যেভাবে ফ্রান্সের দর্পচূর্ণ করলো স্পেন
উড়তে থাকা ফ্রান্সকে মাটিতে নামিয়ে এনে অহং চূর্ণ করে দিয়েছে স্পেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালটি ২-০ গোলে জিতে ফাইনালের টিকিট কেটেছে লা রোহা দল। কোন কোন জায়গায় ফ্রান্সকে ধরাশায়ী করে শিরোপা থেকে একধাপ কাছে চলে গেলো স্পেন, সেসব কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে খেলার দেশ।

বিশ্বকাপ ফুটবলে জায়গা নিশ্চিত করার পর স্পেনের খেলোয়াড়দের উল্লাস
অনমনীয় গতিতে ছুটে চলা ফ্রান্সকে মাটিতে নামিয়ে এনে দর্পচূর্ণ করেছে স্পেন। দুই দলের সেমিফাইনালটিকে দুনিয়াব্যাপি ফুটবল ভক্তরা ফাইনালের আগে ফাইনাল খেলা ধরে নিয়েছিলেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তো বটেই, ফুটবলের ধ্রুপদী ছন্দের পসরা দেখার বাসনা ছিলো সবার। কিন্ত ম্যাচটি হয়েছে একপেশে, ধ্রুপদি ফুটবল যেটুকুই দেখা গেছে, তার সবটুকুই স্পেনের ফুটবলারদের কাছ থেকে। ফ্রান্সকে বলতে গেলে হেসেখেলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেছে স্পেন। প্রথমার্ধে লামিন ইয়ামালের আদায় করা পেনাল্টিতে গোল করে লা রোহা দলকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন মিকেল অয়রাজাবাল। দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান ২-০ করেন পুরো ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলে ম্যাচ সেরা হওয়া ফুলব্যাক পেদ্রো পোরো।
ঠিক কোন কোন জায়গায় ২০১০-এর চ্যাম্পিয়ন স্পেন দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ও গতবারের রানার আপ ফ্রান্সকে শতভাগ পরাস্ত করে গত ইউরোর মতো বিশ্বকাপ ফাইনালেরও টিকিট কাটলো, সেসবের দিকে আলোকপাত করা যাক।
ফ্রান্স দলের কোচ দিদিয়ের দেশম মাঝমাঠে একজন সৃজনশীল মিডফিল্ডার না খেলিয়ে বড় ভুল করেছেন। খেলায় তাঁর প্রাথমিক ছক ছিলো ৪-২-৩-১; কিন্তু ডাবল পিভোট আদ্রিয়ান রাবিও ও অরিয়েল চুয়ামেনিই কেবল মাঝমাঠের দায়িত্ব পালন করেছেন। মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, ওসমান দেম্বেলে ও কিলিয়ান এমবাপ্পে মূলত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। যে কারণে মাঠে ফরম্যাশন বদলে ৪-২-৪ হয়ে যায়। অন্যদিকে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফেন্তে মাঝমাঠ সাজান রদ্রিকে কেন্দ্র করে দানি ওলমো ও পেদ্রিকে বেঞ্চ করে টানা দুই ম্যাচে একাদশে জায়গা করে নেওয়া ফাবিয়ান রুইজকে নিয়ে। এই তিনজন মাঝমাঠে ত্রিভুজ তৈরি করে ফ্রান্সের খেলা ধ্বংস করার পাশাপাশি সৃজনশীলতায় ফ্রান্সের ডাবল পিভোট চুয়ামেনি ও রাবিওকে আক্রমণভাগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। কে না জানে, ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে গাড়ি চলে না! মাঝমাঠে ৩ বনাম দুইয়ের লড়াইয়ে ফ্রান্স দলের ইঞ্জিন পুরোপুরি বিকল ছিলো। স্পেনের মতো পাস খেলা সৃজনশীল দলের বিপক্ষে তিন বনাম দুই মিডফিল্ডার ও চারজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মাঠে নামানো ছিলো একই সাথে অতি আত্মবিশ্বাস ও অহংয়ের প্রতিচ্ছবি। সেই অতি আত্মবিশ্বাস স্পেন পুরোপুরি গুড়িয়ে দিয়েছে। ফুটবলে সে-ই দলই ম্যাচ জেতে, যারা মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে যোগাযোগ এবং গতি, ট্রানজিশন সবই নির্ভর করে মাঝমাঠের ওপর। এই জায়গায় স্পেন ফ্রান্সকে শতভাগ হারিয়েছে।
ফ্রান্সের বাম পাশের রক্ষণ দুর্বলতা এই ম্যাচে তাদেরকে ডুবিয়েছে। যার ফায়দা স্পেন দারুণভাবে নিয়েছে। উইঙ্গারদের কাছ থেকে ডিফেন্সিভ কাজে তেমন সহায়তা না পাওয়ায় স্পেনের আক্রমণে রাইট উইং, ফ্রান্সের রক্ষনে যা বামে, সেখানে রক্ষণ সামলানোর দায়িত্বে থাকা ফুলব্যাক লুকা ডিনিয়া কার্যত একা হয়ে পড়েন। স্পেনের রাইট উইংয়ে খেলেন ১৯ বছর বয়সী সুপারস্টার লামিন ইয়ামাল। স্পেনের আক্রমণ বিল্ড-আপ মূলত ফ্রান্সের রক্ষণের বামপ্রান্ত দিয়েই হয়েছে। ফুলব্যাক পেদ্রো পোরো, দানি ওলমো ও লামিন ইয়ামালের গতি, ড্রিবল আর পাসের খেলায় লুকা ডিনিয়া পেরে উঠছিলেন না। ১৯ মিনিটে স্পেনের পাওয়া পেনাল্টিটি ফ্রান্সের বাম প্রান্তের দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই আদায় করা। লামিনের ড্রিবলিং আর গতিতে ভ্যাবাচেকা খেয়ে ডিনিয়া ফাউল করে বসেন। পেনাল্টির বাঁশি বাজানো ছাড়া রেফারির কোনো উপায়ই ছিলো না!

স্পেনের পেনাল্টি আদায় করে নেন লামিন ইয়ামাল
৫৮ মিনিটে স্পেনের দ্বিতীয় গোলটিও এসেছে ফ্রান্স রক্ষণের বাম প্রান্ত দিয়ে। এখনকার ফুটবলে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দেরও প্রচুর রক্ষণের কাজ করার দায়িত্ব নিতে হয়। ফরাসি লেফট উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলা রক্ষণাত্মক কাজ তেমন একটা করে উঠতে পারেননি। যে কারণে দানি ওলমো ও স্পেনের রাইট উইংব্যাক পেদ্রো পোরো বারবারই প্রচুর জায়গা পেয়েছেন। সেই জায়গা পাওয়াটাকেই কাজে লাগিয়ে দুজনে পাস খেলে ও জায়গা বদল করে ফ্রান্সের চূড়ান্ত রক্ষণদূর্গ ভেঙে দলকে ২-০ গোলে এগিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষ ফরাসিদের মূলত ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন।
ফ্রান্স সেমিফাইনালের আগে ছয় ম্যাচে ১৬টি গোল করেছে। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই করেছেন ৮ গোল। ওসমান দেম্বেলে ৫টি। ফ্রান্স গোলের জন্য মূলত এমবাপ্পে ও দেম্বেলের ওপরেই বেশি নির্ভর করেছে। এই দুজনকে থামাতে এবং অকার্যকর করতে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফেন্তে হাইলাইন ডিফেন্স সাজান। যাতে দুজনকে সহজেই অফসাইডের ফাঁদে ফেলা যায়। এই কৌশলে স্পেন পুরোপুরি সফল। এমবাপ্পে ও দেম্বেলে বহুবার অফসাইড হয়েছেন। যে কারণে ফ্রান্সের ট্রানজিশলান প্রতি-আক্রমণনির্ভর পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে। আক্রমণ শুরু না হতেই যেন শেষ হয়ে যায়। পুরো টুর্নামেন্টে কাউন্টার অ্যাটাকে ফ্রান্স ঘূর্ণিঝড়ের মতো ধ্বংসাত্মক ছিলো। সেই ঝড় স্পেনের আক্রমাণাত্মক ও অনমনীয় হাইলাইন ডিফেন্সের কাছে মৃদু হাওয়ায় রূপ নেয়। সাথে লাগাতার প্রেস এমবাপ্পেসহ ফ্রান্সের পুরো আক্রমণভগকে দমিয়ে রাখে।

এমবাপ্পেসহ ফ্রান্সের ফরোয়ার্ডরা ছিলেন বোতলবন্দী
এমবাপ্পেকে আটকানো ও পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ছিলো মূলত ১৯ বছর বয়সী বার্সেলোনা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পাউ কুবারাসির ওপর। পজিশনাল মার্কিংয়ে কুবারাসি এমন মাস্টারক্লাস পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন যে, বলা যায় এমবাপ্পেকে তিনি পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলেন। ম্যান টু ম্যান মার্কিংয়ে বিশ্বকাপে এমবাপ্পেকে এর আগে আর কোনো ডিফেন্ডার এতটা নিষ্প্রভ রাখতে পারেননি। আরও একজনের কথা আলাদাভাবে বলতে হবে। তিনি ফুলব্যাক মার্ক কুকুরেয়া। এমবাপ্পে কুবারাসিকে যতবারই টপকেছেন, ততবারই দারুণ দক্ষতায় গোল আটকানোর মতো ব্লকগুলি করেছেন কুকুরেয়া। আর গোলরক্ষক উনাই সিমনও ভালো তিনটা সেইভ করেছেন। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত খেলা সাত ম্যাচের ছয়টিতেই ক্লিনশিট রাখলেন তিনি!
সব মিলিয়ে সেমিফাইনাল ম্যাচে ফুটবলীয় সকল বিভাগেই ফ্রান্সকে নিজেদের কৌশল, দক্ষতা ও শৈল্পিক পাসিং ফুটবল দিয়ে হারিয়েছে স্পেন। ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের নিউজার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য ফাইলানে প্রতিপক্ষ হিসাবে যে-ই আসুক, ফেভারিট থাকবে স্পেন।

রুহুল মাহফুজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।