স্পেন, মার্ক কুকুরেয়া
মার্ক কুকুরেয়ার অজানা তথ্য
চুলই তার পরিচয় নয়: মার্ক কুকুরেয়া সম্পর্কে অজানা ও অদ্ভুত কিছু তথ্য

বিশ্বকাপজয়ী মার্ক কুকুয়েরা
বিশ্ব ফুটবলে মার্ক কুকুরেয়াকে চিনতে খুব বেশি সময় লাগে না। তার ঘন, কোঁকড়ানো লম্বা চুলই যেন আলাদা একটি পরিচয়। কিন্তু এই স্প্যানিশ লেফট-ব্যাকের জীবন শুধু সেই বিখ্যাত চুলের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বার্সেলোনার লা মাসিয়া থেকে শুরু করে প্রিমিয়ার লিগ, ইউরো জয় এবং বিশ্বকাপ—কুকুরেয়ার যাত্রায় রয়েছে অসংখ্য মজার, অজানা এবং অবাক করা গল্প।

জন্ম থেকেই তার ডাকনাম ছিল 'কুকু'
শৈশব থেকেই পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন "কুকু"। পরে তার পদবি কুকুরেয়া থেকেই এই ডাকনাম আরও জনপ্রিয় হয়ে যায়। আজও সতীর্থরা তাকে "কুকু" বলেই ডাকেন।

চুল কাটতে তার অনীহা
কুকুরেয়ার কোঁকড়ানো লম্বা চুল এখন তার ট্রেডমার্ক। বহুবার ভক্তরা চুল কাটার অনুরোধ করলেও তিনি তা এড়িয়ে গেছেন। তার মতে, এই চুলই তাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে এবং মাঠে আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়।

মেসির সঙ্গে একই একাডেমিতে বেড়ে ওঠা
বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন কুকুরেয়া। যদিও সিনিয়র দলে লিওনেল মেসির সঙ্গে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাননি, তবে একই ফুটবল দর্শনে বড় হয়েছেন তিনি।
ফরোয়ার্ড থেকে ডিফেন্ডার
অনেকেই জানেন না, ছোটবেলায় তিনি মূলত একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় ছিলেন। পরে কোচরা তার অসাধারণ স্ট্যামিনা, দৌড় এবং রক্ষণে অবদান রাখার ক্ষমতা দেখে তাকে লেফট-ব্যাকে রূপান্তর করেন।
এক ম্যাচে ১২ কিলোমিটারেরও বেশি দৌড়ানো তার জন্য অস্বাভাবিক নয়
কুকুরেয়া আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পরিশ্রমী ফুল-ব্যাক। ম্যাচে ১১–১৩ কিলোমিটার দৌড়ানো তার জন্য নিয়মিত ঘটনা। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই সমান অবদান রাখতে তিনি পরিচিত।

বার্সেলোনা ছেড়ে নিজের পরিচয় গড়েছেন
লা মাসিয়া থেকে উঠে এলেও বার্সেলোনার মূল দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অনেকেই ভেবেছিলেন, তার ক্যারিয়ার হয়তো সেখানেই থেমে যাবে। কিন্তু এইবার, গেতাফে, ব্রাইটন এবং পরে চেলসিতে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় ক্লাব ছাড়াও বিশ্বমানের ফুটবলার হওয়া সম্ভব।

সবসময় লড়াকু মানসিকতা
মাঠে কুকুরেয়া কখনো সহজে হার মানেন না। প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, তিনি একই আগ্রাসন ও উদ্যম নিয়ে খেলেন। তার এই মানসিকতার জন্যই কোচরা তাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন।
রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও আক্রমণে সমান কার্যকর
কুকুরেয়ার শক্তি শুধু ট্যাকল বা বল কেড়ে নেওয়ায় নয়। ওভারল্যাপিং রান, ক্রস এবং আক্রমণ গঠনে তার অবদান তাকে আধুনিক উইং-ব্যাকদের অন্যতম সফল উদাহরণে পরিণত করেছে।

সামাজিক মাধ্যমে সহজ-সরল জীবনযাপন
বিশ্ব তারকা হয়েও সামাজিক মাধ্যমে বিলাসবহুল জীবন প্রদর্শনের চেয়ে পরিবার, সন্তান এবং সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই বেশি শেয়ার করেন কুকুরেয়া। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত শান্ত ও পারিবারিক মানুষ হিসেবে পরিচিত।

ইউরো থেকে বিশ্বকাপ—স্পেনের সোনালি প্রজন্মের অন্যতম মুখ
২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ জয়—এই দুই ঐতিহাসিক সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কুকুরেয়া। মাঠে তার নিরলস পরিশ্রম, রক্ষণে দৃঢ়তা এবং আক্রমণে সমর্থন স্পেনের নতুন সোনালি প্রজন্মের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চুলের আড়ালে এক যোদ্ধার গল্প
মার্ক কুকুরেয়াকে অনেকে প্রথমে তার চুলের জন্য চিনলেও, তাকে মনে রাখা হবে তার লড়াকু মানসিকতা, অদম্য পরিশ্রম এবং দলকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করার জন্য। আধুনিক ফুটবলে তিনি প্রমাণ করেছেন, সব নায়ক গোল করেন না—অনেক নায়ক তৈরি হয় প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি স্প্রিন্ট এবং প্রতিটি আত্মত্যাগের মাধ্যমে। এটা তার ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান দেখলেই অনুমান করতে সহজ হবে।
আগেই বলেছি, স্পেনের কাতালোনিয়ায় জন্ম নেওয়া মার্ক কুকুরেয়ার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমি থেকে। সিনিয়র পর্যায়ে বার্সেলোনা বি দলের হয়ে ৫৪ ম্যাচ খেললেও মূল দলে সুযোগ পান মাত্র একটি ম্যাচে। এরপর এইবারে ধারে খেলতে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেন এবং ৩৩ ম্যাচে ২ গোল করেন।
এরপর হেতাফেতে স্থায়ীভাবে যোগ দিয়ে তার ক্যারিয়ারে বড় মোড় আসে। দুই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৮৬ ম্যাচে মাঠে নেমে ৪ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেন। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২১ সালে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নে যোগ দেন। সেখানে মাত্র এক মৌসুমেই ৩৮ ম্যাচ খেলে ১ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০২২ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে কুকুরেয়া ১৪০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন। এই সময়ে তিনি ১০টির বেশি গোল ও ১৫টির বেশি অ্যাসিস্ট করেছেন। চেলসির হয়ে তিনি ইএফএল কাপ এবং উয়েফা কনফারেন্স লিগ জয়ের স্বাদও পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলেও কুকুরেয়ার পথচলা সমানভাবে উজ্জ্বল। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের হয়ে খেলার পর ২০২১ সালে সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। এরপর থেকে তিনি ৪৫টির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং একটি গোল করেছেন।

স্পেনের সোনালি প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কুকুরেয়া ২০২৪ সালে উয়েফা ইউরো জয় এবং ২০২৬ সালে ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেন। নিরলস পরিশ্রম, রক্ষণে দৃঢ়তা এবং আক্রমণে কার্যকর অবদানের কারণে তিনি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য লেফট-ব্যাক হিসেবে বিবেচিত। আর এ কারণেই হয়ত রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে ভেড়াতে ভুল করেনি।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।