খেলারদেশ

ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি : সিলভিও গাজ্জানিগা

বিশ্বকাপ শিরোপা নির্মাণের গল্প

যেভাবে এক ইতালীয় ভাস্কর তৈরি করেছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে কিংবদন্তি ট্রফি

বিশ্বকাপ শিরোপা নির্মাণের গল্প

যেভাবে এক ইতালীয় ভাস্কর তৈরি করেছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে কিংবদন্তি ট্রফি

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

বাংলাদেশ সময় সোমবার, বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনা বা স্পেন—যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক না কেন, সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হবে অধিনায়কের হাতে সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এটিই ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্যের প্রতীক।

কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই ট্রফির পেছনে রয়েছে এক ইতালীয় ভাস্করের অসাধারণ শিল্পভাবনা। সিলভিও গাজ্জানিগা—এমন একটি ট্রফি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা স্রেফ পুরস্কার না। বরং ফুটবলের আবেগ, সংগ্রাম ও বিজয়ের গল্পও তুলে ধরবে।

এর যাত্রা শুরু হয়েছিল মিলানে। ১৯৭০ বিশ্বকাপের পর নতুন ট্রফির প্রয়োজন হয়। কারণ সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তিনবার ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতলে ট্রফি হিসেবে ‘জুলে রিমে ট্রফি’ স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখার অধিকার পেত। ব্রাজিল ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে সেই ট্রফির স্থায়ী মালিক হয়। এরপর ফিফা নতুন বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

Image

ইতালির মিলানের ঐতিহাসিক ব্রেরা এলাকায় নিজের স্টুডিওতে বসে সিলভিও গাজ্জানিগা অসংখ্য নকশা আঁকেন। অবশেষে তিনি এমন একটি ধারণা খুঁজে পান, যা পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়। তার ছেলে জর্জিও গাজ্জানিগা পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন,

বাবা অসংখ্য স্কেচ এঁকেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি ধারণা তৈরি করেন, যেখানে পৃথিবীকে দুইটি মানব আকৃতি উপরের দিকে তুলে ধরছে। পুরো নকশাটি দেখতে ডিএনএর দুইটি সর্পিল রেখার মতো মনে হয়।

আর এই ট্রফির প্রতিটি অংশের রয়েছে অর্থ ও তাৎপর্য। বিশ্বকাপ ট্রফির নকশায় দুইজন মানবাকৃতিকে দেখা যায়, যারা হাত উঁচু করে পৃথিবীকে ধারণ করেছে। জর্জিও গাজ্জানিগার ভাষায়, “পৃথিবীই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।” তার মতে, উপরের দিকে ওঠা দুই মানবাকৃতির প্রসারিত হাত শুধু ফুটবলারদের বিজয় নয়, বরং দর্শকদের উল্লাস এবং মানবতার সম্মিলিত আনন্দেরও প্রতীক। এ কারণেই বিশ্বকাপ ট্রফি শুধু একটি শিরোপা নয়; এটি সংগ্রাম, সাফল্য এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের প্রতীক।

আর এই ট্রফিই হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তির স্থান নিয়েছিল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করা হয়েছিল জুলে রিমে ট্রফি। গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকি-র আদলে তৈরি সেই ট্রফি দীর্ঘদিন বিশ্বকাপের প্রতীক ছিল। তবে এর ইতিহাসও নাটকীয়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডে প্রদর্শনীর সময় ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। কয়েক দিন পর পিকলস নামের একটি কুকুর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচে সেটি খুঁজে পায়। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি আবার চুরি হয়। এবার আর সেটি উদ্ধার করা যায়নি। ধারণা করা হয়, ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই ঘটনার পর গাজ্জানিগার তৈরি নতুন ট্রফির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

Image

এরপর ফিফার নতুন ট্রফি ডিজাইনের জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ৫০ জনের বেশি শিল্পী অংশ নিয়েছিলেন। জর্জিও গাজ্জানিগার মতে, তার বাবাই একমাত্র প্রতিযোগী ছিলেন, যিনি শুধু স্কেচ নয়, সম্পূর্ণ ত্রিমাত্রিক (3D) মডেল জমা দিয়েছিলেন। এতে বিচারকেরা ট্রফির সৌন্দর্য ও এর প্রতীকী অর্থ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।

সিলভিও গাজ্জানিগা ইতালির জিডিই বারতোনি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বিশ্বকাপ ট্রফির আগে তিনি উয়েফা কাপ ও উয়েফা সুপার কাপসহ আরও বেশ কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ ট্রফির নকশা করেছিলেন। তবে বিশ্বকাপ ট্রফিই তাকে অমর করে রেখেছে।

বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার (১৪.৫ ইঞ্চি)। এটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি এবং এর ওজন প্রায় ৬.১৭৫ কেজি। নিচের অংশে রয়েছে সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের দুটি বৃত্ত, যা ফুটবল মাঠের প্রতীক। বিশ্বকাপজয়ী দল ফাইনালের পর আসল ট্রফি হাতে উদযাপন করলেও সেটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। উদযাপন শেষে ট্রফিটি আবার ফিফার সুইজারল্যান্ডের সদর দপ্তরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। চ্যাম্পিয়ন দলকে পরে আসল ট্রফির পরিবর্তে স্বর্ণমণ্ডিত একটি প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) প্রদান করা হয়।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিলভিও গাজ্জানিগার এই সৃষ্টি শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত এবং কাঙ্ক্ষিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।