মেসি ও বালোগুনের জন্য আলাদা নিয়ম?
মেসি ও বালোগুনের জন্য আলাদা নিয়ম? বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তে লাল কার্ড দেখলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার।

মেসি ও বালোগুনের জন্য আলাদা নিয়ম?
○ মেসির জন্য এক নিয়ম, বালোগুনের জন্য আরেক?
○ বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তে লাল কার্ড দেখলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার।
বিস্তারিত: বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের ম্যাচে গোল করলেও ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠেন ফোলারিন বালোগুন। ভিএআর পর্যালোচনার পর বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে লাল কার্ড দেখানো হয় মার্কিন এই স্ট্রাইকারকে।
প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে দেওয়া বালোগুন দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে লাল কার্ড দেখার পর স্পষ্টতই বিস্মিত হয়ে পড়েন।
বল দখলের লড়াইয়ে বসনিয়ার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে দুজনের পা জড়িয়ে যায়। সুপার স্লো-মোশন রিপ্লেতে দেখা যায়, বালোগুনের পা প্রতিপক্ষের কাফের ওপর দিয়ে ঘষে নেমে যায়।
ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস প্রথমে ঘটনাটিকে ফাউল বলেও মনে করেননি। তবে দুজন খেলোয়াড়ই চোট পেয়ে খেলা থেমে গেলে ভিএআর কর্মকর্তারা তাঁকে মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি দেখতে বলেন। রিপ্লে দেখার পর ক্লাউস সরাসরি লাল কার্ড দেখান বালোগুনকে।
ঘটনার পরপরই সমর্থক ও বিশ্লেষকদের অনেকেই আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসির একটি চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা টানেন। সেই ম্যাচে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক কোনো ধরনের কার্ডই দেখেননি।
বিবিসির ধারাভাষ্যে সাবেক ইংল্যান্ড নারী দলের স্ট্রাইকার সু স্মিথ বলেন, ‘রিপ্লেটা যখন ওইভাবে থেমে থেমে দেখানো হয়, তখন এটা শতভাগ লাল কার্ড মনে হয়। কিন্তু বাস্তব গতিতে দেখলে সিদ্ধান্তটা আমার কাছে খুবই কঠোর বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বালোগুন শুধু বলটা আড়াল করে নিজের শরীর দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করছিলেন। তিনি কেবল নিজের পা মাটিতে রাখছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি প্রতিপক্ষের পায়ে গিয়ে পড়েছে।"
এই লাল কার্ডের পর শেষ ২৫ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। তবে ম্যাচ শেষ হতে আট মিনিট বাকি থাকতে মালিক টিলম্যানের দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক গোল যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে।
গুরুতর ফাউলের কারণে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বালোগুন এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ-১৬ পর্বে ম্যাচে তাঁকে পাওয়া যাবে না। শৃঙ্খলা কমিটি চাইলে শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়াতে পারে। তবে ফিফার শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই।
○ অন্যদিকে, মেসির করা ফাউলের প্রেক্ষিতে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক তোপ দেগেছেন, মেসি কি তবে ‘বিশেষ সুবিধা’ পাচ্ছেন?
মেসির ঘটনার পরপরই বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ইএসপিএন এফসির বিশ্লেষক আলে মোরেনো ও নেদুম ওনুওহা—দুজনেই মেসিকে কোনো কার্ড না দেখানোয় বিস্ময় প্রকাশ করেন।
মোরেনো বিশেষভাবে সমালোচনামুখর ছিলেন। তাঁর মতে, এই ঘটনা ফুটবলে দীর্ঘদিনের একটি ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
সাবেক এমএলএস তারকা বলেন, "এটা শতভাগ লাল কার্ড হওয়া উচিত ছিল। লিওনেল মেসিকে লাল কার্ড দেখানো উচিত ছিল। এই ঘটনাটি সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকেই জোরালো করে যে, বড় তারকারা বিশেষ সুবিধা পান।"
তিনি আরও বলেন, "মেসি যখন হ্যাটট্রিকের কাছাকাছি ছিলেন এবং গোলরক্ষক লুকা জিদান দারুণ একটি সেভ করলেন, তখন ক্যামেরায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে হাসতে দেখা যায়। যেন তিনি বলছিলেন, 'আহা, অল্পের জন্য হলো না!' এসবই সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে যে, মেসির সঙ্গে অন্যদের তুলনায় ভিন্নভাবে আচরণ করা হয়।"
মোরেনোর সঙ্গে একমত পোষণ করেন সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার নেদুম ওনুওহা। তাঁর মতে, ধারাভাষ্যকারেরাও ফাউলটির গুরুত্ব যথাযথভাবে তুলে ধরেননি।
ওনুওহা বলেন, "ধারাভাষ্যে তো তারা বলেইনি যে কোনো ঘটনা ঘটেছে। আমরা রিপ্লে দেখে বলছিলাম, 'এটা তো বেশ খারাপ ট্যাকল।' অথচ ধারাভাষ্যে বলা হচ্ছিল, 'মেসিকে প্রেসিং করতে দেখে ভালো লাগছে।'"
○ রেফারি ও ভিএআরের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি সিমন মারচিনিয়াক ও ভিএআরের সিদ্ধান্ত নিয়ে। অনেকের ক্ষোভ, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি দেখার নির্দেশ দেওয়া হলো না।
মোরেনো বলেন, "স্থিরচিত্র দেখারও দরকার নেই। সরাসরি গতির ভিডিও দেখলেও প্রথমে এটি খারাপ ট্যাকলই মনে হয়েছে। রিপ্লে দেখার পর তো বিষয়টি আরও স্পষ্ট। এমন একটি ঘটনায় অবশ্যই কারও নজর দেওয়া উচিত ছিল। রেফারি সিমন মারচিনিয়াককে কেন মনিটরের সামনে ডাকা হলো না?"
তিনি আরও যোগ করেন, "লিওনেল মেসিকে লাল কার্ড দেখানো উচিত ছিল। আমি মেসিকে যতই পছন্দ করি না কেন, এটি ছিল একটি বেখাপ্পা ও বিপজ্জনক ট্যাকল। তিনি প্রতিপক্ষের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পায়ের পেছনের অংশে স্টাড ঘষে দিয়েছেন। এমন ট্যাকলের শাস্তি লাল কার্ডই হওয়া উচিত।"
ওনুওহাও একই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "আমার মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হাতছাড়া হয়েছে। খেলোয়াড়টি যখন মাঠে পড়ে ছিল, তখন মেসির মধ্যেও কিছুটা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছিল। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এমন কিছু করে ফেলেছেন যার জন্য তিনি বিপদে পড়তে পারেন। রেফারি ঘটনাটি মিস করতে পারেন, সেটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু ভিএআর এত কিছু দেখেও যদি বলে, 'না, সব ঠিক আছে, এখানে আর কিছু নেই,' তাহলে সেটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এটি লাল কার্ড পাওয়ার মতোই একটি অপরাধ ছিল।"
উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করার পাশাপাশি লাল কার্ড দেখা ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ ফুটবলার হলেন বালোগুন। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন ব্রাজিলের গ্যারিঞ্চা (১৯৬২ সেমিফাইনাল), রোনালদিনিয়ো (২০০২ কোয়ার্টার ফাইনাল) এবং জিনেদিন জিদান, যিনি ২০০৬ সালের ফাইনালে বিখ্যাত হেডবাটের ঘটনার জন্য লাল কার্ড দেখেছিলেন।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।