মুখোমুখি আধুনিক ফুটবলের দুই রূপ
অলিখিত ফাইনালে মুখোমুখি ফ্রান্স ও স্পেন
কাগজে-কলমে সবে কোয়ার্টার ফাইনাল শেষ হয়েছে। ফাইনালের বাকি এক সপ্তাহ। অর্থাৎ ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ এর ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সময় ১৯ জুলাই রাত ১ টায়। কিন্তু যদি বলি তার আগেই, ১৫ জুলাই রাত ১ টায় ফুটবল ভক্তদের জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগেই ফাইনাল—কথাটা কি অযৌক্তিক মনে হবে? এই ‘আগাম ফাইনাল’-এর সাফাই গেয়েই সাজানো হলো লেখাটি। যে ফাইনাল সম্পর্কে থাকছে কৌতুহল-উদ্দীপক যত তথ্য, দুই দলের খেলার ধরন—শক্তি ও কৌশল, খেলার ধরনে মিল ও অমিল, জয়ের সম্ভাবনার আলাপ ও আরো অনেককিছু...

এবারের বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যতগুলো হাইভোল্টেজ ম্যাচ হয়েছে, সেগুলোর চাইতেও শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত হয়ত অপেক্ষা করছে ফুটবলবিশ্বের জন্য। বলছি, প্রথম সেমিফাইনালের কথা। যে ম্যাচটিকে আমরা বলতে চাইছি, ‘ফাইনালের আগেই ফাইনাল’। আমাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই একমত হবেন ফুটবল-পাগল দর্শকরাও? কেননা, বিশ্বকাপের শেষ চারে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি—ফ্রান্স ও স্পেন।
স্পষ্টত, দুই দলই সবার নজরে এবারের শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। যদিও দ্বিতীয় সেমিফাইনালে দেখা হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং বিশ্বকাপ শিরোপার খরা কাটাতে মরিয়া ইংল্যান্ড। কিন্তু আমাদের আলোচনা আপাতত ফ্রান্স ও স্পেন। ম্যাচটিকে কেন ‘ফাইনালপূর্ব ফাইনাল’ বলেছি, আমরা কি একাই বলছি এবং এই ম্যাচটি কতদিক দিয়ে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আধুনিক ফুটবলের দুই ইউরোপীয় কৌশলের লড়াই স্বয়ং ফুটবলকেই কতটা বদলে দিতে সক্ষম এই একটা ম্যাচের মাধ্যমে—তারই গুরুত্ব বোঝাতে চেষ্টা করছি। আমাদের শিরোনামের সমর্থনে, প্রথমেই স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফেন্তের বক্তব্য উল্লেখ করে নিচ্ছি। যেহেতু তিনি নিজেও ম্যাচটিকে আখ্যা দিয়েছেন, "ফাইনালের আগের ফাইনাল" বলে। এটা স্রেফ হাইভোল্টেজ ম্যাচ বলেই নিছক মন্তব্য করা না। এই মন্তব্যের পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

অনুশীলনে ব্যস্ত ফ্রান্স দল
প্রথমত, একদিকে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল;—বিশ্বকাপ মঞ্চে দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই প্রতীক মুখোমুখি লড়তে যাচ্ছে—তা দেখার অপেক্ষায় এখন গোটা ফুটবল-বিশ্ব। ম্যাচটি স্রেফ ফাইনালের ওঠার লড়াই হিসেবে দেখলে অনেক কিছু মিস হয়ে যাবে। এটা হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আরো এক মোক্ষম সুযোগ, সেই সাথে বিশ্বসেরা হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ার শেষ ধাপ।
কেননা টেক্সাসের আর্লিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই মহারণে যারা জিতবে—বিশ্বকাপ ফাইনালে শুধু জায়গা করেই নেবে না, বলা চলে—১৯ জুলাইয়ের আগেই তারা একধাপ এগিয়ে থাকবে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার চিত্রে। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলেছে এই দুটি দলই। স্পেন একদিকে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন, ইএ স্পোর্টসের সুপার কম্পিউটার বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আগাম বলে দিয়েছে স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপটা এবার জিততে যাচ্ছে—২০১০ থেকে যাদের প্রতিটি ভবিষ্যদ্বানী ঠিক হয়েছে! প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দেকে হারাতে না পারলেও পরের সব কটি ম্যাচে জয় নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে ইএ স্পোর্টসের ভবিষ্যদ্বানী সফল করতে অনেকখানি এগিয়ে গেছে লা রোহা দল। অন্যদিকে, কোচ দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স ছুটছে অদম্য গতিতে। তাদের যেন থামানোর কেউ নেই! টানা তৃতীয় ফাইনালে উঠে তিন নম্বর বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার জন্য লেস ব্লুস দলও মরিয়া।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে ফ্রান্স। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করা দিদিয়ের দেশমের দল ইতোমধ্যেই করেছে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ—১৬ গোল। মজার ব্যাপার হলো, সেই গোলের অর্ধেকই এসেছে কিলিয়ান এমবাপ্পের পা থেকে। যিনি লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে এগিয়ে আছেন গোল্ডেন বুটের দৌড়েও। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে গোড়ালিতে হালকা চোট পেয়েছিলেন এমবাপ্পে। তবে ভক্তদের জন্য সুখবর যে, তাকে সেই ম্যাচ উদযাপনে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দেখায়। সুতরাং সেমিফাইনালে তাকে পাওয়ার ব্যাপারে ফরাসি দল সম্পূর্ণ আশাবাদী।

ফ্রান্স তালিসমান কিলিয়ান এমবাপ্পে সেমিফাইনালে খেলতে প্রস্তুত
অন্যদিকে, স্পেনের সেমিফাইনালে ওঠার পথ ছিল—বলতে গেলে, নাটকীয়তায় ভরপুর। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে আবারও শেষ মুহূর্তের নায়ক হন মিকেল মেরিনো। ৮৮তম মিনিটে তার করা গোলেই নিশ্চিত হয় স্পেনের সেমিফাইনালের টিকিট। এর আগেও, শেষ ষোলোর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে গোল করে দলকে রক্ষা করেছিলেন ফলস নাইন পজিশনে দক্ষ ভার্সেটাইল এই মিডফিল্ডার। ফাবিয়ান রুইস, রদ্রি, পেদ্রি, পাও কুবারসি ও লামিন ইয়ামালদের নিয়ে দে লা ফেন্তের স্প্যানিশ দল এখন আত্মবিশ্বাসে টগবগে ফুটছে।
স্পেনের এই আত্মবিশ্বাসের কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানো যাক। এবারের পরিস্থিতির মতোই—ইউরো-২০২৪ সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। এবং এরপরই জয় করেছিল সেই ইউরো শিরোপা। এবারের গল্পও কি একইভাবে লেখা হচ্ছে? নাকি গল্পের ভেতর অপেক্ষা করছে নতুন চমক? তা জানা যাবে আর কয়েক ঘণ্টা পরেই। লামিন ইয়ামাল টুকটাক ঝলক দেখালেও, বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত বলার মতো কিছুই করতে পারেননি। সেমির আগে এই টিনেজ তারকা বলেছেন, তাদের সামনে দুটি রাস্তা—হেরে ফ্রান্সকে টানা তৃতীয় ফাইনালে খেলতে দেওয়া অথবা দুই দলের আগের দুই দেখার পুনরাবৃত্তি করা, তিনি দ্বিতীয়টির জন্যই অপেক্ষা করছেন। কে জানে, আজ হয়ত লামিন ইয়ামালেরই দিন! বড় মঞ্চে, বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই তো গ্রেটরা নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়ে দুনিয়াকে দেখিয়ে দেন!

আজ কি লামিন ইয়ামালের দিন?
দুই দলের সাম্প্রতিক দেখায় স্পেনই এগিয়ে। শেষ দুইবারই জিতেছে স্পেন। সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচটির কথা না বললেই নয়। ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনাল। সেদিন স্টুটগার্টের গ্যালারিতে ও টিভির সামনে উপস্থিত ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য গোলবন্যার। ৫-১ ব্যবধানে স্পেন এগিয়ে থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলাফল দাঁড়ায়—স্পেন ৫-৪ ফ্রান্স!
যদিও ম্যাচের প্রথমার্ধে শেষ হয় ২-০ গোলে। দর্শকরা কল্পনাও করেননি বাকি ৪৫ মিনিটে কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর একটু পরই অবিশ্বাস্য নাটকের সূত্রপাত হয়। যার ঐতিহাসিক স্ক্রিপ্ট—কে যে লিখেছিল...! ম্যাচের ৫৩ মিনিট থেকে শুরু, এরপর দুই দল মিলে করে ৭টা গোল। ম্যাচসেরা লামিন ইয়ামালের জোড়া গোল, আর এমবাপ্পের এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট—ম্যাচটিকে নিয়ে যায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অবিস্মরণীয় এক পৃষ্ঠায়।
শেষবারের মতো বাঁশি বেজে ওঠার আগ পর্যন্ত যে চরম উত্তেজনা ছিল, তা মাপতে গেলে, রসিকতার সুরে বোধ করি—রিখটার স্কেলের দরকার ছিল। ফ্রান্সের সেই দুর্দান্ত কামব্যাকের চেষ্টা ম্যাচটিকে পরিণত করে আধুনিক ফুটবলের অনন্য এক উদাহরণে। পরিণত করে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা আর রুদ্ধশ্বাস ক্লাসিকে। ফাইনালের আগেই যে ফাইনাল, তারও আগে দুই দলের ভক্ত-সমর্থকদের মনে সেই স্মৃতি নিশ্চয়ই নতুন করে ভেসে উঠছে।
তাই, ১৫ তারিখের সেমিফাইনাল হতে যাচ্ছে ফরাসিদের জন্য কোটি কোটি দর্শকের সামনে মধুর এক শোধ নেওয়ার সুযোগ। ম্যাচটি অবশ্য বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। দুই দলই মনযোগ রাখবে মাঠের ৯০ মিনিটে, বর্তমানে। ফাইনালের স্বপ্ন নিয়েই তারা মাঠে নামবেন। আগের পাওনা শোধ মেটানো তো দূর, ইউরোপীয় পরাশক্তি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাও হয়ত মাথায় থাকবে না। শুধু থাকবে—প্রতিপক্ষের চাইতে অন্তত একটি গোল বেশি করে ম্যাচ শেষ করা।
ফ্রান্স শেষবার স্পেনের বিপক্ষে জয় পায় ২০২১ সালে উয়েফা ন্যাশনস লিগের ফাইনালে। সে ম্যাচে লামিন ইয়ামাল খেলেননি বটে, তবে ১৪ বছর বয়সী এক দর্শক হিসেবে নিশ্চয়ই দেখছিলেন এমবাপ্পের ম্যাচসেরা সেই চোখ ঝলসানো পারফরম্যান্স—এক গোল ও এক অ্যাসিস্টে তিনি ২-১ গোলের ব্যবধানে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা এনে দেন ফ্রান্স দলকে।
ফুটবল অনুরাগীদের কাছে গত দুবারের মতো এবারের সেমিফাইনালেও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন এমবাপ্পে ও ইয়ামাল। এবং এও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, ফ্রান্স এবারের আসরের যে কোনো দলের চাইতে ভয়ংকর রূপ নিয়ে মাঠে নামছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন, ‘এই ফ্রান্সকে কে হারাবে এবার?’ সুতরাং কাতার বিশ্বকাপের মতো আবার আর্জেন্টিনা ও আবার সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল না হলে, ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচটিকে ফাইনাল বলা যেতেই পারে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ বহুবার দিয়েছেন এমবাপ্পে। ইয়ামালের এখনো সবই বাকি। তারপরও ইয়ামাল বনাম এমবাপ্পে—একজন ভবিষ্যতের প্রতীক, অন্যজন বর্তমানের রাজা। এই দুই তারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই ম্যাচকে শুধু দুই সুপারস্টারের লড়াই বললে ভুল হবে। এই নব্বই মিনিট হবে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ। ফ্রান্সের শক্তি দ্রুতগতির ট্রানজিশন, বিধ্বংসী কাউন্টার-অ্যাটাক এবং এমবাপ্পেকে ঘিরে এক্সপ্লোসিভ আক্রমণভাগ। বিপরীতে স্পেনের খেলার ধরনে যে পরিচয়—বলের দখল, ধৈর্য, ছোট পাস আর নিখুঁত দলগত সমন্বয়। দে লা ফেন্তে বারবার বলেন, কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড় বা শুরুর একাদশকেন্দ্রিক না, তার দলের সবচেয়ে বড় শক্তি স্কোয়াডের গভীরতা। সে গভীরতা অবশ্য দিদিয়ের দেশমেরও আছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ফুটবলপ্রেমীরা আরেকটা ফাইনালেরই স্বাদ পেতে যাচ্ছেন। ইতিহাসের হিসাব, সাম্প্রতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এমবাপ্পে-ইয়ামালের তারকাযুদ্ধ এবং দুই ভিন্ন কৌশলের সংঘর্ষ—সবকিছু মিলিয়ে ফ্রান্স বনাম স্পেন ম্যাচটি সহজেই ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচগুলোর একটা হয়ে উঠবে। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।