খেলারদেশ

ইতালি ফুটবল

ইতালীয় ফুটবল ইতিহাসের ১৩ কেলেঙ্কারি

সম্প্রতি আন্দ্রেয়া পিরলোর ইতালি জাতীয় দলের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা ভেস্তে যায় এক রাশিয়ান বেটিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের কারণে। তবে এটাই ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি না। ইতালীয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ১৩টি ঘটনা বা কেলেঙ্কারির তালিকা করা হলো।

ইতালীয় ফুটবল ইতিহাসের ১৩ কেলেঙ্কারি
রনক জামান
By রনক জামান

ইতালিয়ান ফুটবল শুধু বিশ্বসেরা ক্লাব, কিংবদন্তি খেলোয়াড় কিংবা বিশ্বকাপ জয়ের জন্যই বিখ্যাত নয়। এর ইতিহাসে রয়েছে অসংখ্য বিতর্ক, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিও। কখনও ম্যাচ পাতানো, কখনও অবৈধ বেটিং, কখনও জাল পাসপোর্ট, আবার কখনও আর্থিক জালিয়াতি। এসবের কারণে শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ক্লাবকে পয়েন্ট টেবিল থেকে নিচে নামিয়ে দেয়ার ঘটানো হয়েছে, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সম্প্রতি আন্দ্রেয়া পিরলোর ইতালি জাতীয় দলের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা ভেস্তে যায় এক রাশিয়ান বেটিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের কারণে। তবে এটাই ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি না। ইতালীয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ১৩টি ঘটনা বা কেলেঙ্কারির তালিকা করলে—

১. আলেমান্দি কাণ্ড (১৯২৭)

Image

তোরিনো এফসি প্রথমবারের মতো লিগ জিতলেও পরে অভিযোগ ওঠে যে তারা লুইজি আলেমান্দিকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তদন্তের পর তোরিনোর শিরোপা বাতিল করা হয়। মজার বিষয়, শিরোপাটি রানার্সআপকেও দেওয়া হয়নি সেইবার। ফলে ইতালির লিগে, ১৯২৬-২৭ মৌসুম আজও ‘চ্যাম্পিয়নবিহীন’ হিসেবে রয়ে গেছে।

২. নাপোলি কেলেঙ্কারি (১৯৪৮)

অভিযোগ ছিল, নাপোলির এক খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে পূর্ণ শক্তিতে না খেলতে অনুরোধ করেছিলেন। ঘটনাটি ঘুষের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্লাব কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের আজীবন নিষিদ্ধ করা হয় এরপর।

৩. উদিনেজে ও কাতানিয়ার অবনমন (১৯৫৫)

Image

উদিনেজে লিগে রানার্সআপ হওয়ার পরও ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে সিরি বি-তে নামিয়ে দেওয়া হয়। একই বছর কাতানিয়াকেও দুর্নীতির অভিযোগে রেলিগেট করে নিচের স্তরে নামানো হয়। কয়েকজন খেলোয়াড় ও রেফারিকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

৪. টোটোনেরো কেলেঙ্কারি (১৯৮০)

Image

ইতালির প্রথম বড় ম্যাচ-ফিক্সিং ও অবৈধ বেটিং কেলেঙ্কারি। এসি মিলান ও লাজিওকে সিরি বি-তে নামিয়ে দেওয়া হয়। পাওলো রসিসহ অনেক তারকা নিষিদ্ধ হন এই ঘটনায়। পরে রসি ফিরে এসে ১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালিকে শিরোপা জেতান।

৫. টোটোনেরো-২ (১৯৮৬)

ফোনে আড়ি পাততে গিয়ে নতুন ম্যাচ-ফিক্সিং চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। ভিচেঞ্জা ক্লাবের সিরি আ-তে পাওয়া প্রমোশন বাতিল হয়। একাধিক ক্লাবের পয়েন্ট কাটা হয় এবং অনেক কর্মকর্তা নিষিদ্ধ হন।

৬. জফ বনাম বারলুসকোনি (২০০০)

Image

ইউরো ২০০০ ফাইনালে হারের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনি প্রকাশ্যে কোচ দিনো জফ-এর সমালোচনা করেন। অপমানিত বোধ করে জফ পদত্যাগ করেন।

৭. জাল পাসপোর্ট কেলেঙ্কারি (২০০১)

বিদেশি খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক দেখাতে জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করা হয়। আলভারো রেকোবা, দিদাসহ বহু খেলোয়াড় নিষিদ্ধ হন। একাধিক ক্লাবকে বড় অঙ্কের জরিমানাও করা হয়।

৮. জেনোয়া-ভেনেজিয়া ম্যাচ ফিক্সিং (২০০৫)

Image

জেনোয়া সিরি বি জিতে সিরি আ-তে উঠলেও ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে শাস্তি পায়। ক্লাবকে সরাসরি তৃতীয় স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়। ক্লাব প্রেসিডেন্টও পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা পান।

৯. ক্যালচিওপোলি (২০০৬)

Image

ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। ইউভেন্টাসের বিরুদ্ধে রেফারি নিয়োগে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এতে ২০০৪-০৫ মৌসুমের শিরোপা বাতিল হয়। ২০০৫-০৬ মৌসুমের শিরোপা ইন্টার মিলানকে দেওয়া হয়। ইউভেন্টাসকে ইতিহাসে প্রথমবার সিরি বি-তে নামিয়ে দেওয়া হয়। লুসিয়ানো মোজ্জি আজীবন নিষিদ্ধ হন।

১০. স্কোম্মেসোপোলি (২০১১–১২)

আরেকটি বিশাল বেটিং ও ম্যাচ-ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। ক্রিস্তিয়ানো দোনি, জিউসেপ্পে সিঞোরিসহ বহু খেলোয়াড় নিষিদ্ধ হন। আন্দ্রেয়া মাসিয়েল্লো স্বীকার করেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মঘাতী গোল করেছিলেন।

১১. কাতানিয়া কেলেঙ্কারি (২০১৫)

Image

ক্লাব প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেন, রেলিগেশন এড়াতে তিনি কয়েকটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে অর্থ দিয়েছিলেন। এতে কাতানিয়াকে তৃতীয় বিভাগে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্টও পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন।

১২. ইউভেন্টাসের নকল ট্রান্সফার (২০২৩)

Image

খেলোয়াড়দের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে আর্থিক হিসাব ঠিকঠাক দেখানোর অভিযোগ ওঠে। ইউভেন্টাসের ১০ পয়েন্ট কাটা হয়। সাবেক সভাপতি আন্দ্রেয়া আনিয়েল্লি ও ফাবিও পারাতিচি নিষিদ্ধ হন। একই বছর উয়েফা আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের কারণে ইউভেন্টাসকে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা থেকেও বহিষ্কার করে।

১৩. ফাজিওলি-টোনালি-জানিওলো বেটিং কাণ্ড (২০২৩)

অবৈধ বেটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। নিকোলো ফাজিওলি ও সান্দ্রো টোনালি দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা পান। নিকোলো জানিওলো তদন্তে থাকলেও ফুটবলে বাজি ধরার প্রমাণ না পাওয়ায় শাস্তি এড়িয়ে যেতে সমর্থ হন। তদন্তে পরে নিকোলো পিরলোর নামও উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তিনি অবৈধ বেটিং সাইট ব্যবহার করে বড় অঙ্কের ঋণে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এইসব কেলেঙ্কারি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এগুলো দেশটির ফুটবল কাঠামো, নিয়মকানুন এবং সুশাসনকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তবুও প্রতিটি সংকটের পর ইতালিয়ান ফুটবল আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যা এই ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতির স্থিতিশীলতা ও পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রমাণ।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।