খেলারদেশ

বালোগুন বিতর্কের অবস্থান কততম?

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ১০ কেলেঙ্কারি

বিশ্বকাপ ফুটবলের সেরা ১০ কেলেঙ্কারির ঘটনা নিয়ে সাজানো হলো লেখাটি। সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে জায়গা পেয়েছে ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনাটি।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ১০ কেলেঙ্কারি

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ১০ কেলেঙ্কারি: বালোগুন বিতর্কের অবস্থান কততম?

রনক জামান
By রনক জামান

বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও, এর ইতিহাস শুধু অবিস্মরণীয় গোল আর নাটকীয় ম্যাচেই ভরা নয়। রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, সহিংসতা এবং কেলেঙ্কারিও বারবার বিশ্বকাপকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।

খ্যাতিমান ক্রীড়া-বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাবেক ফুটবলারদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ১০টি কেলেঙ্কারির তালিকা। সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে জায়গা পেয়েছে ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনাটি।

১০. দিয়েগো মারাদোনার ডোপিং কেলেঙ্কারি (১৯৯৪)

১৯৯৪ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা

১৯৯৪ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা

দিয়েগো মারাদোনা ও বিতর্ক যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স ছিল ৩৩, আর তার কোকেন আসক্তির কথা তখন সবারই জানা। ১৯৯১ সালে নাপোলি–বারি ম্যাচের পর কোকেন পরীক্ষায় পজিটিভ আসায় ফিফা তাকে ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সেভিয়ায় খেলে নিজেকে প্রস্তুত করে বিশ্বকাপে ফেরেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মারাদোনা দুর্দান্ত শুরু করেন। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ে অবদান রাখেন, আর গ্রিসের বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানের জয়ে করেন অসাধারণ এক গোল। গোলের পর ক্যামেরার সামনে তার বিস্ফারিত চোখে উচ্ছ্বাস প্রকাশের দৃশ্যটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। কিন্তু টুর্নামেন্ট চলাকালীন নিয়মিত ডোপ পরীক্ষায় তার শরীরে একাধিক নিষিদ্ধ উপাদানের নমুনা পাওয়া যায়। মারাদোনা ইচ্ছাকৃতভাবে ডোপ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেও ফিফা তাকে আবারও ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। সেটিই হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ অধ্যায়; আর সেই বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

৯. রোনালদোর রহস্যময় ফাইনাল (১৯৯৮)

Image

১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলতে চার গোল করেছিলেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত রোনালদো। কিন্তু স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের আগে কোচ মারিও জাগালোর ঘোষিত একাদশে তার নাম না থাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবার তাকে শুরুর দলে ফিরিয়ে আনা হলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়।

ফাইনালে রোনালদো নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না এবং ব্রাজিল ৩-০ গোলে হেরে যায়। পরে জানা যায়, ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে হোটেলে তিনি খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এরপর নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে—তার খাবারে ঘুমের ওষুধ মেশানো বা অসুস্থ অবস্থাতেও ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা নাইকির চাপে তাকে খেলানো হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ব্রাজিলের পার্লামেন্টেও তদন্ত হয়, তবে নাইকির কোনো প্রভাবের প্রমাণ মেলেনি। রোনালদোও বলেন, নাইকি তার কাছে শুধু তাদের বুট পরার অনুরোধই করেছিল।

তবে চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে সুস্থভাবে ফিরে এসে রোনালদো ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন।

৮. ব্যাটল অব সান্তিয়াগো (১৯৬২)

Image

বর্তমান ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল যেমন মেক্সিকোর আতিথেয়তার প্রশংসা করেছিলেন, ১৯৬২ বিশ্বকাপের আগে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ঠিক তার উল্টো আচরণ করেছিল। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো সম্পর্কে দুই ইতালীয় সাংবাদিকের অবমাননাকর মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। এরই প্রভাব পড়ে মাঠে। ইতালি–চিলি ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংঘর্ষ বেঁধে যায়, যা পুরো ম্যাচজুড়েই চলতে থাকে। বারবার ফাউল করায় ইতালির জর্জিও ফেরিনিকে লাল কার্ড দেখান ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন। কিন্তু তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে তাকে বাইরে নিয়ে যায়।

বিবিসির ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান ম্যাচটিকে ফুটবল ইতিহাসের "সবচেয়ে নির্বোধ, ভয়াবহ, জঘন্য ও ডিসগ্রেসফুল এক্সিবিশন" বলে বর্ণনা করেছিলেন।

এই ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা কেন অ্যাস্টনের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরে তিনি লক্ষ্য করেন, শুধু মৌখিক সতর্কবার্তা বা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত অনেক সময় খেলোয়াড়রা ভাষাগত কারণে বুঝতে পারে না, আবার দর্শকদের কাছেও তা স্পষ্ট হয় না। একদিন গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক সিগন্যালের লাল-হলুদ বাতি দেখে তার মাথায় নতুন ধারণা আসে—হলুদ কার্ড সতর্কবার্তার প্রতীক হবে, আর লাল কার্ড বহিষ্কারের। পরে ফিফা এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ ও লাল কার্ড চালু করা হয়। আজ ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত এই শাস্তি ব্যবস্থার পেছনে 'ব্যাটল অব সান্তিয়াগো' ম্যাচের বিশৃঙ্খলাই অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।

৭. ডিসগ্রেস অব হিহন (১৯৮২)

Image

বর্তমানে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ দুই ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে সেই নিয়ম ছিল না, আর সেই সুযোগেই ঘটে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত বিতর্ক, যা ‘ডিসগ্রেস অব হিহন’ নামে পরিচিত।

স্পেনের এল মোলিনোন স্টেডিয়ামে শেষ গ্রুপ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। এর আগের দিন আলজেরিয়া নিজেদের শেষ ম্যাচে চিলিকে ৩-২ গোলে হারালেও নকআউটে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল অন্তত চার গোলের ব্যবধান। ফলে তাদের ভাগ্য নির্ভর করছিল জার্মানি–অস্ট্রিয়া ম্যাচের ওপর।

সমীকরণ ছিল পরিষ্কার, পশ্চিম জার্মানি যদি এক বা দুই গোলের ব্যবধানে জেতে, তাহলে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া দু'দলই শেষ আটে উঠবে, আর আলজেরিয়া বিদায় নেবে। ম্যাচের ১০ মিনিটেই জার্মানি এগিয়ে যায়। এরপর দুই দলই কার্যত আক্রমণ বন্ধ করে দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বল আদান-প্রদান করতে থাকে। কেউ আর গোল করার বা ম্যাচের ফল বদলানোর কোনো বাস্তব চেষ্টা করেনি।

ম্যাচের এই নাটকীয় নিষ্ক্রিয়তা দর্শক, গণমাধ্যম ও ফুটবল বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। পশ্চিম জার্মানির এক ধারাভাষ্যকার প্রতিবাদস্বরূপ ম্যাচের বর্ণনা দেওয়া বন্ধ করে দেন, আর অস্ট্রিয়ার এক ধারাভাষ্যকার দর্শকদের টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই ঘটনার পর ফিফা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচ একই সময়ে আয়োজন বাধ্যতামূলক করে, যাতে কোনো দল আগে থেকে ফল জেনে সুবিধা নিতে না পারে। তবে সম্প্রতি ৪৮ দলের বিশ্বকাপ এবং সেরা তৃতীয় স্থানের দলগুলোর নকআউটে ওঠার নিয়ম চালু হওয়ায়, এমন বিতর্ক আবারও ফিরে আসার আশঙ্কার কথা অনেকে তুলে ধরছেন।

৬. লুইস সুয়ারেজের কামড় (২০১৪)

Image

২০১৪ বিশ্বকাপের সময় লুইস সুয়ারেজ বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ছিলেন। তবে অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার পাশাপাশি মাঠে তার বিতর্কিত আচরণের ইতিহাসও ছিল দীর্ঘ।

২০১১ সালে লিভারপুলে খেলার সময় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার পাত্রিস এভরাকে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় তাকে আট ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। দুই বছর পর চেলসির ডিফেন্ডার ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচকে হাতে কামড় দেওয়ার ঘটনায় প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তার প্রথম কামড়ের ঘটনা অবশ্য সেটাও না; এর আগে আয়াক্সে খেলাকালে পিএসভির বিপক্ষে এক ডার্বি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কামড় দেওয়ায় সাত ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও ভোগ করেছিলেন।

তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বে ইতালির বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে সুয়ারেজ ইতালিয়ান ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় বসান। কিয়েল্লিনি রেফারির কাছে অভিযোগ করলেও ম্যাচ কর্মকর্তারা ঘটনাটি দেখতে না পারায় সুয়ারেজকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। মাত্র দুই মিনিট পর দিয়েগো গদিনের হেডে জয়সূচক গোল করে উরুগুয়ে ১-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে ইতালিকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে।

পরে ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে ফিফা সুয়ারেজকে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করে। ফলে ওই গ্রীষ্মেই বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর নতুন মৌসুমের শুরুর গুরুত্বপূর্ণ অংশে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাকে।

ভিএআরের সমালোচনা যতই হোক, এর পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিগুলোর একটি হলো—এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা আজ আর শাস্তি ছাড়া পার পেত না।

৫. ট্র্যাজেডি অব সেভিয়া (১৯৮২)

Image

ভিএআরের সমালোচনা যতই হোক, এর পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিগুলোর একটি হলো—এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা আজ আর শাস্তি ছাড়া পার পেত না।

১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচে স্কোর ছিল ১-১। সেই সময় ফ্রান্স অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি বদলি খেলোয়াড় পাত্রিক বাতিস্তোঁকে দারুণ একটি পাস বাড়ান। সামনে আর কোনো ডিফেন্ডার না থাকায় বাতিস্তোঁ গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষক হারাল্ড শুমাখার গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে প্রচণ্ড গতিতে তাকে সজোরে আঘাত করেন।

এই সংঘর্ষে বাতিস্তোঁ প্রায় ৩০ মিনিট অজ্ঞান ছিলেন। তার তিনটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়, মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে, দুটি দাঁত পড়ে যায় এবং মাঠেই তাকে অক্সিজেন দিতে হয়। পরে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখন তিনি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। অথচ অবিশ্বাস্যভাবে ডাচ রেফারি চার্লস করভার কোনো ফাউলই দেননি; বরং পশ্চিম জার্মানিকে গোল কিক দেন। এদিকে শুমাখার দ্রুত খেলা শুরু করতে চাইছিলেন, আর বাতিস্তোঁর সতীর্থরা আতঙ্কে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ঘটনার পরও শুমাখার অনুতাপ প্রকাশ না করে ঠাট্টার সুরে বলেন, বাতিস্তোঁ তো মাত্র দুটি দাঁত হারিয়েছেন, তিনি চাইলে নতুন দাঁত লাগানোর খরচ দিয়ে দেবেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানি টাইব্রেকারে ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠে, যদিও শিরোপার লড়াইয়ে ইতালির কাছে হেরে যায়। অন্যদিকে বাতিস্তোঁর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে লেগে যায় প্রায় ছয় মাস।

৪. ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ও বালোগুন বিতর্ক (২০২৬)

Image

যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পান। কিন্তু পরে ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে, ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেন। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ করেন, তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন।

ফিফা দাবি করে, বিচারের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু উয়েফা এই সিদ্ধান্তকে "অবোধ্য" ও "অযৌক্তিক" বলে সমালোচনা করে। নরওয়ের কোচ স্তোলে সোলবাক্কেনও এটিকে "খুবই বাজে সিদ্ধান্ত" বলে মন্তব্য করেন।

৩. কলম্বিয়ার ওপর মাদকচক্রের প্রভাব (১৯৯৪)

Image

১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ছন্দে থাকা দল ছিল কলম্বিয়া। বাছাইপর্বে বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে আর্জেন্টিনাকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের আনন্দ দেশের ভয়াবহ সহিংসতায় ম্লান হয়ে যায়। উদ্‌যাপনের সময় দাঙ্গা, সড়ক দুর্ঘটনা ও গোলাগুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হন। এ সময় পাবলো এসকোবার ও মেদেয়িন কার্টেল দুর্বল হয়ে পড়লেও, অন্য মাদকচক্রগুলো রক্তক্ষয়ী মাদকযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। ফলে বিশ্বকাপে কলম্বিয়া যায় এক গভীর জাতীয় সংকটের মধ্য দিয়ে।

জাতীয় দলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেশবাসীর জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রথম ম্যাচে গিওর্গে হাজির রোমানিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হার সবকিছু বদলে দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদকচক্রগুলো কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দল নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। খেলোয়াড়দেরও হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল হাইমে গোমেসকে কার্টেলের চাপের মুখে দল থেকে বাদ দেন মাতুরানা।

দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে কার্যত ছিটকে যায় কলম্বিয়া। সেই ম্যাচেই আত্মঘাতী গোল করেছিলেন ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পাঁচ দিন পর নিজ শহর মেদেয়িনে একটি নাইটক্লাব থেকে ফেরার পথে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ কেবল এক ফুটবল কেলেঙ্কারি ছিল না; বরং যে কোনো খেলার ইতিহাসে অপরাধ, সহিংসতার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি। বিশ্বকাপ চলাকালে কলম্বিয়া জাতীয় দলের ওপর মাদকচক্রের এই প্রভাব আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করা হয়।

২. মুসোলিনির কালো জার্সি (১৯৩৮)

Image

১৯৩৪ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের পর ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি সেই সাফল্যকে ফ্যাসিবাদের বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন। চার বছর পর, ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ইতালি শিরোপা ধরে রাখার পথে সেই রাজনৈতিক বার্তাকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে জার্সির রঙের সংঘর্ষ এড়াতে ইতালির সাধারণ সাদা বিকল্প জার্সি পরার কথা ছিল। কিন্তু মুসোলিনির চাপে দলটি সম্পূর্ণ কালো জার্সি পরে মাঠে নামে। এই কালো রং ছিল মুসোলিনির প্রতি অনুগত ফ্যাসিবাদী আধাসামরিক সংগঠন ব্ল্যাকশার্টস-এর প্রতীক। এর মাত্র কয়েক মাস আগে নাৎসি জার্মানি আনশলুস–এর মাধ্যমে অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। এমন উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে কালো জার্সি পরে জাতীয় সংগীতের সময় ইতালীয় খেলোয়াড়দের ফ্যাসিবাদী (নাৎসি-ধাঁচের) সালাম দিতে দেখা যায়। এতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ফরাসি দর্শকেরা তীব্র দুয়োধ্বনি করেন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ইতালির ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিতর্ক সত্ত্বেও ইতালি ম্যাচটি ৩-১ ব্যবধানে জিতে নেয়। পরে ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়। তবে সেই সাফল্যের পাশাপাশি ১৯৩৮ সালের এই রাজনৈতিক প্রদর্শন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও কলঙ্কজনক ঘটনা হিসেবে আজও স্মরণ করা হয়।

১. হ্যান্ড অব গড (১৯৮৬)

Image

মাত্র তিনটি শব্দ—‘হ্যান্ড অব গড’। ফুটবল ইতিহাসে এর চেয়ে পরিচিত বিতর্ক খুব কমই আছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে দিয়েগো মারাদোনা হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েছিলেন। এটা শুধু বিশ্বকাপ না, গোটা ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি।

এই ম্যাচের আবহ ছিল অন্য যেকোনো বিশ্বকাপ ম্যাচের চেয়ে আলাদা। ম্যাচটি শুধু মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই ছিল না; এটা ছিল সদ্য যুদ্ধ শেষ করা দুই দেশের মুখোমুখি হওয়ার উত্তেজনাও। মাত্র চার বছর আগে ফকল্যান্ড (মালভিনাস) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল, যাতে ৯০৭ জন নিহত হন। যুদ্ধের পরও দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। এমনকি আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার রেডিওতে ইংরেজি গান সম্প্রচারও নিষিদ্ধ করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করলেও তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের সেটি বুঝতে পারেননি এবং গোলের স্বীকৃতি দেন। মুহূর্তেই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য মিরর শিরোনাম করেছিল ‘Cheat’ (প্রতারক), আর ডেইলি এক্সপ্রেস লিখেছিল, ‘Genius—and a Cheat!’ (প্রতিভাবান, কিন্তু প্রতারকও)।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মারাদোনাই প্রথম গোলটির নাম দেন ‘হ্যান্ড অব গড’। পরে তিনি এটিকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ বলেও বর্ণনা করেছিলেন। তবে এই ঘটনাটি আজ সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হয় মারাদোনার চরিত্রের প্রতীক হিসেবে—চতুর, ধূর্ত, বিতর্কিত, কিন্তু একই সঙ্গে অসাধারণ প্রতিভাবান।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই একই ম্যাচেই মারাদোনা ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি কিংবদন্তি মুহূর্ত সৃষ্টি করেন। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে চারজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে, গোলরক্ষক শিলটনকে পাশ কাটিয়ে তিনি করেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার পরে স্বীকার করেছিলেন, সেই গোলের সৌন্দর্য দেখে মাঠেই হাততালি দিতে ইচ্ছা হয়েছিল তার।

আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে এবং মারাদোনার অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপাও জিতে নেয়।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।