খেলারদেশ

লামিন ইয়ামালের গল্প

লামিন ইয়ামাল ও মরক্কো: দ্য রোড নট টেকেন

নতুন প্রজন্মের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। তার বাবা-মা আর্থিকভাবে খুবই অসচ্ছল ছিলেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দুই ব্যক্তি—লামিন এবং ইয়ামাল। সেই দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই ছেলের নাম রাখা হয় দুজনের নাম মিলিয়ে—লামিন ইয়ামাল। এই গল্পে লামিন ইয়ামালের কিছু বিস্ময়কর রেকর্ড, মরক্কো যেভাবে তাকে দলে নিতে চেয়েছিল, শেষমেশ ইয়ামাল কেন স্পেনের জার্সিই গায়ে চাপালেন ফুটবল মাঠ কাঁপাতে, লা মাসিয়ায় তার বেড়ে ওঠা ও অন্যান্য অপ্রসঙ্গ।

লামিন ইয়ামাল ও মরক্কো: দ্য রোড নট টেকেন

স্পেনের নতুন প্রজন্মের বিস্ময়বালক, লামিন ইয়ামাল

রনক জামান
By রনক জামান

যে ফুটবলার খুব ছোট বয়সেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান। ইউরো, লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং বিশ্বকাপ—প্রতিটি বড় মঞ্চেই তিনি সর্বকনিষ্ঠদের বিভিন্ন রেকর্ডে নিজের নাম তুলেছেন। তার পুরো নাম...

লামিন ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা

লামিন ইয়ামালের বুকশেলফে রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতার স্প্যানিশ অনুবাদ ছিল কিনা, কবিতাটি তিনি আদৌ কখনো পড়েছেন কিনা—জানি না। কিন্তু কবিতাটি সবার জন্যই লিখে গেছেন আমেরিকান কবি। যে কবিতা বাকিরা কেবল পড়েছেন, আর ইয়ামাল নিজেই অন্যভাবে লিখেছেন ২০২৩ সালে—কবিতার সারমর্ম বিন্দু পরিমাণ না বদলেই।

অনেকেই জানেন, বাবা মরক্কোর ছিলেন বলে লামিন ইয়ামালের সুযোগ ছিল মরক্কোর হয়ে খেলার। প্রথমদিকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিলেও, ২০২৩ সালে গুজব পরিণত হয় গুঞ্জনে, কাগজের শিরোনামে—‘নাগরিকত্ব পরিবর্তন করছেন বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল?’

'নিজের কাছে আমি অনেক কিছু চাই। যা করছি তাতে কখনোই সন্তুষ্ট না। আমাকে শুধুই খেলে যেতে হবে।'

'নিজের কাছে আমি অনেক কিছু চাই। যা করছি তাতে কখনোই সন্তুষ্ট না। আমাকে শুধুই খেলে যেতে হবে।'

লামিন তখন ১৫। ওইটুকু বয়সেই বার্সেলোনা ‘বি’ (বার্সা অ্যাতলেটিক) এর হয়ে ৩য় স্তরের লিগে বিশালদেহী ও গায়ের জোরে খেলা বাবার বয়সী খেলোয়াড়দের বিপক্ষে অভিষেক করেন। মূলত তখন তিনি ছিলেন ‘বার্সেলোনা জুভেনিল এ’ (অনূর্ধ্ব-১৯) দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। ২০২২/২৩ সিজনে এখানে তিনি ২০ ম্যাচ খেলে ৭ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করেন।

(*স্প্যানিশ একাডেমি লেভেলে, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের লিগের নাম ‘জুভেনিল দিভিসিওন দে অনার।’)

লামিন ইয়ামাল: লা মাসিয়া প্রডাক্ট

লামিন ইয়ামাল: লা মাসিয়া প্রডাক্ট

স্প্যানিশ একাডেমিতে অনূর্ধ্ব-১৯ সম্পর্কে মজার তথ্য দিই, সিনিয়র দলগুলোর মতো জাতীয় পর্যায়ের ‘কোপা দেল রে’ টুর্নামেন্টের আদল ও নিয়মে অনূর্ধ্ব-১৯ দলকেও ‘কোপা দেল রে জুভেনিল’-এ অংশ নিতে হয়। ঐ সিজনেই—লামিন এখানেও ২ ম্যাচ খেলেন; স্পেন অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ৪ ম্যাচে ৩ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট করেন; স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ ও ‘উয়েফা ইয়ুথ লিগে’ বার্সেলোনা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অভিষেক করেন।

‘উয়েফা ইয়ুথ লিগ’ কী? যদি না জানা থাকে...

‘উয়েফা ইয়ুথ লিগ’ প্রসঙ্গে একটু আসি, ইউরোপীয় দেশগুলোর অনূর্ধ্ব-১৯ দলকেও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হিসেবে ‘উয়েফা ইয়ুথ লিগ’ খেলতে হয়। মজার বিষয় হলো, এই ইয়ুথ লিগটা একদম উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের আদলে সাজানো হয়। অর্থাৎ অনূর্ধ্ব-১৯ দলগুলোর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আরকি। এই টুর্নামেন্টে আরো মজার বিষয় হচ্ছে, অনূর্ধ্ব-১৯ দলগুলোর জন্য গ্রুপপর্বের ফিক্সার আলাদাভাবে সাজানো হয় না, কোয়ালিফাই করতে হয় না। এই ভাগ্য নির্ভর করে তাদের সিনিয়র দলের উপর। সিনিয়র দলটি যদি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলে, তবে এরাও খেলবে ‘ইয়ুথ লিগে’। সিনিয়র দল যে গ্রুপে পড়বে, এরাও পড়বে একই গ্রুপে। সিনিয়র দলের গ্রুপে বাকি যে দলগুলো পড়বে, একইভাবে এদের গ্রুপেও পড়বে সেই সিনিয়র দলগুলোর ‘অনূর্ধ্ব-১৯’। শুধু পার্থক্য বলতে, নকআউট পর্বে কোনো ফিরতি লেগ থাকে না।

মাত্র ৭ বছর বয়সে লা মাসিয়ায় যোগ দেন ইয়ামাল

মাত্র ৭ বছর বয়সে লা মাসিয়ায় যোগ দেন ইয়ামাল

যাই হোক, ২০২২/২৩ সিজনে ইয়ামালও উয়েফা ইয়ুথ লিগ খেলেন। বয়স ১৫, প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক। সুতরাং কোচ তাকে গ্রুপপর্বে অল্প কয়েক মিনিটের জন্য নামাতেন। ৬ ম্যাচ খেলেছেন, গোলের দেখা পাননি। শেষ দুই ম্যাচে ৮৫ ও ৯০ মিনিট খেলার সুযোগ পান। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে (শেষ ষোলোয়) তার দল হেরে বাদ পড়ে যায় সেবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ডাচ দল ‘এ জেড আলকমার অনূর্ধ্ব-১৯’ এর বিপক্ষে। পরেরবার ‘ইয়ুথ লিগ’ খেলা আর হয়নি তার। কারণ, সরাসরি বার্সেলোনা মূল দলে খেলে ফেলেছেন, খেলছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। সুতরাং নিয়ম অনুযায়ী জুনিয়র লেভেলে খেলতে পারবেন না আর।

লামিন ইয়ামাল সেই অল্প বয়সেই বড় ম্যাচের খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিলেন। এই কথা ইউরোপ, আফ্রিকা বা পৃথিবীর কোনো সচেতন স্কাউটের, সাংবাদিকের বা ক্লাবের অজানা থাকার সুযোগ ছিল না।

এতে যা হবার তাই হলো: মরক্কোর স্কাউট, ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, জাতীয় দলের তৎকালীন কোচও নিয়মিত ইয়ামালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত এই ‘মরক্কো-ইয়ামাল’ যোগাযোগ ছিল দীর্ঘদিন ধরে। এমনকি নিজ শেকড় আর ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পাতার আবেগে তাড়িত করার চেষ্টাও করে। সেই সাথে প্রতিশ্রুতি দেয়, মরক্কোর খেলোয়াড় হিসেবে ইয়ামাল ও তার পরিবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুবিধা ও সম্মান পাবে। ভিনদেশে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হয়ে থাকতে হবে না। না কখনো হতে হবে রেসিজমের শিকার। যে ভূমির আফ্রিকান পূর্বজদের রক্ত তার ভেতর বইছে—সেই মাটি ও মানুষকে, সেই দেশকে অন্য উচ্চতায় নেবার সম্পূর্ণ সুযোগ ইয়ামালের সামনে।

「 আপনি কি জানেন, লামিন ইয়ামাল বাঁ পায়ে ফুটবল খেললেও দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক কাজকর্মে ডানহাত বেশি ব্যবহার করেন? 」

সচরাচর স্পেনে বড় হয়ে ওঠা মরক্কো-বংশোদ্ভূত সব ফুটবলারকেই একই কৌশলে, আবেগ ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে, খেলোয়াড়দের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ধৈর্যের সঙ্গে এটলাস লায়ন্স দলে নিয়ে আসা হয়, হচ্ছে, হবে। আরো অনেক ডিটেইল থাকে এই কায়দার পরতে পরতে। কেননা মরক্কোর ফুটবল পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত। মোদ্দা কথা, তারা এই স্কাউটিং-এ সফলও।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ যদি দিই, প্রথমেই নাম আসে আশরাফ হাকিমির—মরক্কোর অধিনায়ক ও তারকা এই ফুটবলারের জন্মই স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে। রিয়াল মাদ্রিদ একাডেমি লা ফ্যাব্রিকাতেই তার ফুটবলের আধুনিক শিক্ষা। রিয়াল মাদ্রিদ মূল দলেও খেলেছেন তিনি কার্ভাহালের বদলি হিসেবে। এখন তাকে সবাই চেনেন মরক্কো ফুটবলের সবচেয়ে বড় আইকন হিসেবে, মরক্কো দলের ভরসার প্রতীক হিসেবে।

মরক্কো, বিশ্বকাপ ২০২৬

মরক্কো, বিশ্বকাপ ২০২৬

আরেকটা উদাহরণ হাকিমির পাশেই, ব্রাহিম দিয়াজ। স্পেনের মালাগায় জন্ম, সেখানেই ফুটবল পায়ে বেড়ে ওঠা। স্পেন অনুর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে ম্যাচও খেলেছিলেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ তারকা শেষমেশ হাকিমির পদাঙ্ক অনুসরণ করেন ২০২৪ সালে। এই বিশ্বকাপে ইসমাইল সাইবারির নাম ইতোমধ্যে আপনারা জেনে ফেলেছেন। তার জীবনের অবিশ্বাস্য গল্পও হয়ত জানেন। তার জন্ম স্পেনে, খেলেছেন নেদারল্যান্ডের পিএসভিতে। বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিচ্ছেন আগামী মৌসুমে। তিনিও মরক্কোর নাগরিকত্ব নিয়েছেন।

সাদি রিয়াদ—স্পেনের মায়োর্কায় জন্ম। লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠা। খেলছেন ইংল্যান্ডের ক্রিস্টাল প্যালেসের ডিফেন্ডার হিসেবে। মরক্কোর স্কাউটিং কৌশলের আরেকটি উদাহরণ। বার্সেলোনার সাবেক ফরোয়ার্ড মুনির এল হাদ্দাদির জন্মও স্পেনে। এবং স্পেন মূল দলের হয়ে ২০১৪ সালে একটা অফিসিয়াল ম্যাচও খেলেছিলেন উত্তর ম্যাসিডোনিয়ার সঙ্গে। এরপর ফিফার নিয়ম পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি মরক্কো জাতীয় দলে যোগ দেন।

যদিও মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের দিক থেকে এভাবে খেলোয়াড় নিয়ে আসার ঘটনা একতরফা না। অনেকে স্পেনে বা ইউরোপের অন্য দেশে জন্মেও জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার শঙ্কায় মা-বাবার শেকড় ধরে নাগরিকত্ব বদলান, মরক্কো বা অন্য দেশের হয়ে মাঠে নামেন। শুধু কি স্পেন? সমগ্র ইউরোপ, তথা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মরক্কোর সাথে পূর্ব সম্পর্কিত সমস্ত ফুটবলারদের উপর আফ্রিকান দেশটির স্কাউটরা সেই ২০০৯/১০ থেকে কড়া নজর রেখে চলেছেন। আছে আরো কিছু কৌশল, রাজনৈতিকভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রভাব। ফলে, আজকের এই ফুটবল জায়ান্ট মরক্কো দলটির সাফল্যের অন্যতম কারণ যে এটাই, তা সন্দেহাতীত।

「 ইন্টারেস্টিং তথ্য: মরক্কোর বিশ্বকাপ-২০২৬ স্কোয়াডে ২৬ জনের মধ্যে ১৯ জন ফুটবলারের জন্মই বিদেশে। যার মধ্যে ৬ জন আপাদমস্তক স্পেনে জন্মগ্রহণকারী, বড়ও হয়েছেন স্পেনে। 」

লামিন ইয়ামাল: ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, জর্জিয়ার বিপক্ষে নামা স্পেনের সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়

লামিন ইয়ামাল: ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, জর্জিয়ার বিপক্ষে নামা স্পেনের সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়

দ্য রোড নট টেকেন

ফিরে আসি লামিন ইয়ামালের কবিতায়। লামিন ইয়ামাল নিজেও এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কো সেমিফাইনালে ওঠার পর তিনিও বহুবার ভেবেছিলেন মরক্কোর হয়ে খেলার কথা। অল্প বয়সের আবেগতাড়না আর মরক্কোর প্রতিশ্রুতি তাকে কঠিন সিদ্ধান্তে ফেলে। মরক্কো হয়ত সফলও হতো অন্য সব খেলোয়াড়ের মতোই। কিন্তু লামিন ইয়ামাল স্পেনেই কেন রয়ে গেলেন? কারণ, দ্য ‘রোড নট টেকেন’ কবিতার আপনা ভার্সন তিনি নিজে লিখছিলেন।

আমি লামিন ইয়ামালের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে কথায় খুবই সৎ ও স্পষ্ট ছিল। দুই বা তিন দিন পরে সে আমাকে ফোন করে বলে, 'কোচ, আপনার ভালোবাসা আর গুরুত্বের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি স্পেনকেই বেছে নিচ্ছি। আমি নিজেকে স্প্যানিশ মনে করি।' সে খুবই আন্তরিক একটি ছেলে। সে কখনো মিথ্যা বলেনি। সে কখনো বলেনি, 'আমি মরক্কান' বা 'আমি স্প্যানিশ'। সে শুধু স্পেনকে বেছে নিয়েছে। এটাই ফুটবল।

সাবেক মরক্কো প্রধান কোচ ওয়ালিদ রেগরাগি

বাস্তবতা হলো, অল্পের জন্য, এই একটুর জন্য তিনি স্পেনে রয়ে যান। এই একটুর পার্থক্য গড়ার পেছনে রয়েছে ইয়ামালের প্রতি স্প্যানিশ ফেডারেশনের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার গল্প। যখন ইয়ামাল প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন নাগরিকত্ব বদলাবেন, তখনই স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (rfef) তাকে স্পেন জাতীয় দলে নিয়মিত খেলার সুযোগ করে দেন; ২০২৩ সালে স্পেন জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই মাঠে নামেন। আর স্পেনের সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়ার হিসেবে রেকর্ড গড়েন। সেই অভিষেক ম্যাচটি ছিল জর্জিয়ার বিপক্ষে, উয়েফা ইউরো-২০২৪ কোয়ালিফাইং রাউন্ডের খেলা। যে অভিষেক ম্যাচেই তিনি আরো একটা অনন্য রেকর্ড গড়েন—৭৪ মিনিটে গোল করে স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার নাম হয়—লামিন ইয়ামাল।

বার্সেলোনার ১০১ বছরের রেকর্ড ভেঙে ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষিক্ত ফুটবলার

বার্সেলোনার ১০১ বছরের রেকর্ড ভেঙে ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষিক্ত ফুটবলার

জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলার আশ্বাস ছিল কেবল শুরু। ফেডারেশন তাকে ক্যারিয়ারে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দিতেও সর্বাত্মক চেষ্টা করে। বার্সেলোনা মূল দলে ইয়ামালকে নিয়মিত খেলার সুযোগ করে দেয়া হয় ফেডারেশনের অনুরোধে। জাতীয় দলে অভিষেকের মাস কয়েক আগেই বার্সেলোনা মূল দলের হয়ে মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস বয়সে লা লিগায় অভিষেক করেন। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে মাঠে নেমে বার্সেলোনার ১০১ বছরের রেকর্ড ভেঙে দেন। আর হয়ে ওঠেন বার্সার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষিক্ত ফুটবলার। ইয়ামালের আগে বার্সেলোনার হয়ে এই রেকর্ডধারী ছিলেন আরমান্দো মার্তিনেস সাগি। ১৯২২ সালে তিনি ‘আলফনসো এফসি’র (বর্তমান নাম, আর সি ডি মায়োর্কা) বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলেন বার্সার হয়ে।

আরমান্দো মার্তিনেস সাগি

আরমান্দো মার্তিনেস সাগি

স্প্যানিশ ফেডারেশন তখনও লামিন ইয়ামালের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে একে একে। যেমন, লা মাসিয়ার পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও পরে ইয়ামালের পরিবারের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়। উল্লেখ্য যে, ইয়ামালের মা শীলা ইবানা ও বাবা মুনির নাসরাউই-এর বিচ্ছেদের পর অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল পরিবারটি। তখন ক্লাব এবং স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন ইয়ামালের ছোট ভাইবোনদের জন্য শিক্ষা আর সুন্দর শৈশবের নিশ্চয়তা দেয়। স্পেনের মতো দেশে তার অনুজরা যে জীবন পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পায়, তা ইয়ামালের জন্য মানসিকভাবে তো বটেই, ক্যারিয়ারের জন্য ছিল স্বস্তিদায়ক, এবং তার নিজের জীবনের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। শুধু কি তাই?

ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ইয়ামাল

ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ইয়ামাল

ফেডারেশন তার পরিবারকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। ইয়ামাল যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য সেই চেনা পরিবেশের ভূমিকা কেমন হবে, স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ বা যে কোনো শিরোপা জেতার স্বম্ভাব্যতা কতখানি, ইয়ামালের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সবিস্তারে আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে ইয়ামাল বা তার পরিবারকে কোনোকিছু নিয়ে ভাবতে হবে না। সেই আশ্বাস পূরণও করে ফেডারেশন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইউরো-২০২৪ স্কোয়াডে ডাকা, বিশ্বকাপসহ বড় যে কোনো আসরে স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করার প্রতিশ্রুতি, সব মিলিয়ে ইয়ামালের এই খুলে যাওয়া ভাগ্য—তার জন্য বাস্তবিকভাবেই অকল্পনীয়। যে দেশ তাকে এতকিছু দিচ্ছে, পরিবারকে রাষ্ট্রের প্রথম সারির নাগরিকের মর্যাদা ও সুবিধা দিচ্ছে—এর প্রতিদান তিনি খেলার মাঠেই দিয়ে চলেছেন।

লামিন ইয়ামাল: পেলের রেকর্ড অনুকরণ করে ৬৮ বছরের মধ্যে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের বিশাল রেকর্ড গড়লেন

লামিন ইয়ামাল: পেলের রেকর্ড অনুকরণ করে ৬৮ বছরের মধ্যে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের বিশাল রেকর্ড গড়লেন

বিশ্বকাপ ২০২৬-এ, গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করে কিংবদন্তি পেলের নামের কাছে জায়গা করে নিয়েছেন। মাত্র ১৮ বছর ৩৪৪ দিন বয়সে ইয়ামাল ফিফা বিশ্বকাপে প্রথম গোল করা দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ে পরিণত হন।

এই কীর্তিতে তার আগে আছেন একজনই : পেলে। ১৯৫৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ওয়েলসের বিপক্ষে পেলে তার প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেছিলেন ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে।

এই সাফল্যগাঁথা, এত অল্প বয়সেই লামিন ইয়ামালের অন্যতম ফুটবল সুপারস্টার হয়ে ওঠার বড় কারণ, তিনি যে কোনো পরিস্থিতি আর চাপকে 'অস্বাভাবিকভাবে' স্বাভাবিকভাবে নেন। এ সম্পর্কে তার কোচ এবং সতীর্থরা প্রায়ই বলেন :

বড় ম্যাচের আগে ইয়ামালকে দেখে বোঝাই যায় না যে সে বিশ্বের অন্যতম বড় মঞ্চে খেলতে যাচ্ছে। এই মানসিক দৃঢ়তাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করছে।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।