খেলারদেশ

ফ্রান্সকে থামাতে পারে আর্জেন্টিনার ‘পাছাপাছি’ই!

সবার প্রশ্ন, যে দুর্দান্ত গতির ফুটবল খেলছে ফ্রান্স, তাদের রুখবে কে? কেন, আর্জেন্টিনা! ওয়েট-এর বিপরীতে কাউন্টার ওয়েট সেট করতে হয়। ফ্রান্সের গতিশীল ফুটবলের কাউন্টার ওয়েট সত্যিই আর্জেন্টিনার আছে? উত্তর খুঁজেছেন রাজীব হাসান

ফ্রান্সকে থামাতে পারে আর্জেন্টিনার ‘পাছাপাছি’ই!
রাজীব হাসান
By রাজীব হাসান

২০০৪ সালে গ্রিক-রূপকথা দেখল ইউরো। ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালির জয়কে রূপকথার গৌরব না দিলেও দুর্দান্ত কোনো উপন্যাসের ক্ল্যাইম্যাক্স তো বলাই যায়। ইতালি বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল ঘরোয়া ফুটবলের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে।

গ্রিস আর ইতালির শরীর-নির্ভর ফুটবল দোটানায় ফেলে দিল আর্জেন্টিনাকে। ১৯৯৩ সালের পর থেকে এই দল শিরোপাহীন। এমনকি লিওনেল মেসির মতো প্রতিভাকে দিয়েও আর্জেন্টিনা হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে পারছে না। তবে কি তাদের ট্র্যাডিশনাল ট্যাঙ্গো ফুটবল অচল হয়ে গেল?

আর্জেন্টিনা একের পর এক কোচকে দিয়ে সবকিছুই করল। এমনকি জুয়ায় ক্রমাগত হারতে হারতে বেপরোয়া হয়ে ম্যারাডোনার মতো ‘এল লোকো’কেও বসাল ডাগআউটে। কাজ হলো না।

মেসি যেন আর্জেন্টিনা দলের সব।

মেসি যেন আর্জেন্টিনা দলের সব।

আর্জেন্টিনার মধ্যে এই বিশ্বাস প্রবল হলো, সমস্যা তাদের সিস্টেমে। এখনকার ফুটবলে এই ছোট ছোট পাস দিয়ে চলে না। আর্জেন্টিনার কোচ হয়ে এলেন হোর্হে সাম্পাওলি। সাম্পাওলি তখন চিলিকে টানা দুটি কোপা আমেরিকা জিতিয়ে মাত্র দায়িত্ব নিয়েছেন স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার। সেখানেও দারুণ করছেন। ৪০ ম্যাচ ধরে অপরাজিত সর্বজয়ী দল জিদানের রিয়াল মাদ্রিদকেও হারিয়েছেন।

পরের বছরই রাশিয়ায় বিশ্বকাপ। সাম্পাওলির নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সেভিয়ার সাথে চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়িত্ব নিলেন আর্জেন্টিনার। মেসিকে নিয়ে বিশ্বকাপ জিতবেন বলে।

সাম্পাওলির মধ্যেই সমাধান দেখল সবাই। কেউ যখন পারেনি, চিলির মতো দলকে টানা দুটি কোপা জেতানো সাম্পাওলিই পারবেন। মাথায় চুল না থাকলে কী হবে, আসল জিনিস আছে চান্দির নিচে। ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে অভিষেকে জিতলেনও।

বিশ্বকাপে সাম্পাওলির বিদায়টা হলো বেদনাদায়ক। চার ম্যাচে ৯ গোল হজম করে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ আর্জেন্টিনা। ভারপ্রাপ্ত কোচ হলেন লিওনেল স্কালোনি, তার সাথে থেকে গেল পাবলো আইমার ও মাতিয়াস মান্না।

নায়ক মান্নার মতো এই মান্না ডাকাবুকো টাইপ কেউ নয়। আর্জেন্টিনায় জন্মালে হাঁটতে শেখার আগে সবাই ফুটবলে লাথি মারতে শেখে—তার ফুটবল ক্যারিয়ার অতটুকুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মান্না একজনের খুব ভক্ত—পেপ গার্দিওলা।

পেপ তখন খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে, ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময়েই মান্না ব্লগ লেখা শুরু করেন। নাম দেন ‘প্যারাডিগমা গার্দিওলা’।

গার্দিওলা পরে বার্সার কোচ হয়ে অবিশ্বাস্য সাফল্য এনে দিলেন। ‘প্যারাডিগমা গার্দিওলা’য় মান্না প্রমাণ করে দিলেন, গার্দিওলা যে ফুটবল খেলছে, সেটার নির্যাস মূলত আর্জেন্টিনার। গার্দিওলা বিয়েলসাকে একলব্যের মতো সাধণা করে। ছোট ছোট পাস সাথে আকস্মিক আক্রমণ—টিকিটাকা তো আর্জেন্টিনারই ফুটবল। সেই ফুটবলের প্রাণভোমরা মেসিও তো আর্জেন্টিনারই। বার্সেলোনা পারলে আর্জেন্টিনা কেন পারবে না?

আর্জেন্টিনার উচিত নিজেদের ফুটবলেই আঁকড়ে ধরা। শুধু সময়ের প্রয়োজনে যতটুকু পরিবর্তন আনা ততটুকুই।

দুই দলের সবশেষ মুখমোখি বিশ্ব ফুটবলে ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে

দুই দলের সবশেষ মুখমোখি বিশ্ব ফুটবলে ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে

ফ্রান্স যে আল্টিমেট হাই প্রেসিং, ইনটেনসিটি আর ট্রানজিশন-নির্ভর ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তার সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক যদি কোনো জাতীয় দলের হাতে থাকে, সেটা আর্জেন্টিনারই। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কারণ, গতির বিরুদ্ধে আমরা সাধারণত আরও বেশি গতি খুঁজি।

কখনো কখনো সবচেয়ে দ্রুতগতির দলকে হারানোর সবচেয়ে ভালো উপায়ই হলো ম্যাচটাকে ধীর করে দেওয়া। সময় গতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ধৈর্য। আর্জেন্টিনার ফুটবলে যার নাম ‘অগুন্তে’। চাপের মধ্যেও বল ধরে রাখার, ছন্দ না হারানোর মানসিকতা।

কিছুটা ধরন বদলেছে, নতুন প্রজন্ম এসেছে, শারীরিক ফুটবলের গুরুত্ব বেড়েছে। তবু মূল দর্শনে আর্জেন্টিনা এখনো ট্যাঙ্গো ফুটবলই খেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটাকে অনেকে ঠাট্টা করে ‘পাছাপাছি’ বলে, সেটাই আসলে তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, আর্জেন্টিনা এত ছোট ছোট পাস দেয় কেন? দেখলে মনে হয়, অহেতুক সব পাস। ডিরেক্ট ফুটবল না খেলে এত ডায়াগোনাল পাস কেন? এতে তো আক্রমণ ধীর হয়ে যায়। আসলে আমরা টিভি ক্যামেরায় বলটা দেখি, কিন্তু বলের বাইরে কী হচ্ছে, সেটা খুব কমই দেখতে পাই। এই ছোট ছোট পাসের সময়ই আসল নাটকটা ঘটে।

দুর্দান্ত ফর্মে ফ্রান্স দল

দুর্দান্ত ফর্মে ফ্রান্স দল

একজন ডানদিকে সরে যায়, আরেকজন ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফুলব্যাক ওপরে ওঠে, উইঙ্গার ভেতরে আসে। মিডফিল্ডার জায়গা বদলায়। প্রতিপক্ষও বাধ্য হয় তাদের সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে। ফলে পুরো ডিফেন্সিভ ব্লক ধীরে ধীরে নিজের আকার হারাতে শুরু করে। বাইরে থেকে মনে হয়, আর্জেন্টিনা শুধু পাস খেলছে। বাস্তবে তারা প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে একটু একটু করে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে।

এটা দাবার মতো। এক চালে চেকমেট হয় না। আগে প্রতিপক্ষের ঘুঁটি ভুল জায়গায় আনতে হয়। আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক গোলগুলোর দিকে খেয়াল করলেই বুঝবেন। ধীর গতি, ছোট ছোট পাস। হঠাৎ আক্রমণ।

এই কারণেই আর্জেন্টিনার ফুটবলে ঐতিহ্যগতভাবে একজন রেজিস্তার গুরুত্ব এত বেশি। রেজিস্তার কাজ শুধু পাস দেওয়া নয়। তার কাজ হলো পুরো ম্যাচের তাল নিয়ন্ত্রণ করা। কখন ধীর হবে, কখন হঠাৎ গতি বাড়বে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টর যেমন।

অনেক বছর আগে এই ভূমিকা পালন করতেন ফার্নান্দো রেডন্ডো। পরে বিভিন্ন সময়ে করেছেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। আর্জেন্টিনা এই একজন রেজিস্তার অভাবে ভুগেছে দীর্ঘকাল। এখন সেখানেই ফলেছে সোনালি ফসল।

এই দলে এখন নির্দিষ্ট কোনো রেজিস্তা নেই। কখনো রদ্রিগো ডি পল, কখনো আলেক্সিস ম্যাকঅ্যালিস্টার, কখনো এনজো ফার্নান্দেজ। মাঠে নামলে লো সেলসো। আবার কখনো মেসি নিজেই সেই ভূমিকা নিয়ে নেন। অর্থাৎ রেজিস্তা এখন একজন ব্যক্তি নয়, একটি দায়িত্ব।

সআর্জেন্টিনার ছোট পাসগুলো আসলে ধৈর্যের বিনিয়োগ। সব পাসের উদ্দেশ্য সামনে যাওয়া নয়। অনেক পাসের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ভুল জায়গায় নিয়ে আসা।

এ কারণেই আর্জেন্টিনার ছোট পাসগুলো আসলে ধৈর্যের বিনিয়োগ। সব পাসের উদ্দেশ্য সামনে যাওয়া নয়। অনেক পাসের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ভুল জায়গায় নিয়ে আসা।

এই জায়গাটাই ইউরোপের অনেক হাই-প্রেসিং দলের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করে। পিএসজি কিংবা ফ্রান্স—তাদের দর্শন হলো, যত দ্রুত সম্ভব বল কেড়ে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আক্রমণে যাওয়া। কারণ তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গতি। যত বেশি ওপেন স্পেস, তত বেশি ভয়ংকর তারা।

আর্জেন্টিনা উল্টো কাজটা করে। তারা স্পেস ওপেনই হতে দেয় না।

ম্যাচের গতি এত ধীর করে দেয় যে ফ্রান্সের মতো দল বারবার থেমে যেতে বাধ্য হয়। প্রতিটি আক্রমণের আগে তাদের আবার ডিফেন্স সাজাতে হয়। আবার প্রেস করতে হয়। আবার দৌড়াতে হয়। ধীরে ধীরে সেই ভয়ংকর ইনটেনসিটিই কমতে শুরু করে।

এটা শুধু তত্ত্ব নয়। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

প্রথম ৭৫ মিনিটে ফ্রান্স যেন নিজেদের চিনতেই পারেনি। কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রায় বিচ্ছিন্ন। মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার পাসের জালে বলই পাচ্ছিল না ফ্রান্সের আক্রমণভাগ। অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি ও আদ্রিয়াঁ রাবিও বারবার বলের পেছনে ছুটেছেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি।

কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসি

কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসি

দ্বিতীয় গোলটার কথা মনে করুন। অনেকেই শুধু শেষের ফিনিশিংটা মনে রাখেন। কিন্তু গোলটির শুরুতে প্রায় পুরো দল বলে স্পর্শ করেছিল। এক পাশ থেকে আরেক পাশ। তারপর আবার ভেতরে। এরপর হঠাৎ গতি। মেসির একটা মাইডাস টাচ দিয়ে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক। শেষ পর্যন্ত আনহেল দি মারিয়ার ফিনিশ।

ওই গোলটি ছিল ট্যাঙ্গো ফুটবলের ক্লাসিক উদাহরণ। ধীর লয়ের ভেতর হঠাৎ দ্রুতলয়ে বেজে ওঠা ড্রামবিট। ক্রেসেন্ডোতে পৌঁছানো। এ কারণেই স্কালোনির দলকে শুধু পজেশন-ভিত্তিক দল বললে ভুল হবে। তারা পজেশন রাখে বলের প্রেমে পড়ে নয়। তারা পজেশন রাখে সময়কে নিজের মুঠোয় রাখার জন্য।

আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড বল হোল্ড করে রাখে বলে ডিফেন্সের ওপর চাপও পড়ে কম। সুন্দরবন যেভাবে সাইক্লোনের প্রথম ধাক্কা সামলে নেয় বুক পেতে। কিন্তু কোনো কারণে মিডফিল্ড যদি ব্যর্থ হয়?

এটাই সমস্যা। প্রতিপক্ষ সফলভাবে প্রথম প্রেস ভেঙে দ্রুত ট্রানজিশনে চলে গেলেই খেই হারিয়ে ফেলে আর্জেন্টিনা। গত বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে চাপে ভেঙেছে। ফাইনালে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত পাত্তা না পাওয়া ফ্রান্স হঠাৎ বদলে দিয়েছে ম্যাচের রঙ।

ফ্রান্স দলের সবাই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন

ফ্রান্স দলের সবাই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন

আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপেও ভুগেছে কাবো ভার্দের বিপক্ষে। গত বিশ্বকাপের শিক্ষা থেকেই স্কালোনির উচিত ছিল ডিফেন্স নিয়ে ভাবা। রেমোরো-লিসা জুটি ঠিক আছে। কিন্তু এ ছাড়া এই ডিফেন্সে আর কিছু নেই। এখনো বুড়া ওতামেন্দি কীভাবে এই দলে থাকে? সেন্টারব্যাকের ভালো বিকল্প নিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে আসেইনি।

সবচেয়ে বড় সমস্যা দুই উইংয়ে। একে তো ডি মারিয়া না থাকায় উইংয়ে আক্রমণের ধার নেই। ভরসা করার মতো দুজন ফুলব্যাকও আর্জেন্টিনার নেই। রাইটব্যাক হলো মলিনা, তার বিকল্প মন্টিয়েল! লেফটব্যাকে তাগলিয়াফিকোই কোচের প্রথম পছন্দ ছিল। কিন্তু দ্রুতই তাকে বেঞ্চে রেখে এখন মেদিনার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে স্কালোনিকে।

গত বিশ্বকাপে সৌদি ম্যাচের পর স্কালোনি দলে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। পরিবর্তন এনেছিলেন কৌশলে। কাবো ভার্দের বিপক্ষে রিয়েলিটি চেকের পর এখন কোচ কী করেন সেটাই দেখার অপেক্ষা।

রাজীব হাসান

রাজীব হাসান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।