খেলারদেশ

সর্বকালের সেরা ১৫ বিশ্বকাপ ফুটবলার—র‍্যাঙ্কিং ২০২৬

সর্বকালের সেরা ১৫ বিশ্বকাপ ফুটবলার নির্বাচনে র‍্যাংকিং মানদণ্ড : • ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স • পরিসংখ্যানগত অর্জন • দলীয় সাফল্য • দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার (Legacy)

সর্বকালের সেরা ১৫ বিশ্বকাপ ফুটবলার—র‍্যাঙ্কিং ২০২৬

গ্যারিঞ্চা ও পেলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম।

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

ফিফা বিশ্বকাপ—ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এখানে নিজেকে প্রমাণ করার চাপও অন্য যেকোনো প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠিত সুপারস্টারদের কাঁধে থাকে কোটি সমর্থকের প্রত্যাশার ভার। আর উদীয়মান তারকাদের সামনে থাকে নিজেদের মেলে ধরার পাশাপাশি পুরো একটি জাতিকে অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব।

বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের চোখ যখন একই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন বলে খেলোয়াড়ের প্রত্যেকটা পা ছোঁয়ানো, প্রত্যেকটা পাস ও শট হয়ে ওঠে বিশাল আলোচনার বিষয়। গৌরব আর হতাশার মাঝখানের ব্যবধান এত সরু হয়ে যায়, আর সমর্থকদের প্রত্যাশাও অনেক সময় পৌঁছে যায় অসহনীয় পর্যায়ে।

কিন্তু ঠিক এই কঠিন পরিস্থিতিগুলোই ভালো খেলোয়াড় আর কিংবদন্তিদের মধ্যে পার্থক্য গড়ে ওঠে। বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি—অসাধারণ গোল, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স কিংবা পুরো একটি দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার নেতৃত্বের মাধ্যমে।

তবে ইতিহাসে খুব অল্পসংখ্যক খেলোয়াড়ই বারবার এই বিশাল চাপের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরতে পেরেছেন এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেখে গেছেন অমোচনীয় ছাপ।

সর্বকালের সেরা ১৫ বিশ্বকাপ ফুটবলার নির্বাচনে র‍্যাঙ্কিংয়ের মানদণ্ড :

• ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স • পরিসংখ্যানগত অর্জন • দলীয় সাফল্য • দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার (Legacy)

২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী কিলিয়ান এমবাপ্পে

২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী কিলিয়ান এমবাপ্পে

১৫. কিলিয়ান এমবাপ্পে

লেখাটি প্রকাশের সময় কিলিয়ান এমবাপ্পের বয়স মাত্র ২৭। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি বিশ্বকাপের কিংবদন্তিদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন।

২০১৮ সালে কিশোর বয়সেই তিনি বিশ্বকাপ মাতিয়ে দেন। পুরো আসরে করেন চার গোল, যার মধ্যে ছিল ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দৃষ্টিনন্দন একটি গোল। সেই জয়ে ফ্রান্স ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।

চার বছর পর, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও ফ্রান্সের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা ছিলেন এমবাপ্পে। পুরো টুর্নামেন্টে করেন আট গোল। ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় ফরাসিদের।

২০২৬ বিশ্বকাপের আগে এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের অন্যতম। এছাড়া বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বাধিক গোল করার রেকর্ডও তার দখলে। ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগেই এই রেকর্ডগুলো আরও সমৃদ্ধ করার সম্ভাবনাই বেশি।

Image

১৪. পাওলো রসি

১৯৮২ সালই পাওলো রসিকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল।

নিজ দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ইতালির শিরোপা জয়ের প্রধান নায়ক ছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে করেন ছয় গোল, যার মধ্যে ছিল পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালের প্রথম গোলটিও।

অসাধারণ পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে একই বিশ্বকাপে তিনি জেতেন গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং বিশ্বকাপ—ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এমন অর্জন করতে পেরেছেন।

সেই অবিশ্বাস্য বছরটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলতে তিনি জিতে নেন ব্যালন ডি'অরও।

রসি বিশালদেহী বা শারিরিকভাবে শক্তিশালী স্ট্রাইকার ছিলেন না। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে তিনি পুষিয়ে দিয়েছিলেন অসাধারণ ফুটবল-বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। তার গতি, ক্ষিপ্রতা এবং খেলার পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত হওয়ার এক বিরল দক্ষতা ছিল তাঁর। বল ধরে রেখে আক্রমণ গড়া, ডিফেন্ডারদের অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত দৌড়ে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করা—এসব ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত।

অনেক দিক থেকেই রসি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে। 'ফলস নাইন' শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই তিনি আধুনিক ফলস নাইনদের মতো কৌশলগত সচেতনতা ও পজিশনিংয়ের অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।

Image

১৩. ববি মুর

ইংল্যান্ড ইতিহাসে মাত্র একবার বিশ্বকাপ জিতেছে, আর সেই সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন অধিনায়ক ববি মুর।

১৯৬২ সালের হতাশাজনক বিশ্বকাপের পর ১৯৬৬ সালে তিনি থ্রি লায়ন্সের অধিনায়কত্ব করেন এবং পুরো টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট খেলেন।

তাঁর নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ চারটি ক্লিন শিট রাখে এবং পুরো আসরে মাত্র তিনটি গোল হজম করে। এর মধ্যে দুটি এসেছিল ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং কর্তৃত্বপূর্ণ নেতৃত্বের জন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান।

ফাইনালে তিনি শুধু রক্ষণেই নয়, আক্রমণেও অবদান রাখেন। দ্রুত নেওয়া একটি ফ্রি-কিক থেকে জিওফ হার্স্ট সমতাসূচক গোল করেন। পরে হার্স্টের ঐতিহাসিক তৃতীয় গোলের আগেও শেষ পাসটি দিয়েছিলেন মুর। সেই গোলেই হার্স্ট পূর্ণ করেন নিজের হ্যাটট্রিক এবং স্যার আলফ র‍্যামসের ইংল্যান্ড জিতে নেয় জুলে রিমে ট্রফি নাম্নী প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ শিরোপা।

তাঁর পারফরম্যান্স শুধু ইংল্যান্ডেই নয়, বিশ্বজুড়েই তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা এনে দেয়। এমনকি ব্রাজিলের মহাতারকা পেলে একবার বলেছিলেন, "আমি যাঁদের বিপক্ষে খেলেছি, তাঁদের মধ্যে সেরা ডিফেন্ডার ছিলেন ববি মুর।"

বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের কাছ থেকে এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে!

Image

১২. গারিঞ্চা

গারিঞ্চা ছিলেন বিশ্বের যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্য আতঙ্কের নাম।

তাঁর ছিল এক্সপ্লোসিভ গতি, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা। একাই ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার বিরল সামর্থ্য ছিল তাঁর। একবার পূর্ণ গতিতে ছুটতে শুরু করলে তাঁকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।

শৈশব থেকেই শারীরিক নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বড় হয়েছিলেন তিনি। তাঁর দুই পা ছিল অসমান ও বাঁকানো—যে সমস্যা অনেকের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই শেষ করে দিতে পারত।

কিন্তু মাঠে তিনি ছিলেন এক বিস্ময়।

১৯৫৮ ও ১৯৬২—দুই বিশ্বকাপেই ব্রাজিলের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন গারিঞ্চা। বিশেষ করে ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপকে অনেকেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ টুর্নামেন্ট বলে মনে করেন।

সেই আসরে তিনি যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পাশাপাশি একের পর এক ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স উপহার দেন। স্বাগতিক চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ব্রাজিলের ৪-২ জয়ে তার জোড়া গোল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

Image

১১. জুস্ত ফঁতেন (জাস্ট ফন্টেইন)

জুস্ত ফঁতেন এমন একটি বিশ্বকাপ রেকর্ডের মালিক, যা ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের এই স্ট্রাইকার মাত্র একটি টুর্নামেন্টেই করেছিলেন অবিশ্বাস্য ১৩ গোল।

• প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক • যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে দুই গোল • উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল • স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এক গোল • ব্রাজিলের বিপক্ষে এক গোল • পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে চার গোল

এত গোল করেও ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি তিনি। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল লে ব্লু।

তবুও এক আসরে ১৩ গোলের সেই রেকর্ড আজও অক্ষত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেটি ভাঙা অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

আর যদি তিনি একাধিক বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেতেন, তাহলে হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়ে যেতে পারতেন—এবং বেশ বড় ব্যবধানেই।

Image

১০. জাইরজিনিয়ো

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ বলতেই অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথমে ভেসে ওঠে পেলের নাম। সেই আসরে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে ইতিহাসের প্রথম এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন জাইরজিনিয়ো। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের বিচারে তিনি উপহার দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

বোটাফোগোর এই রাইট উইঙ্গার টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে জোড়া গোল দিয়ে শুরু। এরপর গোল করেন ইংল্যান্ড, রোমানিয়া, পেরু, উরুগুয়ে এবং সবশেষে ফাইনালে ইতালির বিপক্ষেও।

এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে শিরোপা জয়ের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন জাইরজিনিয়ো।

Image

৯. মিরোস্লাভ ক্লোসা

মিরোস্লাভ ক্লোসা আর বিশ্বকাপ—দুটো নাম যেন একে অপরের পরিপূরক। জার্মানির সাবেক এই স্ট্রাইকার ১৬ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন লাভ করেছিলেন ২০১৪ সালে।

চারটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি এই অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন—

• ২০০২ সালে ৫ গোল • ২০০৬ সালে ৫ গোল • ২০১০ সালে ৪ গোল • ২০১৪ সালে ২ গোল

২০১৪ বিশ্বকাপেই তিনি ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন।

সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, নিজের শেষ বিশ্বকাপেই তিনি শিরোপা জেতেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে গোল করতে না পারলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের পরিসমাপ্তি ঘটান ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলশিকারি।

Image

৮. কাফু

বিশ্বকাপ ইতিহাসে তিনটি আলাদা ফাইনালে মাঠে নামা একমাত্র ফুটবলার কাফু। ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২—এই তিনটি ফাইনাল তার ক্যারিয়ারের তিনটি ভিন্ন অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন তুলনামূলক অপরিচিত এক তরুণ। পুরো টুর্নামেন্টে খুব বেশি সুযোগ পাননি। তবে ফাইনালে মাত্র ২১ মিনিটের মাথায় জর্জিনহো চোট পেলে তাঁকে মাঠে নামানো হয়।

প্রচণ্ড চাপের সেই ম্যাচে কাফু অসাধারণ ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমের পরিচয় দেন। টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, আর রবার্তো বাজ্জিওর মতো তারকাদেরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কাফু।

১৯৯৮ সালে ইতালির ক্লাব রোমায় নিজের অবস্থান শক্ত করে ফেলার পর ফ্রান্স বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিলের প্রথম পছন্দের রাইট-ব্যাক ছিলেন। ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি মিনিট খেললেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ফাইনালে মাঠে নামতে পারেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হেরে যায় ব্রাজিল।

অবশেষে ২০০২ সালে তিনি বিশ্বের সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দেন। অধিনায়কের বাহুবন্ধনী পরে বিশ্বকাপ জিতে তিনি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালের অসাধারণ যাত্রা সম্পূর্ণ করেন এবং ফুটবল ইতিহাসে নিজের স্থান স্থায়ী করে নেন।

Image

৭. গার্ড মুলার

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করলেই গার্ড মুলারের নাম ইতিহাসে অমর হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর বিশ্বকাপ লিগ্যাসি স্রেফ ওই একটি গোলের জন্য থেমে থাকেনি।

সেই আসরে কিংবদন্তি জার্মান স্ট্রাইকার করেন চার গোল। পাশাপাশি তিনটি অ্যাসিস্টও করেন, যার সবগুলোই আসে সুইডেনের বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানির ৪-২ জয়ের ম্যাচে।

তবে তাঁর সবচেয়ে বিধ্বংসী বিশ্বকাপ ছিল ১৯৭০ সালে। মেক্সিকো বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন কার্যত অপ্রতিরোধ্য। পুরো টুর্নামেন্টে করেন ১০ গোল। বুলগেরিয়া ও পেরুর বিপক্ষে দুটি হ্যাটট্রিক করেন। এছাড়া তিনটি অ্যাসিস্টও ছিল তাঁর ঝুলিতে। এর একটি থেকে আসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের জয়সূচক গোল।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই গের্ড মুলারের মতো এত ধারাবাহিকভাবে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। 'ডের বোম্বার'—এই ডাকনামটিরও যথার্থতা তিনি প্রতিটি বিশ্বকাপেই প্রমাণ করেছেন।

Image

৬. জিনেদিন জিদান

জিনেদিন জিদান ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রমধর্মী একজন মিডফিল্ডার। শক্তি ও সৌন্দর্য, আগ্রাসন ও ক্ষিপ্রতা, শারীরিক সামর্থ্য ও সূক্ষ্ম কারিগরি—সবকিছুর অনন্য সমন্বয় ছিল তাঁর খেলায়।

নিজের সেরা সময়ে তাঁকে দেখে মনে হতো, মাঠের অন্য সবার চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে আছেন তিনি। যেন একদিকে বুলডোজারের শক্তি, অন্যদিকে বলে ব্যালেরিনার কোমল স্পর্শ—দুটোরই অপূর্ব মিশেল।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভা সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। ১৯৯৮ সালে ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন জিদান। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি মাত্র দুটি হেডে গোল করেন, দুটিই ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ফাইনালে।

আট বছর পর, ২০০৬ বিশ্বকাপেও তিনি আবার পুরো বিশ্বের নজর কেড়ে নেন। তিনটি গোল করার পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট করেন এবং ফ্রান্সকে আবারও ফাইনালে তুলে নেন। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তাঁর বিখ্যাত 'পানেনকা' পেনাল্টি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।

তবে তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শুধু গৌরবগাথায় ভরা ছিল না।

১৯৯৮ সালে লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞায় দুটি ম্যাচ খেলতে পারেননি। আর ২০০৬ সালের ফাইনালে ইতালির মার্কো মাতেরাত্সিকে মাথা দিয়ে আঘাত (হেডবাট) করে লাল কার্ড দেখে নাটকীয়ভাবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।

তবুও সব বিতর্ক, উত্থান-পতন ও নাটকীয়তার পরও একটি বিষয় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই—বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে জিদান বারবার নিজেকে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। সেই কারণেই তিনি টুর্নামেন্টটির সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবলার।

Image

৫. ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে অধিকাংশ ফুটবলবিশেষজ্ঞের বিশ্বাস ছিল, নেদারল্যান্ডসই শিরোপা জিতবে। 'টোটাল ফুটবল'-এর বিপ্লবী দর্শন, সঙ্গে ইয়োহান ক্রুইফ, ইয়োহান নেস্কেন্সদের মতো বিশ্বমানের তারকাদের নিয়ে ডাচ দলটি ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দল।

কিন্তু পশ্চিম জার্মানির অধিনায়ক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ভিন্ন গল্প লিখেছিলেন।

সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তি 'সুইপার' অসাধারণ গেম-রিডিং ক্ষমতা, নিখুঁত ট্যাকল এবং দুর্দান্ত পজিশনিংয়ের মাধ্যমে ক্রুইফদের আক্রমণভাগকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে দেন। শুধু রক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অসাধারণ।

প্রায়ই তিনি রক্ষণভাগ ছেড়ে মাঝমাঠে উঠে আসতেন, ফলে নেদারল্যান্ডসকে নিজেদের স্বাভাবিক কৌশলের চেয়ে অনেক নিচে নেমে রক্ষণ সামলাতে বাধ্য হতে হতো।

শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানি ২-১ ব্যবধানে জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেই জয় এখনও বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত।

বেকেনবাওয়ারের কিংবদন্তি মর্যাদা শুধু এই ম্যাচের জন্য নয়। ১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ইঞ্জুরিতে পড়ার (কাঁধ ডিসলোকেটেড) পরও তিনি হাতে স্লিং বেঁধে ম্যাচ শেষ করেছিলেন। দল হারলেও সেই আত্মত্যাগ তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সাহসী আইকনে পরিণত করেছে।

Image

৪. দিয়েগো ম্যারাডোনা

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ মানেই দিয়েগো ম্যারাডোনা। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দুটি সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্ত উপহার দেন।

প্রথমটি ছিল বিতর্কিত 'হ্যান্ড অব গড' গোল, যেখানে হাত দিয়ে বল জালে পাঠিয়েও গোল পেয়ে যান তিনি। এবং এর মাত্র ৪ মিনিট পরই করেন 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে প্রায় পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাটিয়ে করা সেই গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের উদাহরণ।

সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনার ২-০ জয়ের দুই গোলই করেন ম্যারাডোনা।

এরপর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলটির অ্যাসিস্টও আসে তাঁর পা থেকে। সেই জয়ে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

চার বছর পর তিনি আর্জেন্টিনাকে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছিলেন।

যদিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে তাঁকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তাঁর বিশ্বকাপ লিগ্যাসিতে কিছুটা দাগ লাগে, তবুও ১৯৮৬ সালে তাঁর একক আধিপত্যকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বলে মনে করেন।

Image

৩. রোনালদো নাজারিও

ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা 'আউট-অ্যান্ড-আউট' স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিওর জন্য বিশ্বকাপ ছিল নিজের সাম্রাজ্য গড়ার মঞ্চ।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে চার গোল করে তিনি ব্রাজিলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। মনে হচ্ছিল, তিনিই সেলেসাওকে শিরোপা এনে দেবেন।

কিন্তু ফাইনালের আগের রাতে রহস্যজনকভাবে খিঁচুনিতে আক্রান্ত হন রোনালদো। চিকিৎসকদের আপত্তি সত্ত্বেও তাঁকে একাদশে রাখা হয়। মাঠে তিনি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না, আর ব্রাজিলও ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায়। তবুও পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন রোনালদো।

চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে তিনি সেই হতাশার সব হিসাব চুকিয়ে দেন। পুরো টুর্নামেন্টে করেন আট গোল। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ব্রাজিলের ২-০ জয়ের দুটি গোলই আসে তার পা থেকে।

এই বিশ্বকাপ শুধু ব্রাজিলকে পঞ্চম শিরোপাই এনে দেয়নি, রোনালদোকেও দিয়েছিল এক অনন্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। সেই আসরে তাঁর বিখ্যাত অদ্ভুত চুলের ছাঁটও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।

Image

২. লিওনেল মেসি

ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়জুড়ে লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপে অনেকটা একাই লড়তে হয়েছে।

২০০৬ ও ২০১০ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন। ২০১৪ সালে দলকে ফাইনালে নিয়ে গেলেও জার্মানির কাছে শিরোপা হারাতে হয়। ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার বিদায় ঘটে শেষ ষোলোতেই।

তবে এই ফলাফলগুলো কখনোই মেসির ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের সঠিক প্রতিফলন ছিল না।

প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি ছিলেন মাঠের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। একমাত্র ২০১৮ সালে কোচ হোর্হে সাম্পাওলির কৌশলগত পরিকল্পনার কারণে তাঁর প্রভাব কিছুটা কমে যায়।

যখনই আর্জেন্টিনার জাদুকরী কিছু দরকার হয়েছে, মেসিই এগিয়ে এসেছেন। কখনো অবিশ্বাস্য একক গোল, কখনো নিখুঁত অ্যাসিস্ট—তাঁর অবদানই তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলশিকারি এবং গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ড এনে দিয়েছে।

অবশেষে ২০২২ সালে বহু বছরের আক্ষেপের অবসান ঘটে। শক্তিশালী সতীর্থদের সমর্থন এবং কিছুটা ভাগ্যের সহায়তায় মেসি পুরো টুর্নামেন্টে সাত গোল করেন এবং আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন।

অবশেষে নিজের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ করেন তাঁর অসাধারণ বিশ্বকাপ লিগ্যাসি।

Image

১. পেলে

বিশ্বকাপের সঙ্গে যদি কোনো একজন ফুটবলারের নাম চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে থাকে, তবে তিনি পেলে। যার জন্য যুদ্ধ থেমে যায়। যার নাম পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ নিজের নামের মতো চেনে।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়েছেন তিনি। টুর্নামেন্টটির ওপর তাঁর মতো প্রভাব আর কোনো ফুটবলার রাখতে পারেননি।

১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করে দেন। সেই বিশ্বকাপে করেন ছয় গোল, যার মধ্যে সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে ছিল জোড়া গোল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চেই নিজের আগমনের ঘোষণা দেন তিনি।

১৯৬২ সালে ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও ইনজুরির কারণে পেলের বিশ্বকাপ যাত্রা সেবার খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।

তবে ১৯৭০ সালে তিনি ফিরে আসেন আরও পরিণত, আরও অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে। সেই ঐতিহাসিক ব্রাজিল দলটির অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন পেলে। পুরো আসরে করেন চার গোল, যার মধ্যে ইতালির বিপক্ষে ফাইনালেও ছিল একটি গোল।

ব্রাজিল ৪-১ ব্যবধানে জিতে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় এবং পেলে গড়েন এমন এক ইতিহাস, যা আজও অক্ষত।

তিনটি বিশ্বকাপ জয়—এই একক কীর্তি এখনও কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। আর ভবিষ্যতেও কেউ পারবেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

যাই হোক, বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলারের আবির্ভাব ঘটেছে। কেউ গোল করে, কেউ নেতৃত্ব দিয়ে, কেউ একক নৈপুণ্যে বদলে দিয়েছেন টুর্নামেন্টের গতিপথ। কিন্তু ধারাবাহিকতা, প্রভাব, পরিসংখ্যান, দলীয় সাফল্য এবং ইতিহাসে রেখে যাওয়া অমলিন উত্তরাধিকারের বিচারে এই ১৫ জনই বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের অন্যতম। আর তালিকার শীর্ষে থাকা পেলে এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক—এমন এক নাম, যা ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে ও থাকবে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।