বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬
মহানাটকের পর মদ্রিচের বিদায়, টিকে রইলেন রোনালদো
রাউন্ড অব সিক্সটিনের মহানাটকীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল, শেষ ১৬-তে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন।

ফুটবল খেলার নাটকীয়তা, থ্রিলার আর সাসপেন্স কখনো কখনো সত্যিকার জীবনের নাটকীয়তাকেও হার মানায়। সিনেমার চিত্রনাট্যে থ্রিলার, সাসপেন্স, অতিনাটকীয়তা থাকে, কিন্তু টরন্টোতে বিশ্বকাপ ফুটবলের রাউন্ড অব থার্টি টুর পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে যা যা হলো, এই থ্রিলার চিত্রনাট্য ঈশ্বর ছাড়া কারো পক্ষে লেখা সম্ভব না। দুই গ্রেটের মধ্যে ঈশ্বর কার পক্ষ নেবেন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নাকি লুকা মদ্রিচ, তা নিয়ে হয়ত দ্বিধান্বিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পেন্ডুলামে দুলতে দুলতে ভাগ্যের চাকাটা রোনালদোর নিবেদনের প্রতি হেলিয়ে দিয়েছেন। তাতে ১১৩ মিনিট সমানতালে দৌড়ে, মিডফিল্ড মাস্টারক্লাস দেখিয়ে ভিতিনিয়া-জোয়াও নেভেসদেরকে ম্লান করে দেওয়া প্রায় ৪২ বছর বয়সী মদ্রিদকে কাঁদতে হয়েছে বিদায়ের কান্না।

রোনালদোর হাসির রাতে মদ্রিচের বিদায়ের কান্না
পর্তুগাল এগিয়ে ২-১ গোলে, যোগ করা সময় ১০ মিনিট পেরিয়ে প্রায় আড়াই মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে, রেফারির শেষ বাঁশি বাজবে বাজবে, এমন সময় ৯০ মিনিটে বদলি নামা ডিফেন্ডার ইয়োস্কো গভারদিওলের গোল, ক্রোয়েশিয়া দলের বাধভাঙা উল্লাস। এই উৎসবের ভিড়েই ভিএআর কল মাঠের রেফারিকে, রেফারি পিচসাইড মনিটরে ফুটেজ দেখে অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিলেন। সেমি অটোমেটেড ক্যামেরাতেও দেখা গেলো গভারদিওলের কাছে হেডারে বল পাঠানো খেলোয়াড়টি অফসাইডে ছিলেন।
কিছুক্ষণ আগেই অবিশ্বাস আর হতাশায় মাথা নাড়াতে থাকা সিআর সেভেন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন। আর হতাশাগ্রস্ত মদ্রিচের চোখে পানি। ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে দীর্ঘ পথচলা এখানেই যে শেষ হয়ে গেলো! অবশ্য ভাগ্যকেও দোষ দিতে পারেন মদ্রিচ, দ্বিতীয়ার্ধে অফসাইডে ক্রোয়েশিয়ার তিনটি গোল বাতিল হয়েছে!
এমন নাটকীয় ম্যাচ হবে, প্রথমার্ধে এর কোনো ধারণাই পাওয়া যায়নি। দুই দলই খেলেছে অতিসাবধানী ভঙ্গিতে। পর্তুগাল ৬৯% বল দখলে রেখে গোলের জন্য ৯টি শট নিয়েছে, এর মধ্যে মাত্র একটি অন টার্গেট শট!
রোনালদোকো লোন স্ট্রাইকার হিসাবে খেলিয়ে কোনো ফায়দা হয়নি। যেসব পাস আর ক্রস তিনি রিসিভ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তা তাঁর মানের খেলোয়াড়ের সাথে যায় না। দোষ রোনালদোর না, দোষটা তাঁর ৪১ বছর বয়সের। গতি আর আগের মতো নেই। যে কারণে মাঠে পর্তুগাল দলের পুরো সিস্টেম ধীরগতিতে চালিত হচ্ছে, এর সুবিধা নিচ্ছে প্রতিপক্ষ।
প্রথমার্ধে ক্রোয়েশিয়াকে মাঠে তেমন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। মাত্র ৩১% বল পজেশন, গোলে শট তিনটি যার একটিও অনটার্গেট নয়!
এই দলটিই দ্বিতীয়ার্ধে ভিন্ন চেহারায় দেখা দেয়। একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে, মদ্রিচ-কোভাচিচ জুটি মাঝমাঠ দখলে নেয়। তার পুরস্কার আসে ৫৩ মিনিটে, ইভান পেরিসিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া।
কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় রোনালদোর জাদুকরি ঝলক। দারুণ দক্ষতায় ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক লিভাকোভিচকে পরাস্ত করলেও তাঁর কাঁধ অফসাইডের ফাঁদে পড়ে যায়।

রোনালদো দারুণ এক গোল দিলেও অফসাইডে বাতিল হয় তা
হাইড্রেশন ব্রেকের ঠিক আগে আগে কর্নার পায় পর্তুগাল। ডি বক্সের ভেতরে রেনাতো ভেইগাকে পেছন থেকে ঝাঁপটে ধরে ফেলে দেন ক্রোট ডিফেন্ডার। ভিএআর চেকের পর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। স্পট কিক থেকে লিভাকোভিচকে বোকা বানান রোনালদো। ম্যাচের তখন ৬৮ মিনিট। পুরো দল তাঁকে ঘিরে উল্লাসে মেতে ওঠে, রোনালদোর কাঁধ থেকেও যেন পাহাড়সম চাপ নেমে যায়।
৪১ বছর বয়সে, নিজের ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে নকআউট ম্যাচে প্রথম গোল পেলেন রোনালদো, তাও বাঁচা-মরার অবস্থায়! এই গোলটি নিশ্চয়ই তাঁর কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে।
সমতা ফেরার পর ক্রোয়েশিয়া আরও বেশি আক্রমাণাত্মক হয়ে ওঠে। গোলরক্ষক দিয়েগো কস্তার দারুণ তিনটি সেইভ পর্তুগালকে ম্যাচে রাখে। মাতেও কোভাচিচের শট বারে লেগে ফিরে এলে ফিরতি শট সেভ করে গোল বাঁচান কস্তা।
রোনালদোকে ৮১ মিনিটে উঠিয়ে মিডফিল্ডার রুবেন নেভেসকে নামান কোচ রবার্তো মার্তিনেস। এতে পর্তুগালের খেলায় গতি বাড়ে। বিশেষ করে লেফট উইঙ্গার রাফায়েল লেয়াওয়ের খেলার ধরন পাল্টে যায়। লেয়াওয়ের মধুর একটা ক্রস থেকে যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে মাথা ছুইঁয়ে পর্তুগালকে ২-১ গোলে এগিয়ে দেন বদলি স্ট্রাইকার গনসালো রামোস। রোনালদোসহ পুরো পর্তুগাল দল রামোসকে ঘিরে উল্লাসে মেতে ওঠে।

গোলে রামোসের হেডার ও গোলের পর রোনালদোর আলিঙ্গন
তারপরেও হাল ছাড়েনি ক্রোটরা। শেষ পর্যন্ত লড়ে ম্যাচটা প্রায় অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু ১১৩ মিনিটে হওয়া অতিনাটকীয় সেই গোল বাতিল হয়ে যায় অফসাইডে, আর রোনালদোর বিশ্বকাপে টিকে থাকার স্বস্তির নিঃশ্বাসের পাশে চোখের জলে বিদায় নেন লুকা মদ্রিচ নামের এক ফুটবল মহানায়ক।
এই ম্যাচ আবারো সমালোচকদের ঠিক প্রমাণ করলো। যদিও রোনালদো ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেছেন, কিন্তু তাঁকে ছাড়াই পর্তুগালকে বেশি বিপদজনক মনে হয়েছে। গনসালো রামোস বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা ভুল হচ্ছে। এই বিশ্বকাপে পর্তুগালকে কিছু করতে হলে রোনালদোর খেলার সময় কমিয়ে রামোসকে যতটা সম্ভব বেশি খেলাতে হবে।
দেখা যাক, রাউন্ড অব সিক্সটিনে স্পেনের বিপক্ষে কোচ রবার্তো মার্তিনেস কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনেন কি না!

রুহুল মাহফুজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।