ফুটবল, মরক্কো, ওয়াহবি, আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ, বিশ্বকাপ
মোহাম্মদ ওয়াহবি: মরক্কোর ডাগআউট হিরো
কোচ হিসেবে মোহাম্মদ ওয়াহবি নামটি আমাদের কাছে জনপ্রিয় না একদমই। অন্তত এখনো না। নামটাও হয়ত প্রথম শুনছেন অনেকে। যদিও আগামী কয়েকটা দিনেই বদলে যেতে পারে অনেকগুলো নামের ওজন ও খ্যাতির উঠানামা।

মোহাম্মদ ওয়াহবি: মরক্কোর ডাউআউট হিরো
কোচ হিসেবে মোহাম্মদ ওয়াহবি নামটি আমাদের কাছে জনপ্রিয় না একদমই। অন্তত এখনো না। নামটাও হয়ত প্রথম শুনছেন অনেকে। যদিও আগামী কয়েকটা দিনেই বদলে যেতে পারে অনেকগুলো নামের ওজন ও খ্যাতির উঠানামা।
মোহাম্মদ ওয়াহবি। আশরাফ হাকিমির প্রাণপণ লড়াকু বাহিনীকে ডাগআউট থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যিনি। আধুনিক ফুটবল খেলোয়ারদের ইন্ডিভিজ্যুয়াল মেধা ও দক্ষতার চাইতে দুই কোচের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে আগের চাইতে অনেক বেশি। যেন দাবার ছকের দুই পাশে দুইজন। গুটিদের ইন্ডিভিজ্যুয়াল স্কিল হচ্ছে অতিরিক্ত সুবিধা।
সুতরাং, মোহাম্মদ ওয়াহবি সম্পর্কে কিছু তথ্য না জানলেই নয়।

কোচ হিসেবে মোহাম্মদ ওয়াহবি নামটি আমাদের কাছে জনপ্রিয় না একদমই। অন্তত এখনো না। নামটাও হয়ত প্রথম শুনছেন অনেকে। যদিও আগামী কয়েকটা দিনেই বদলে যেতে পারে অনেকগুলো নামের ওজন ও খ্যাতির উঠানামা।
উদাহরণ সহজ, ২০২২ এর আগে আর্জেন্টাইন ফ্যানদের কয়জন জানতেন প্রাণপ্রিয় সুপারস্টার মেসির সেই আর্জেন্টিনা দলটির কোচ কে? মানে, লিওনেল স্কালোনি নামটা কয়জন শুনেছিলেন বা চিনতেন? এমনকি প্রিয় দলের কোচ হবার নিউজ সামনে আসার পরও হয়ত কয়েক সেকেন্ড পরেই এড়িয়ে গেছেন বা ভুলে গিয়ে ২০১৮ এর হতাশার স্মৃতি ভেবেছিলেন। অথচ এর পরের গল্প সবাই জানেন।
অতএব, ক্লিশে হলেও বিশ্বকাপে কোনো দলকেই দুর্বল বা ছোট ভাবার উপায় নাই, উক্তির মতোই কোচদেরও খ্যাতির ভিত্তিতে যোগ্যতা মাপার সুযোগ নেই। অন্তত আধুনিক ফুটবলে তো না-ই।
পয়েন্টে এসে সংক্ষেপে বলি। ব্রাজিলের দৌড় যেবার কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ছিল, নেইমাররা ফিরে গিয়েছিলেন নিজের দেশে। তখনো টিকে ছিল এই আশরাফ হাকিমির মরোক্কো। গত আসরে সেই সেমি-ফাইনালিস্ট মরক্কো— ইয়াসিন বুনুর গোলকিপিং০এ বিশ্ববাসী মুগ্ধ হয়। কী বলব? কোটি কোটি ফুটবলভক্তদের অবাক করে দেয়া মরোক্কো—হয়ে ওঠে অসংখ্য ফুটবলপ্রেমিদের প্রিয় দল বা অন্তত দ্বিতীয় প্রিয় দল।
এমনকি বিশ্বকাপের সময় মরক্কোর নাম শুনতেই গ্রামের চায়ের দোকানে বসা কারো না কারো হাতের লোম দাঁড়িয়ে যায়, জোর গলায় প্রশংসা শুরু করে। সেই অদম্য ফুটবল দলের পরবর্তী কোচ যে কেউ যে হবার না, সেটা মোহাম্মদ ওয়াহবি সম্পর্কে কয়েকটা তথ্য দিলে, আশা করি তাঁর যোগ্যতা নিয়ে দ্বিধা বা তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে কারো বাঁধা থাকবে না।
গত বছর, ফিফা অনূর্দ্ধ-২০ বিশ্বকাপ ২০২৫। এই ভদ্রলোকের নেতৃত্বেই মরক্কো অনূর্দ্ধ-২০ দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে পরাজিত করেন তারা। জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ানি ছিলেন সেই আর্জেন্টাইন স্কোয়াডের তারকা খেলোয়ার। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে আছেন বেনফিকার এই রাইট উইঙ্গার, এটাকিং মিডফিল্ডার। আর ফিফার এবারের সবচেয়ে আলোচিত্য ‘ভিনিসিয়াস আইন’ সম্পর্কে জানেন অনেকেই। এই আইন তৈরির খলনায়ক প্রেস্টিয়ানি।

ওয়াহবির নেতৃত্বে ২০২৫ বিশ্বকাপে মরক্কো অনূর্দ্ধ-২০ চ্যাম্পিয়ন হয়
যাই হোক, ফিফা অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ আসরে জুনিয়র মরোক্কোর চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার পথে হারায় ফ্রান্স, স্পেন, ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিদের। ইতিহাস গড়ে দেন কোচ হিসেবে। কারণ, ফিফা অনূর্ধ্ব ২০ জেতা আফ্রিকার কোনো দেশ হিসেবে মরক্কো ২য়। আর সেই মরোক্কো অনূর্ধ্ব ২০ স্কোয়াড থেকে এবারের বিশ্বকাপে দলে আছেন ৬ জন। সেই ছয়জনের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী লিল এর মিডফিল্ডার আইয়ুব বোয়াদ্দির নাম উল্লেখ করতেই হবে।
আর মোহাম্মদ ওয়াহবি? আফ্রিকার ২০২৫ বর্ষসেরা কোচদের একজন হিসেবে ঘোষিত হন। এছাড়া উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, ২০২৪ সালে মরোক্কো অনুর্ধ ২০ দলেরই কোচ ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আফ্রিকান ন্যাশনস কাপ ২০২৫ খেলার যোগ্যতা লাভ করে। বড় আসরে এসেও চমক, রানার-আপ হয় তার দল।
যাই হোক, তুলনা করলে, জাতীয় মূল দলের কোচ হিসেবে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও ওয়াহবির শক্তির জায়গা সেই মডার্ন ইউরোপীয় ট্যাকটিকসই। তিনি বেলজিয়ামের গ্রাসরুট লেভেলের কোচ ছিলেন বহুকাল। এছাড়াও উয়েফা টুর্নামেন্টগুলোতে বেলজিয়ান ক্লাবের সহকারী কোচ হিসেবে অভিজ্ঞতা আছে।
মরক্কো ২০২৫-এ আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। প্লাস পয়েন্ট হিসেবে ব্রাহিম দিয়াজের মরক্কো দলে যোগদান—চমৎকার একজন খেলোয়াড়, আনপ্রেডিক্টেবল, গতিময়। চলমান বিশ্বকাপ আসরে আফ্রিকান কোনো খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ডটাও করে ফেললেন। প্রথম রাউন্ডে ভুগিয়েছেন ব্রাজিলকে।
মরক্কোর আফকন চ্যাম্পিয়ন হবার সেই সাফল্যের কারিগর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই পদত্যাগ করার পরই দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ ওয়াহবি। ডাগআউট থেকে যার নেতৃত্বেই এই আসরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে দলটি। টুর্নামেন্টে বড় প্রত্যাশা নিয়ে আসা মরক্কো সেই স্বপ্নও পূরণ করে চলেছে তার কৌশলে। এছাড়া, মরক্কোর টানা ২৯ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে এসেছিল, বিশ্বকাপে এসে যে সংখ্যায় আরো ৫ ম্যাচ যোগ হয়েছে মোহাম্মদ ওয়াহাবির ফুটবল কৌশলে।
এক কথায়, মরক্কো জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি অত্যন্ত দূরদর্শী ও লড়াকু ফুটবল কোচ। অসাধারণ রণকৌশল, তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতি অগাধ আস্থা এবং খেলোয়াড়দের মাঝে মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করার জন্য বিশ্বজুড়ে দারুণ প্রশংসিত হচ্ছেন। তাঁর কয়েকটি বিশেষ গুণ সম্পর্কে যদি বলতে হয়—

ট্যাকটিশিয়ান ও লিডার:
ফুটবল মাঠে কৌশল নির্ধারণে ওয়াহবি অত্যন্ত বিচক্ষণ। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষিপ্র সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দলের খেলার ধরনে পরিবর্তন এনে জয়ের পথ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ পারদর্শী।
ভাগ্য নয়, নিজ হাতে সাফল্য গড়ার রূপকার:
মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দলকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য সাফল্য এনে দেওয়ার পর তিনি জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে মরক্কো দল শুধু ভালো খেলাই খেলছে না, বরং বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মানসিক দৃঢ়তার কারিগর:
তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হলো খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন যে কঠিন সময় পার করার মানসিকতা ছাড়া বড় কোনো শিরোপা জেতা সম্ভব নয়।
বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা:

তাঁর অধীনে মরক্কো দল নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের প্রতি সবার সম্মান ও শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছে। স্বাগতিক কানাডাকে ৩-০ গোলে জিতে ইতোমধ্যে শেষ ৮-এ জায়গা করে নিয়েছেন।
দেশপ্রেমিক ও অনুপ্রেরণার উৎস:
তিনি সবসময় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের আবেগকে গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, মাঠে লড়াই করার মূল শক্তি হলো দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন।
তবে আগামী ১০ জুলাই (বাংলাদেশ সময়), শিরোপার বড় দাবিদার ও পরাশক্তি ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই ম্যাচে মরক্কো যদি জিতে যায়, তবে কি অঘটন বলে বিবেচিত হবে, নাকি মোহাম্মদ ওয়াহবি নামটি ফুটবল ভক্তদের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেবে?
সময়ই সেই উত্তর জানিয়ে দেবে।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।