অস্ট্রেলিয়া বনাম বাংলাদেশ টেস্ট
‘এটা স্রেফ আরেকটা ম্যাচ না’
‘এটা স্রেফ আরেকটা ম্যাচ না’—২২ বছর পর ডারউইনের টেস্ট পিচ তৈরিতে বাড়তি চাপ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনে ডারউইনের প্রত্যাবর্তনের আগে মারারা ওভালের পিচ প্রস্তুত করা হচ্ছে
আগামী ১৩ আগস্ট হবে জেক পাভলিচের পেশাদার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেটের গ্রাউন্ডস অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনিই প্রস্তুত করছেন ডারউইনের ২২ বছর পরের প্রথম টেস্ট পিচ, যেখানে মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশ।
২০২৪ সালে নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেটে যোগ দেওয়ার আগে প্রায় দুই দশক অ্যাডিলেডের স্যাক্রেড হার্ট কলেজ এবং কারেন রলটন ওভাল-এ কাজ করেছেন পাভলিচ। তবে তিনি জানেন, ডারউইনের এই টেস্ট ম্যাচ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে তিনি বলেন,
দীর্ঘ ২২ বছর পর ডারউইনে টেস্ট ক্রিকেট ফিরছে। তাই এই ম্যাচকে ঘিরে শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নয়, আয়োজকদের মধ্যেও রয়েছে বাড়তি উত্তেজনা ও দায়িত্ববোধ। আর সেই ঐতিহাসিক উপলক্ষের কেন্দ্রে রয়েছেন পিচ প্রস্তুতকারক জেক পাভলিচ, যার লক্ষ্য এমন একটি উইকেট তৈরি করা, যা টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদার সঙ্গে মানানসই হবে।
টেস্টের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি, পিচে গতি ও বাউন্স ধরে রাখতে চান কিউরেটর
গত বছর ১৭ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ডারউইনে ফিরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের মাধ্যমে। সেই সিরিজে তৈরি করা উইকেট নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেটের প্রধান কিউরেটর জেক পাভলিচ। প্রথম ম্যাচে টিম ডেভিড ৫২ বলে ৮৩ রান করেন, আর দ্বিতীয় ম্যাচে ডেওয়াল্ড ব্রেভিস মাত্র ৫৬ বলে ১২৫ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তবে পাভলিচের মতে, সাদা বলের ক্রিকেটের উইকেট তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য পিচ প্রস্তুত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
আগামী অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ টেস্ট উপলক্ষে ব্যবহৃত ড্রপ-ইন পিচ দুই সপ্তাহ আগে মারারা ওভাল (স্পন্সর নাম TIO স্টেডিয়াম)-এর মাঝখানে বসানো হয়েছে। এখন সেখানে নিয়মিত পানি দেওয়া, রোলিং ও ঘাস কাটা চলছে। যদিও অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য টেস্ট ভেন্যুর তুলনায় ডারউইনের অবকাঠামো এবং পিচ তৈরির নার্সারি কিছুটা সীমিত, তবুও নিজের কাজ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী পাভলিচ।
গত বছর অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ বনাম শ্রীলঙ্কা ‘এ’ চার দিনের ম্যাচের জন্য তৈরি করা ড্রপ-ইন পিচ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ ২৭২ রানে অলআউট হয়েছিল, যেখানে পেসার ও স্পিনার—দুই ধরনের বোলারই সাফল্য পান। তবে পরে উইকেট অনেকটাই ব্যাটিংবান্ধব হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ ৪৮৬ রান তোলে, যেখানে পাঁচজন ব্যাটার হাফসেঞ্চুরি করেন। তাদের একজন জেক ওয়েদারাল্ড, যিনি এবার বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট দলে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ দিনে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ সহজেই ম্যাচ ড্র করে।
আসন্ন টেস্টে দুই দলেই রয়েছে শক্তিশালী পেস আক্রমণ। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে থাকতে পারেন মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স, আর বাংলাদেশের হয়ে নাহিদ রানা ও তাসকিন আহমেদ। তাই উইকেটের আচরণ নিয়ে সবার আগ্রহ থাকবে। পাভলিচ চান, এবার পিচে যেন ম্যাচের পরের দিকেও গতি ও মুভমেন্ট কিছুটা বজায় থাকে। তিনি বলেন,
২২ বছর পর ডারউইনে ফিরতে যাওয়া টেস্ট ক্রিকেটে পিচের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা ভালোভাবেই জানেন পাভলিচ। আর তাঁর লক্ষ্য, এমন একটি উইকেট তৈরি করা, যেখানে ব্যাট ও বল—উভয়ের মধ্যেই থাকবে ন্যায্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
আবহাওয়া, শিশির ও পোকামাকড়—টেস্ট পিচ প্রস্তুতিতে নানা চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টের আর এক মাস বাকি থাকা উপলক্ষে ডারউইনে নাথান লায়ন
অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক টেস্টের আগে ডারউইনের পিচ প্রস্তুত করতে গিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রধান কিউরেটর জেক পাভলিচ। তিনি জানান, বছরের এই সময়ে তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গেলেই ঘাসের বৃদ্ধি হঠাৎ করেই অনেক ধীর হয়ে যায়।
"তাপমাত্রা সামান্য কমলেই হঠাৎ করে ঘাসের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।"
এ ছাড়া ভোরবেলায় ভারী শিশির এবং আর্দ্রতাও বড় একটি বিষয়। ম্যাচের সকালে উইকেটে থাকা এই আর্দ্রতা টসজয়ী অধিনায়কের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও মাইটস ঘাসের ঘনত্ব কমিয়ে দিতে পারে, যা পিচের আচরণে প্রভাব ফেলে।
বিশেষ ঘাস, তারপরও জটিলতা
ডারউইনের টেস্ট উইকেটে ব্যবহার করা হয়েছে লিজেন্ড কাউচ (Legend Couch) ঘাস। তবে পাভলিচ জানান, বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস একসঙ্গে মিশে যাওয়ার (হাইব্রিডাইজিং) প্রবণতা থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়, "এটা সামলানো কিছুটা কঠিন। তবে টেস্ট উইকেটের ঘাসের আবরণ বেশ সমান ও ধারাবাহিক, যা ইতিবাচক দিক।"
কিংবদন্তি কিউরেটরের পরামর্শ
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি কিউরেটর লেস বারডেট সম্প্রতি ডারউইন সফর করেন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পিচ তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তিনি পরামর্শ দিলেও কোনো নির্দেশ চাপিয়ে দেননি।
পাভলিচ বলেন, "তারা আমাদের ওপর আস্থা রাখে এবং নিজেদের মতো কাজ করার স্বাধীনতা দেয়। সেই আস্থার মর্যাদা রাখার চেষ্টা করছি। তবে লেস বারডেট জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার। তাঁর মতো মানুষের পরামর্শ সবসময়ই নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।"
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সূচি বিভাগের প্রধান পিটার রোচও পাভলিচের কাজের প্রশংসা করেছেন। "জেক পাভলিচের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি দারুণ কাজ করছেন। পিচ খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং প্রস্তুতির জন্য তিনি যথেষ্ট সময় পেয়েছেন।"
অস্ট্রেলিয়ার অন্য রাজ্যগুলোর তুলনায় নর্দার্ন টেরিটরির ক্রিকেট মৌসুম ভিন্ন হলেও দেশের অন্যান্য কিউরেটরদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন পাভলিচ। "সব কিউরেটরের মধ্যেই খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। সবাই জানে আমরা একই ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করি।"
আগামী ১৩ আগস্ট, টেস্টের উদ্বোধনী দিনের ঠিক আগে ম্যাচ কর্মকর্তাদের হাতে পিচ তুলে দেবেন পাভলিচ। এরপর তাঁর কাজ শেষ, শুরু হবে ক্রিকেটারদের। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, "পিচ হস্তান্তরের পর আমি ছায়ায় গিয়ে বসব। এখানে তখন বেশ গরম থাকবে। সেখান থেকে ম্যাচ দেখব এবং আশা করব, দারুণ একটি টেস্ট ম্যাচ উপহার দিতে পারব।"
২২ বছর পর ডারউইনে ফিরছে টেস্ট ক্রিকেট। আর সেই প্রত্যাবর্তনের অন্যতম নেপথ্য নায়ক জেক পাভলিচের আশা—অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের লড়াই এমন একটি উইকেটে হবে, যা পাঁচ দিনজুড়ে ব্যাট ও বলের মধ্যে সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপহার দেবে।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।