বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬
হালান্ড জাদুতে বিদায় ব্রাজিল
নরওয়ের বিপক্ষে ফুটবল মাঠের ইতিহাস বদলাতে পারলো না ব্রাজিল। আর্লিং ব্রট হালান্ডের দুই গোলে ২-১ ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে।

আর্লিং হালান্ডের দুই গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে নরওয়ে
নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নরওয়ের বিপক্ষে অভিশাপ কাটানোর লড়াই ব্রাজিলের, সাথে হেক্সা মিশনে টিকে থাকা। আগের চারবারের দেখায় ভাইকিংদের একবারও হারাতে পারেনি ব্রাজিল। ১০৭০ ম্যাচ, ৮৮টি ভিন্ন দেশ, কেবল নরওয়েই একমাত্র দল, যাদের বিপক্ষে একাধিক ম্যাচ খেলেও ব্রাজিলিয়ানদের জয়ের খাতায় শূন্য লেখা। সেই ইতিহাস বদলানোর ম্যাচও এটি। কিন্তু ইতিহাস বদলালো না।
৪-৪-২ ফরম্যাশনে দল সাজান ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। চোটাক্রান্ত লুকাস পাকেতার জায়গায় একাদশে আসেন আগের ম্যাচের জয়সূচক গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। এ ম্যাচেও নেইমার ও এনড্রিকের জায়গা হয় বেঞ্চে। অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে মাঠে নরওয়ে, আক্রমাণাত্মক ৪-১-২-৩ ফরম্যাশনে দল সাজান কোচ স্টালে সলবাক্কেন।

ম্যাচ জয়ের পর ব্রাজিলের কাসেমিরোকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন হালান্ড
তৃতীয় মিনিটেই গোলের উল্লাসে মাতে নরওয়ে, ব্রাজিল সমর্থকদের বুক থেকে শীতল হাওয়া সরিয়ে দেয় সহকারি রেফারির অফসাইড পতাকা। ম্যাথুস কুনিয়াকে ডিবক্সের ভেতরে ফাউল করেন নরওয়ে ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ার। ভিএআরের সহায়তায় মাঠের পাশে থাকা মনিটরে দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। নিজে শট না নিয়ে ব্রুনো গিমারায়েসকে পেনাল্টি নিতে বল এগিয়ে দেন ভিনিসিউস জুনিয়র। ব্রুনোর নেওয়া দুর্বল শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন নরওয়ে গোলরক্ষক ওরিয়ান নিল্যান্ড। লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ মিস করে ব্রাজিল। ম্যাচের তখন ১৪ মিনিট। আর এখানেই মূলত ম্যাচে ব্রাজিলের ভাগ্য লেখা হয়ে যায়।
এর আগে পেনাল্টি শুট আউটের বাইরে পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন জিকো, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে, ফ্রান্সের বিপক্ষে। চল্লিশ বছর পরে এমন ব্যর্থতায় নিজের নাম লেখালেন গিমারায়েস।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে দুই দলই সমানতালে আক্রমণ সাজিয়েছে। এর মধ্যেও ব্রাজিলের সুযোগগুলি বেশি পরিষ্কার। মার্টিনেল্লি দুটি সুযোগ নষ্ট করেন, ভিনির শট সেইভ করেন নিল্যান্ড। আরেকবার কাউন্টার অ্যাটাকে দুই বনাম দুইয়ের লড়াইয়ে ভিনিকে ফাঁকায় পেয়েও পাস দেননি কুনিয়া।
নরওয়ের বল পজেশন বেশি রাখলেও, গোলের সুযোগ বেশি তৈরি করে ব্রাজিল। তবে অনটার্গেট শট দুই দলেরই সমান দুটি। প্রথমার্ধ শেষ হয় স্কোর ০-০ রেখে।
অবাক করে দিয়ে আলেকজান্ডার সরোলথ ও আন্তোনিও নুসাকে বদল করে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করে নরওয়ে। অস্কার বব ও শেলডেরাপকে নামান কোচ সলবাক্কেন। ৫৮ মিনিটে এনড্রিককে কুনিয়ার জায়গায় নামান আনচেলত্তি। মাঠের নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ম্যাচের নায়ক হতে পারতেন এই টিনেজার। ভিনি জুনিয়রের ডিফেন্স চেড়া পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষককে একা পেয়েও পোস্টের বাইরে বল মারেন এনড্রিক।
৬২ ও ৬৩ মিনিটে দুটি অসাধারণ সেইভ করে ব্রাজিলকে হতাশ করেন নরওয়ের গোলরক্ষক নিল্যান্ড। সুপার হিরো হয়ে যাওয়া এই গোলরক্ষক ডগলাস সান্তোস ও গিমারায়েসকে গোলবঞ্চিত করেন। মিনিট দুয়েক পর ব্রাজিলকে বাঁচান অ্যালিসন বেকার।
৬৭ মিনিটে মার্টিনেল্লি ও রায়ানকে তুলে নেইমার জুনিয়র ও দানিলো সান্তোসকে নামান আনচেলত্তি। ভিনি-এন্ড্রিক-নেইমার ত্রয়ীর আক্রমণভাগ তেমন সুবিধা করতে পারছিলো না, উল্টো হাইড্রেশন ব্রেকের পর-পর ব্রাজিলকে রক্ষা করেন অ্যালিসন।

এবারের বিশ্বকাপে ৭ গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে শামিল হালান্ড
তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ৭৯ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় শেলডারপের ক্রসে লাফিয়ে মাথা ছুঁইয়ে নরওয়েকে এগিয়ে দেন আর্লিং ব্রট হালান্ড। হালান্ডের শারীরিক সক্ষমতার কাছে হেরে যান তাঁর মার্কার গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস। বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে নিজের ৬ নম্বর গোলটি করেন হালান্ড।
৮৬ মিনিটে আবারও সুপারম্যান হয়ে যান নরওয়ে গোলকিপার নিল্যান্ড। এবার দুর্ঘটনাবশত সতীর্থ ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ারের হাঁটুতে বল লেগে ডান প্রান্ত দিয়ে গোলের দিকে ঢোকার মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে ঠেকান নিল্যান্ড।
৯০ মিনিটে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেন হালান্ড। আবারও শেলডারপের পাস থেকে নিখুঁত শটে ব্যবধান ২-০ করেন হালান্ড আর ব্রাজিলের বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে দেন। ৭ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে অবস্থান করছেন এই সুপারস্টার স্ট্রাইকার।
যোগ করা সময়ের শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে এক গোল ফিরিয়ে দেন নেইমার, কিন্তু খেলায় ফেরার জন্য তা যথেষ্ট ছিলো না। মিরাকল ঘটাতেও যে সময় দরকার, তা ছিলো না ব্রাজিলের জন্য।

নেইমার জুনিয়রের কান্নাভেজা বিদায়
শেষ পর্যন্ত ৫ম বারের দেখাতেও নরওয়েকে হারাতে না পারায়, ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় নরওয়ে। আর নিজের ক্যারিয়ারে রূপকথার মতো আরেকটি অধ্যায় যোগ করেন আর্লিং হালান্ড।
এই হারে বিশ্বকাপ জয় থেকে অন্তত ২৮ বছরের দূরত্বে চলে এলো ব্রাজিল, যা এর আগে কখনো হয়নি। আর সেলেসাওদের বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকো ও ইংল্যান্ড ম্যাচের জয়ী দলের সাথে খেলবে নরওয়ে। ভাইকিংদের রোয়িং আবারও দেখবে বিশ্ব।

রুহুল মাহফুজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।