মেসি, মেসির অজানা গল্প,মেসির জীবনী, মেসি হরমোন সমস্যা, ইনজেকশন, বার্সেলোনা, লা মাসিয়া, লা রিগা, বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা
মেসির অজানা গল্প: ভাঙা পা থেকে বিশ্বজয়ী
লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ জিততে দেখে কোটি কোটি ভক্ত যে উল্লাসে ভেসেছিলেন ২০২২ সালে, তারা অনেকেই জানেন না বিশ্বসেরা ফুটবলার হবার পেছনে লুকিয়ে থাকা অনেক অজানা গল্প, যে গল্পে মেসি বিশ্বকাপ জয়ের আগে জিততে হয়েছে নিজের শরীরকে, পৃথিবীর নির্মমতাকে। মেসির বার্সা সতীর্থ ভিক্টর ভাসকেজ জানান সেইসব অজানা ও চমকপ্রদ গল্প। মেসি ও মেসির এচিভমেন্টের ভারে যেসব গল্প রয়ে গেছে অখ্যাত, অচেনা, অজানা।

মেসির অজানা গল্প: ভাঙা পা থেকে বিশ্বজয়ী, হরমোন ইনজেকশন ও বিশ্বকাপ জয়ের আগে পারি দেয়া কর্কশ ও বন্ধুর পথের কিছু অজানা গল্প
গল্পটা মেসির। তবে এই গল্পের বর্ণনা স্পেনের সাবেক ফুটবলার ভিক্টর ভাসকেজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতা-প্রসূত।
সাবেক ফুটবলার ভিক্টর ভাসকেজ ২০১৭-তে টরন্টো এফসির হয়ে জিতেছেন এমএলএস কাপ। এরচেয়ে বড় পরিচয় যদিও আছে তার; যে পরিচয় নিয়ে চিরকাল তিনি ভীষণ গর্বিত—ভাসকেজ ছিলেন বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়া এবং বার্সেলোনা মূল দলে মেসির সতীর্থ। মেসি একজনই, তবু স্পষ্ট করে যদি বলি, এই এটাকিং মিডফিল্ডার বড়ই হয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী, সর্বোচ্চবার ব্যালন ডি'অরজয়ী, আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসির সঙ্গে।
তাঁরই বর্ণনায় উঠে আসে সেই কিশোর মেসির অজানা গল্প—সেই লাজুক স্বভাবের কিশোর, মুখচোরা, স্বল্পভাষী, অথচ বিনয়ী। উঠে আসে ছোট্ট মেসির গুরুতর যত চোট, মাঠের বাইরের দিনগুলোর হতাশা।

লা মাসিয়া থেকে বার্সেলোনা মূল দলে: লিওনেল মেসি এবং ভিক্টর ভাসকেজ
মাত্র ১১ বছরে মেসির গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি (GHD) রোগের কথা প্রায় সবাই জানেন। মেসিভক্তরা এও জানেন, ফুটবলের ক্ষুদে জাদুকরকে নিতে হতো 'হিউম্যান গ্রোথ হরমোন' (HGH) বা সিনথেটিক গ্রোথ হরমোনাল চিকিৎসায় হরমোন ইনজেকশনের নেবার কথা। কিন্তু এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া, এতে নিয়মিত অসুস্থ হওয়া আর সীমাহীন শারীরিক কষ্টের কথা, নতুন দেশের অচেনা পরিবেশে টিকে থাকার গল্প, হয়ত সবাই জানেন না। অনেকে জানার পরও অনুভব করতে পারেন না, একটা কিশোর ছেলের শৈশব ও কৈশোর অন্য সবার মতো কেন স্বাভাবিক ছিল না। হয়ত টেরও পান না, বিশ্বসেরা ফুটবলারের হারা না মানা গল্পের পৃষ্ঠাগুলোতে লেগে থাকা ব্যথা আর পর্বতসম সব বাধা ডিঙিয়ে শৈশবের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানের আগে—নির্মম, কর্কশ, বন্ধুর পথে চলা দিনগুলোর স্মৃতি সম্পর্কে।

৫ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলি এবং ১৯৯৫ সালে রোজারিওর বিখ্যাত ক্লাব নিওয়েল'স ওল্ড বয়েজ-এ মেসি
৫ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে ফুটবল শুরু করেন। উল্লেখ্য, ক্লাবটির প্রথম কোচ ছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। গ্রান্দোলির পর, ১৯৯৫ সালে মেসি রোজারিওর বিখ্যাত পেশাদার ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দলে যোগ দেন। এই ক্লাবে তিনি দুর্দান্ত খেলতে থাকেন এবং আর্জেন্টিনায় তার নাম ছড়াতে থাকে। তার অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ সমর্থকরা তাকে 'দ্য মেশিন অফ ৮৭' নামে ডাকতেন; কারণ ১৯৮৭ তাঁর জন্মসাল।
কিন্তু নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে থাকতেই, ১১ বছর বয়সী, ৪'২" উচ্চতার মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। যে চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া একেবারেই কঠিন। এতে ফুটবলের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হবার সম্ভাবনা ছিল প্রায় শতভাগ। চিকিৎসার অভাবে মেসি যদি ফুটবল ছেড়ে দিতেন, আজ ফুটবলভক্ত বা মেসি-পাগল সমর্থকরা কী মিস করতো বা স্বয়ং ফুটবলই কী হারাতো, তা কোনোদিনই কারো জানা হতো না।
উপরন্তু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির আগে স্বয়ং বাঙালি সমাজেই উপেক্ষিত হতেন, কিন্তু পশ্চিমের বিশ্বস্বীকৃতির পর বাঙালি একযোগে তাঁর প্রতিভাকে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। মেসির ক্ষেত্রেও যেন একই অবস্থা হয়। আর্জেন্টিনার হয়ে এতকালের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ জিতে আনা এই মেসিরই চিকিৎসার খরচ নিজ দেশেরই সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর অন্যতম, রিভার প্লেট—চিকিৎসার ব্যাপারে অনাগ্রহী থাকে। যদিও তাঁর প্রতিভার কথা সব ক্লাবে ছড়িয়ে পড়েছে ততদিনে। এরপরও চিকিৎসার খরচে সহায়তা করতে রাজি হলেও, পুরো খরচ বহন করতে কিছুতেই রাজি হয়নি। ঠিক সেই সময় মেসির ভাগ্য বদলে দেন বার্সেলোনার স্কাউট কারলেস রেক্সাস।

কারলেস রেক্সাস (জন্ম: ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪৭)
২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাস ও তাঁর সহযোগীরা ১৩ বছর বয়সী মেসির ফুটবল প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন। মেসির বাবা হোর্হে মেসির সাথে চুক্তি পাকা করার সময় আশেপাশে কোনো কাগজ ছিল না। রেক্সাস হোটেলের একটি ন্যাপকিনের উপরই মেসির সাথে প্রথম প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ন্যাপকিনে লেখা ছিল, ক্লাব বার্সেলোনা মেসিকে নিজেদের দলে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যতিক্রমী, মজার, একইসঙ্গে ঐতিহাসিক এই চুক্তির মাধ্যমেই বার্সেলোনায় মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে।

বাঁয়ে: শিশু মেসি। জন্ম: আর্জেন্টিনার রোজারিও, ২৪ জুন, ১৯৮৭। ডানে: স্পেনের বিখ্যাত 'ডন কিহোতে দে লা মাঞ্চা' নন, বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত ও সত্যিকারের নায়ক হতে যাওয়া এক কিশোর, 'মেসি দে লা মাসিয়া'
অথচ ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনা বিদেশি খেলোয়াড় আনতই না বলতে গেলে। তাই ২০০০ সালের শরতে হঠাৎ আর্জেন্টিনা থেকে আসা এক কিশোরকে দেখে সবাই কৌতূহলী হয়ে ওঠে। যে কৌতুহল সময়ের স্রোতে বাড়ে বৈ কমে ভাঁটা পড়ে না।
অনুশীলনের আগে কোচরা জানালেন, ছেলেটি বার্সা একাডেমিতে ট্রায়াল দিতে এসেছে। নাম লিওনেল মেসি। প্রথম দিনই কোচ রোদলফো বোরেল তাকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি দলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান খেলোয়াড় সেস্ ফ্যাব্রেগাসকে ডেকে বললেন, 'নতুন ছেলেটিকে মার্ক করবে তুমি। দেখি কেমন খেলে!' ওয়ান ভার্সেস ওয়ান (1v1) আক্রমণ-রক্ষণ অনুশীলন শুরু হলো। এরপর যা ঘটল, তা কেউ কল্পনাও করেনি সেদিন।

সেস্ ফাব্রিগাসের স্মৃতিচারণ
ভাসকেজের ভাষ্যে, তিনবারের তিনবারই মেসি এমনভাবে সেস্ ফাব্রেগাসকে কাটিয়ে গেল যেন মাঠে ফাব্রেগাস বলে কিছু নেই। সেদিনই তিনি নিজ মনে বলে উঠেছিলেন, 'লিওনেল মেসি নামে এক অদ্ভুত ছোকরার সঙ্গে খেলছি আমি! এই নামটাও আমি জীবনেও ভুলব না।'
পরদিন কোচ আরও কঠিন পরীক্ষা নিতে চাইলেন। মেসিকে থামাতে এইবার দায়িত্ব পেলেন দলের সেরা ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে। কোচ কড়া নির্দেশ দিলেন, 'ওকে সহজে খেলতেই দেবে না। যেভাবেই হোক, থামাবে। এর জন্য যা যা করা দরকার, করতে পারো।' কিন্তু যা হবার সেদিনও একই কাণ্ড হলো, মাঠে জেরার্ড পিকে বলতে যেন কিছু নেই।

জেরার্ড পিকে ও মেসির লা মাসিয়ার দিনগুলো
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মেসির পায়ের সঙ্গে বল এমনভাবে লেগে থাকত যেন বলটা ওর শরীরের অংশ। ওকে যখনই ডিফেন্ডার ট্যাকল করতে পা বাড়ায়, মেসিও শেষ মুহূর্তের আলতো ছোঁয়ায় ডজ দিয়ে বল বের করে নিতো। আজকের মেসির যে ড্রিবলিং বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেই দক্ষতার বীজ তখন প্রোথিত ও মহীরুহের সম্ভাবনা নিয়ে মাটি ফুঁড়ে ওঠা এক চারা। মাঠের বাইরে যে ছেলে এত লাজুক, সেই ছেলেটাই ফুটবল মাঠে যেন অন্য মানুষ। লাজুক প্রসঙ্গে ভাসকেজ বলেন, ড্রেসিংরুমের এক কোণে চুপচাপ বসে পোশাক বদলাতো মেসি। চাপা স্বভাব। মুখ ফুটে কথা যদি বলতোও, সেও মাপা, অতি সামান্য। মিশতও না কারও সঙ্গে।

ছবি: বার্সা টিভি
ফিরে আসি ট্রায়ালের সেই সপ্তাহে। ট্রায়াল শেষে চটজলদি স্থায়ী চুক্তিতে বদলে যায় মেসি ও লা মাসিয়ার কাগজ। যদিও বার্সেলোনায় শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কাগজপত্রের জটিলতায় টানা পাঁচ মাস কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে পারেননি তিনি। শুধু অনুশীলন আর প্রীতি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছিল।

কাতালান ফুটবল ক্লাবের আইডি কার্ডে মেসির নাম- লিওনেল আন্দ্রেস মেসি; কার্ড রেজিস্ট্রেশন করা হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০২
অবশেষে ২০০১ সালের ৭ মার্চ কাতালান ক্লাব আম্পোস্তার বিপক্ষে বার্সেলোনা অনূর্ধ্ব-১৪ অভিষেক ঘটে তার (অনূর্ধ্ব-১৪ দলকে স্পেনে ক্যাটাগরি 'ইনফ্যান্তিল বি' হিসেবে ডাকা হয়।) সেই ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমেই গোল করেন মেসি।
যদিও লা লিগায় মেসির প্রথম গোল আসে আরো চার বছর পরে, ১ মে, ২০০৫ সালে। বিপক্ষ দল ছিল আলবাসেতে (দলটি বর্তমানে লা লিগা-২, অর্থাৎ স্পেনের ২য় স্তরে খেলছে।) মেসি ঐ ম্যাচে ৮৮ মিনিটে স্যামুয়েল ইতোর বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামেন, এবং তার ক্যারিয়ারের প্রথম অফিসিয়াল গোলটি করেন ৯১ মিনিটে।

আলবাসেতের বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
উল্লেখ্য, লিওনেল মেসির পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারে মোট অফিসিয়াল গোলসংখ্যা ৯১৭টি (১,১৫৯ ম্যাচে)। এবং এর সিংহভাগ গোল করেন এফসি বার্সেলোনার হয়ে—৭৭৮ ম্যাচ খেলে ৬৭২ গোল করা ক্ষুদে জাদুকর মেসির প্রথম এবং সেই অর্থে ঐতিহাসিক গোলটিতে অ্যাসিস্ট করেন ফুটবলের আরেক জাদুকর রোনালদিনিয়ো।

লিও মেসির প্রথম গোল, ১ মে ২০০৫
রোনালদিনিয়ো পরবর্তী বার্সেলোনার মহাতারকা হয়ে ওঠেন লিও মেসি। তবে ঘটনার ক্রমানুসারে, মেসির আগের দিনগুলোতে ফিরে যাই।
আম্পোস্তার বিপক্ষে বার্সেলোনা অনূর্ধ্ব-১৪ অভিষেকেই গোল করেন মেসি। কিন্তু সেই আনন্দও বেশিদিন টিকল না। পরের সপ্তাহে বয়সে বড় দলের হয়ে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে তার বাঁ পায়ের ফিবুলা হাড় ভেঙে গেল। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই এমন চোট যে কোনো ফুটবলারের জন্য ভয়াবহ ধাক্কা।
ভাসকেজের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর কিছুদিন মেসিকে বার্সেলোনায়ই দেখা যায়নি। ক্লাব তাকে আর্জেন্টিনায় পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেই মৌসুমটাই শেষ হয়ে যায় তার। তখন অনেকেই সন্দিহান ছিলেন মেসির ফিরে আসা নিয়ে। এত অল্প বয়সে এমন গুরুতর চোট তার ক্যারিয়ারে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনুমেয় ছিল। ছিল বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
বাইরের মানুষের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, সে বিশ্বের সেরা একাডেমিতে খেলছে, ক্লাব তার পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করেছে, ভালো শিক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম।
ইন্ট্রোভার্ট এক ১৩ বছরের কিশোর। বাবাকে নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে নতুন দেশে এসেছে। পরিচিত কেউ নেই, কাউকে চেনে না। খেলার অনুমতি নেই। অনুমতি যদিও পেল, পা গেল ভেঙে।
মেসিকে এরপর সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি, নতুন বন্ধু—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল তার মতো লাজুক কিশোরের জন্য এক কঠিন সংগ্রাম। ভাসকেজ বলেন, "এখন আমি নিজেও একজন বাবা। আমার ১২ বছরের ছেলে আছে। তাই বিলক্ষণ বুঝতে পারি তখন মেসির জন্য পরিস্থিতি কতটা প্রতিকূল ছিল। কোনকিছুই সহজ ছিল না তার জন্য।"
যদিও পরের মৌসুমে আবার মাঠে ফেরেন মেসি। তবে চোটের কারণে শুরুতে নিয়মিত একাদশে জায়গা পাননি। সেই সময়ই ভাসকেজ প্রথম বুঝতে পারেন, মেসি একটি বিশেষ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যরা যখন দ্রুত লম্বা হচ্ছিল, মেসি তখনও ছোটখাটো গড়নেরই থেকে যাচ্ছিলেন।

বার্সা টিভিতে দেয়া সাক্ষাৎকারে
তবে আশা জাগানিয়া বিষয় ছিল, বার্সেলোনা তার গ্রোথ হরমোনের চিকিৎসার পুরো খরচ বহন করতে রাজি হয় এবং করে। প্রতিদিন রাতে বাড়িতে তাকে হরমোনের ইনজেকশন দেওয়া হতো। বেশিরভাগ সময় হরমোনের ইনজেকশন দিতেন তার বাবা, বাকি সময় ক্লাবের চিকিৎসক। যদিও ভাসকেজ কখনও ইনজেকশন দেওয়ার দৃশ্য দেখেননি। তবে তিনি জানতেন, এই চিকিৎসা মোটেও সহজ ছিল না।
অনেক দিন ইনজেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাথা ঘুরত মেসির। অনুশীলন মিস করে ফেলতেন। শরীর খারাপ লাগত বলে স্কুলেও যেতে পারতেন না নিয়মিত। ভাসকেজের ভাষায়, "মানুষ হয়তো এসব জানেই না। কিন্তু মেসিকে যে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তা একটুও সহজ ছিল না।"
যাই হোক, ভাসকেজ এবং মেসির মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একই ক্লাসে পড়তেন। একই বাসে করে স্কুলে যেতেন দুইজন। তাদের সাথে যোগ দেয় আরেক সতীর্থ—রাফা ব্লাসকেস। মাঠের বাইরে তিনজন হয়ে ওঠে দুষ্টু ও মিষ্টি ট্রায়ো। যে ট্রায়োর কথা ভক্তরা জানেন না, কারণ সে ট্রায়ো মাঠের বিখ্যাত এমএসএন (মেসি-সুয়ারেস-নেইমার) ছিল না।
ভাসকেজ থাকতেন লা মাসিয়ার হোস্টেলে। আর মেসি থাকতেন পরিবারের সঙ্গে শহরের এক অ্যাপার্টমেন্টে। স্কুল বাসে যাতায়াতকালে পাশাপাশি বসে দুইজন গান শুনতেন হেডফোনের দুইপাশে। মেসি সারাক্ষণ আর্জেন্টিনার 'কুম্বিয়া' গান শুনতেন। আর ভাসকেজ তাকে শোনাতেন সেই সময়ের জনপ্রিয় স্প্যানিশ ব্যান্ড সংগীত। দুজন গানের সিডি অদলবদল করতেন। গল্প করতেন। হাসিঠাট্টায় মেতে উঠতেন।
আর পড়াশোনায় ডাব্বা মারতেন দুজনই। তাদের একজনও পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিলেন না। তাদের পুরো মনোযোগ ফুটবলে। স্কুল ছুটি হলেই দ্রুত বাসে উঠে কখন লা মাসিয়ার মাঠে ফিরবেন, সেই অপেক্ষায় থাকতেন। দুপুরের খাবার শেষে, বিকালের অনুশীলনের আগে অনেকটা সময় পাওয়া যেত।

সেই সময়কার লা মাসিয়া ভবন
শুরুর দিকে মেসি বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতেন। পরে বাসায় না ফিরে প্রায়ই লা মাসিয়ায় থেকে যেতেন। কখনও বন্ধুদের কক্ষে ঘুমাতেন, কখনও বিভিন্ন বয়সের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছোট করে ম্যাচ খেলতেন। ভাসকেজ বলেন, "লা মাসিয়ায় কাটানো সেই তিন বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর মাঝে একটি।"
যাই হোক, মেসির ফুটবল গল্পে ফিরি। ২০০৩-০৪ মৌসুমে যেন বিস্ফোরণ ঘটালেন মেসি।
চোট কাটিয়ে দুর্দান্ত ছন্দে ফিরলেন। জুনে তার বয়স হলো ১৬। ১৬ বছর বয়সেই তাকে অনূর্ধ্ব-১৮ দলে প্রমোট করা হলো। উল্লেখ্য, একাডেমি ফুটবলও স্কুলের মতো সিস্টেম্যাটিক। যেমন অতিরিক্ত ভালো ছাত্র ক্লাস টু থেকে স্যাররা মুগ্ধ হয়ে ফোরে বা ফাইভে তুলে দেন। পড়াশোনা শেষে গ্রাজুয়েট হয়, তেমনি ফুটবল একাডেমি অনূর্ধ্ব-১৯ শেষে সেই ফুটবলার গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
মেসিও অনূর্ধ্ব-১৮ দলের হয়ে মাত্র তিন ম্যাচ খেলেই আবার প্রমোশন পেয়ে হলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। সেখানেও একই দৃশ্য। মেসি যেন মায়ের পেট থেকে ফুটবল শিখে এসেছেন। ফলে সপ্তাহ কয়েক যেতে না যেতেই সিনিয়র ফুটবল দলে ডাক পেলেন।

ছবি: বার্সা টিভি
প্রথমে বার্সা সি। যে দলটি তখন স্পেনের চতুর্থ স্তরে খেলছে। স্তরটির নাম ছিল, 'টারসেরা ডিভিসিওন'; (বর্তমান নাম, 'সেগুন্দা ডিভিসিওন আরএফইএফ')। সেখানেও সহজেই গোল করতে থাকলেন। প্রতিপক্ষ? বয়সী যত ফিজিক্যালি শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়।
চতুর্থ স্তরের লিগে স্বভাবতই যা হয়, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা বারবার তাকে বাজে ট্যাকল করতে থাকে। এতে ক্লাব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। একে তো মেসি ততদিনে নিজের মূল্য প্রমাণ করে ফেলেছে বার্সার কাছে। বার্সাও তার গুরুত্ব সম্পর্কে কানায় কানায় টের পেয়ে গেছে।
যেমন, যারা জানেন, লামিন ইয়ামালকে স্পেন ছেড়ে মরক্কো দলে না যাবার জন্য যে সব সুবিধা অফার করে লামিনকে স্পেনে রেখে দেয়া হয়—তারা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারবেন, মেসির ক্ষেত্রে তাহলে বার্সা কতটা সতর্ক ছিল! ফলে, মাত্র পাঁচ ম্যাচ পরই মেসিকে প্রমোট করা হয় বার্সা বি দলে। এক স্তর উপরে খেলছিল দলটি। তৃতীয় স্তরটির নাম ছিল, 'সেগুন্দা ডিভিসিওন বি'; (বর্তমান নাম, 'প্রিমেরা ডিভিসিওন আরএফইএফ')। সেখানে তুলনামূলক ট্যাকটিক্যাল, প্রফেশনাল ও কম শারীরিক ফুটবল খেলা হতো।

নভেম্বর ২০০৩, পোর্তোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বার্সেলোনার মূল দলে ডাক পান মেসি, অভিষেক হয় বার্সা মূল দলে
বার্সা বি (বার্সা অ্যাতলেটিক) থেকেই ২০০৩ সালের নভেম্বরে, পোর্তোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বার্সেলোনার মূল দলে ডাক পান, অভিষেক হয় তার।
সেই এক মৌসুমেই মেসি বার্সেলোনা ক্লাবের পাঁচটি ভিন্ন দলে (একাডেমির অনূর্ধ্ব ১৮ ও ১৯; বার্সা সি ও বি; এবং বার্সেলোনা মূল দল) খেলেছিলেন—যা প্রকৃতপক্ষে আজও ফুটবলে বিরল ঘটনা। যে ঘটনা মেসিভক্ত অনেকের কাছেই অখ্যাত-অজানা।
ভাসকেজ ও তার সতীর্থদের তখনই পূর্ণ বিশ্বাস ছিল, একবার লা লিগায় দলের হয়ে সুযোগ পেলে মেসিকে আর কেউ থামাতে পারবে না। কিন্তু বলা যতটা সহজ ছিল, অদম্য গল্পের শুরুটা ছিল ততটাই কঠিন, সমস্যা-জর্জরিত, হতাশাজনক।
বার্সেলোনা মূল দলে জায়গা পাবার পর তিনি ঘন ঘন পেশির চোটে ভুগতেন। তাই ক্লাবের চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা অনেক হিসাব নিকাশ করে কড়া নিয়ম জারি করে খাদ্যতালিকা তৈরি করেন মেসির জন্য। মেসির প্রিয় সফট ড্রিংকসগুলো একেবারেই নিষিদ্ধ করা হলো।
ভাসকেজের কাছে ব্যক্তি মেসির সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—বিনয়। বিশ্বসেরা হওয়ার পথে বা পরেও তিনি পুরনো বন্ধুদের কখনোই ভুলে যাননি। প্রথম দলে খেললেও সুযোগ পেলেই পুরনো বন্ধুদের ম্যাচ দেখতে চলে যেতেন। কখনও গ্যালারিতে বসে, কখনও কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের উৎসাহ দিতেন। ম্যাচ শেষে সবাই মিলে হাঁটতে যেতেন বার্সেলোনার এল'ইয়া দিয়াগোনাল শপিং সেন্টারে। আবার কখনও কাছের পেদ্রালবেসে। যেখানে সবাই বোলিং খেলতেন। পরে পেপ গার্দিওলার অধীনে ভাসকেজও বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা পান, খেলেন। ২০১১ সালে জেতেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।
ভাসকেজ এরপর স্পেন ছেড়ে ভিনদেশে গড়েন নিজ ক্যারিয়ার। মজার ব্যাপার হলো, ২০২৩ সালে টরন্টো এফসির হয়ে খেলতে গিয়ে তিনি মুখোমুখি হন শৈশবের বন্ধু মেসির। যেহেতু মেসি তখন ইন্টার মায়ামিতে। টরন্টো ৪-০ গোলে হেরে যায়। কিন্তু ভাসকেজের কাছে সেটি ছিল আবেগের এক সন্ধ্যা। মাঠে পাশাপাশি হাঁটার সময় তারা সেই ছোটবেলার স্বপ্নবাজ কিশোরদের দেখতে পাচ্ছিলেন একজন আরেকজনের চোখে।

ভিক্টর ভাসকেজ
তার ইচ্ছা ছিল, ক্যারিয়ারের শেষটা মেসির সঙ্গেই ইন্টার মায়ামিতে কাটাবেন। এমন অনুরোধ নিজের এজেন্টকেও করেছিলেন। কিন্তু ভাসকেজের শরীর আর সায় দেয়নি। ফলে সেই স্বপ্নও আর পূরণ হয়নি। এ নিয়ে ভাসকেজের অবশ্য আফসোস নেই।
কারণ, লা মাসিয়ার দুই কিশোর যে স্বপ্ন একদিন একসঙ্গে দেখেছিল—তার প্রায় সবই বাস্তব রূপ পেয়েছিল শেষ পর্যন্ত।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।