাপ অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ফুটবলের ভিত্তিটা শক্ত করতে পারে, তাহলে আগামী এক-দুই দশকে বিশ্ব ফুটবলের শক্তির মানচিত্রে দেশটির অবস্থানও বদলে যেতে পারে।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফিচাররোনালদো কি এই মৌসুমেই ছেলের সঙ্গে মাঠে নামবেন?
ফিচারমার্কো ফন বাস্তেন: উট্রেখটের রাজহাঁস
ফিচারহাসান মাহমুদের বল যে ভাষায় সফল
ফিচারফুটবল ইতিহাসে সেরা ১০ : লোনে পাঠিয়ে মাথায় হাত
ফিচারআর্জেন্টিনা দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় এত কম কেন?
ফিচার
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।