বিশ্বকাপে ইরান ‘বিপর্যয়ের’ আড়ালের গল্প
বিশ্বকাপে ইরান ‘বিপর্যয়ের’ আড়ালের গল্প : ইনফান্তিনোর ‘প্রস্তাব’ আর তিজুয়ানায় এক টুকরো ঘরের ঠিকানা

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেলে মিসরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার পর, ইরানি ফুটবলার মেহদি তারেমি এবং তাঁর সতীর্থরা মাঠে উপস্থিত দর্শকদের হাততালি দিয়ে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অতীতে স্বাগতিক দেশগুলোর ওপর ফিফার প্রভাব নিয়ে জোর গলায় কথা বলেছেন। কিন্তু এই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে এক পর্যায়ে তাঁর ভূমিকাটি যেন রাজদরবারের বিদূষকের মতোই অসহায় হয়ে পড়েছিল।
ইংলউডের সোফাই স্টেডিয়াম-এ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করা উদ্বোধনী ম্যাচের পর ইনফান্তিনো ইরানের ড্রেসিংরুমে যান। নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তিনি খেলোয়াড়দের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি তাদের কথাই ভাবছেন।
ইনফান্তিনো বলেন, “আপনারা পুরো বিশ্বের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠিয়েছেন। এখানে পুরো স্টেডিয়ামকে ‘টিম মেল্লি’র পক্ষে একত্রিত করেছেন। বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন আপনারা কী করতে সক্ষম। এজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদের।”
ইরানের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের করতালি থামার অপেক্ষা করে তিনি হাস্যরস করার চেষ্টা করেন। প্রধান কোচ আমির গালেনোয়ি-এর কাঁধে হাত রেখে বলেন, “আর যদি কোচের একজন স্ট্রাইকারের দরকার হয়, তাহলে পরের ম্যাচে আমি এসে আপনাদের হয়ে খেলব।”
কিন্তু তখন বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। লেফট উইঙ্গার মেহদি তোরাবি একবার ব্যবহারযোগ্য ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, তাই তাঁর জন্য নতুন ভিসার ব্যবস্থা করতে হচ্ছিল। অন্যদিকে দলের অধিনায়ক ও স্ট্রাইকার মেহদি তারেমি মেক্সিকোর তিজুয়ানায় দলের অনুশীলন ঘাঁটিতে ফেরার পথে লস অ্যাঞ্জেলেস সীমান্তে মার্কিন কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। সেই প্রেক্ষাপটে ইনফান্তিনোর রসিকতা অনেকের কাছেই খুব বেমানান ও বেখাপ্পা বলে মনে হয়।
এরপরও ইনফান্তিনো বলেন, “এটা তো বিশ্বকাপের শুরু মাত্র। আপনারা ইতিহাস লিখছেন। নিজেদের মানুষের জন্য এবং পৃথিবীর সেই সব মানুষের জন্য, যারা ইরানকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন—তাঁদের জন্য হৃদয় উজার করে খেলতে থাকুন। এগিয়ে যান, আপনারা যে কোনো বাধার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আবেগঘন ভাষণের পরও ইরানের পরিস্থিতি বদলাতে ইনফান্তিনো কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি।
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা না পাওয়া ইরানের ১৫ সদস্যের স্টাফের মধ্যে চারজন পররাষ্ট্র দপ্তরে আপিল করে শেষ পর্যন্ত অনুমতি পান। ফলে সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচের আগে ইরান দল প্রথমবারের মতো দুই দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এর আগে লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথম দুই ম্যাচের ক্ষেত্রে ম্যাচের আগের দিন ছাড়া তাদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না।
তবুও সমস্যা শেষ হয়নি। এরপরও মার্কিন কর্তৃপক্ষ তিজুয়ানা বিমানবন্দরে তারেমিকে আটকে রাখে। তাঁর সঙ্গে সহকারী কোচ সাঈদ আলহোয়িকেও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দলের যাত্রা বিলম্বিত হয়।
এরপরও ইরান টানা তৃতীয় ম্যাচের মতো শেষ বাঁশি বাজার পরপরই দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য হয়।
এই পরিস্থিতির পর মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় ১-১ গোলে ড্রয়ের পর সাংবাদিকদের সামনে আবেগঘন বক্তব্য দেন তারেমি। সেই ড্রয়ের ফলে শেষ ৩২-এ ওঠার সম্ভাবনা ঝুলে যায় অনিশ্চয়তার মধ্যে।

সিয়াটেলে মিসরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার পর ইরানি স্ট্রাইকার ও দলের অধিনায়ক মেহদি তারেমি ফিফা (FIFA) এবং এর সভাপতি ইনফান্তিনোর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন
তারেমি বলেন, “এই বিশ্বকাপ একেবারেই ডিজাস্টার। নিউজিল্যান্ড ম্যাচের পর মি. ইনফান্তিনো আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে বলেছিলেন, ‘এটা তো মাত্র শুরু...,’ অথচ আগামীকালই গ্রুপ পর্ব শেষ হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের শারীরিক রিকভারি বা লজিস্টিকস সামলানোর পর্যাপ্ত লোকই নেই। আমরা সব সময় এসব নিয়ে অভিযোগ করি। কিন্তু কেউ সাহায্য করে না। এটা অন্যায়। ফিফার কাছে কি এটা ন্যায্য? যদি তাদের কাছে সব ঠিকই মনে হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু আমাদের সাহায্য করবে কে? যদি তারা চায় আমরা বিদায় নিই, তাহলে ঠিক আছে—আমরা বিদায়ই নেব।”
প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর, আরও অবিশ্বাস্য এক নাটকীয়তায় তারেমির সেই কথাই সত্যি হয়ে যায়।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আলজেরিয়ার অবিশ্বাস্য ৩-৩ গোলের ড্র—যার আগে ডিআর কঙ্গো উজবেকিস্তানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় পেয়ে—ইরানের বিদায় নিশ্চিত করে।
তিজুয়ানার ম্যারিয়ট হোটেলে থাকা ইরানি খেলোয়াড়দের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, তাঁরা রিয়াদ মাহরেজ-এর যোগ করা সময়ের ৯৩তম মিনিটের গোল উদ্যাপন করছেন। সেই গোল হলে ইরান শেষ ৩২-এ উঠে যেত। কিন্তু মাত্র তিন মিনিট পর সাশা কালাইজডজিচ অস্ট্রিয়ার হয়ে সমতা ফেরান, আর তাতেই নিভে যায় ইরানের সব আশা।
এভাবেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ব্যতিক্রম এক অধ্যায় শেষ হয়—যেন এর সমাপ্তিটা ঠিক এরকমই হওয়ার কথা ছিল।
এই পুরো টুর্নামেন্টে ইরানের পথচলা ছিল জটিলতায়, অনিশ্চয়তায় আর বিতর্কে ভরপুর। দলটির পক্ষে যেমন আবেগঘন সমর্থন দেখা গেছে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে। এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরো আসরের ওপর বড় ছায়া ফেলেছিল।
বিভিন্ন শহরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিত ইরানের বিপক্ষে অব্যবস্থাপনা ও বিশ্বকাপ অভিযানের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ফিফা এবং ইরান ফুটবল ফেডারেশন-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করে কিছু সংবাদমাধ্যম।
সংঘাত যেন ইরানের এই বিশ্বকাপ যাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল শুরু থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান একসময় ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকেই অনিশ্চিত করে তুলেছিল। মূল পর্ব শুরুর ঠিক আগে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধান বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টাকসন থেকে নিজেদের অনুশীলন ঘাঁটি সরিয়ে ইরান চলে যায় মেক্সিকোর তিজুয়ানায়।
কিন্তু এরপরও, যেমন যুদ্ধবিরতির পর আবার পাল্টা হামলা হয়েছে, তেমনি এই বিশ্বকাপে ইরানের উপস্থিতিও যেন সেই রাজনৈতিক সংঘাতেরই সমান্তরাল এক গল্প হয়ে উঠেছিল। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বার্তার এক নীরব লড়াই চলতে থাকে, যা অনেকটা স্নায়ু যুদ্ধের মতোই।
বিশ্বকাপের আগে ৬ জুন পর্যন্তও ইরানের খেলোয়াড় ও স্টাফদের ভিসা দেওয়া হয়নি। পরে ভিসা ইস্যু হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা দ্রুত জানিয়ে দেন, “এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করে যেন কেউ সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকিয়ে দিতে না পারে, তা আমরা নিশ্চিত করব।”
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভিসা না পাওয়া ১৪ কর্মকর্তার মধ্যে ছিলেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের মহাসচিব হেদায়াত মোমবেনি এবং সহসভাপতি মেহদি মোহাম্মদ নবি।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানায়, গত পাঁচটি বিশ্বকাপেই কোনো সমস্যা ছাড়াই দলের সঙ্গে থাকা একজন স্টাফ এবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। ফলে ম্যাচগুলো না দেখে তাঁকে তিজুয়ানাতেই থেকে যেতে হয়।
তবে দলের কিছু খেলোয়াড় তারেমির সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত স্টাফদের ভিসা না পাওয়া মাঠের খেলায় বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি।
যাঁরা ভিসা পেয়েছিলেন, তাঁদেরও ম্যাচের আগের দিন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি ছিল না। এ কারণে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের আগে গুঞ্জন উঠেছিল, ইরান হয়তো প্রাক্-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনই করবে না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধান কোচ আমির গালেনোয়ি এবং সাবেক এফসি পোর্তো ও ইন্টার মিলান ফরোয়ার্ড তারেমি সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজেদের গভীর হতাশার কথা প্রকাশ করেন।

লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথম ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রধান কোচ আমির গ্যালেনোই
তিনটি বিশ্বকাপ খেলা অভিজ্ঞ তারেমি বলেন, “আমি চাপ অনুভব করছি। আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো শান্তি, আনন্দ আর উৎসবের সেই সুন্দর অভিজ্ঞতা এবার আমরা পাচ্ছি না।”
কথাগুলো পরে যেন ভবিষ্যদ্বাণীই হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, “ভ্রমণসংক্রান্ত এত সমস্যার মধ্যেও আশা করি বিশ্বকাপ ভালোভাবে শেষ করতে পারব। আশা করি এইসব বিষয় আমাদের খেলার মানে প্রভাব ফেলবে না।”
বাস্তবে অবশ্য প্রভাব তখনই পড়তে শুরু করেছিল।
ইরানের অন্যতম সেরা ফুটবলার সর্দার আজমাউন, যিনি ৯১ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৫৭ গোল করেছেন, তাঁকে বিশ্বকাপ দলেই রাখা হয়নি। কারণ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন এক পোস্ট করেছিলেন যা ইরান সরকারের বিরুদ্ধে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।

সরদার আজমাউন (২০) ইরানের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না
গালেনোয়ি বলেন, তিনি মন থেকে চেয়েছিলেন, আজমাউন দলে থাকুক। বিভিন্ন সোর্সের দাবি, আজমুন নিজেও বিশ্বকাপে খেলতে আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁকে জানানো হয়, দলে ফিরতে হলে আগে প্রকাশ্যে ইরানি সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
তবে তিনি সেই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানান।
আরো পড়ুন:
'আমাদের তাড়াতে চাইছে' : ইরান অধিনায়ক https://www.khelardesh.com/article/-1782564244429
ইসমাইল সাইবারির রূপকথা https://www.khelardesh.com/article/--1782886010272
সর্বকালের সেরা ১৫ বিশ্বকাপ ফুটবলার—র্যাঙ্কিং https://www.khelardesh.com/article/-1782643738292
ইংলিশ ক্লাবের হয়ে খেলা প্রথম বাংলাদেশি ফুটবলার https://www.khelardesh.com/article/-1782535736794
একুয়েডরের কালোদের গল্প: দাসজাহাজের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বকাপে https://www.khelardesh.com/article/-1782546049055

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।