ফুটবল, বিশ্বকাপ, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা
বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ে যখন ভিন্ন দল: এক পরিবারে দুই শিবির
বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ে যখন ভিন্ন দল: এক পরিবারে দুই শিবির। অতিথি কলাম লিখেছেন ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক মাহমুদ নেওয়াজ জয়।

বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ে যখন ভিন্ন দল: এক পরিবারে দুই শিবির
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা অন্য কোনো দল—বিশ্বকাপ এলেই অনেক পরিবারের ভেতর তৈরি হয় মজার এক প্রতিযোগিতা। খোঁচা, তর্ক, অভিমান আর হাসিতে জমে ওঠে ঘরের পরিবেশ। ফুটবলের এই 'দুই শিবির' আসলে পারিবারিক আনন্দেরই আরেক নাম।
এক ঘরে দুই পতাকা
বিশ্বকাপ এলেই অনেক বাসার ড্রয়িংরুমে যেন অদৃশ্য একটা দাগ টেনে দেওয়া হয়। এ পাশে ব্রাজিল, ওপাশে আর্জেন্টিনা। একই পরিবারের মানুষ, কিন্তু খেলার দুই ঘণ্টার জন্য যেন দুই শিবির।
কেউ আলমারি থেকে বহু বছরের পুরোনো জার্সিটা বের করেন। কেউ বারান্দায় পতাকা টাঙান। কেউ আবার ঘোষণা দেন, 'আজকে হারলে কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলব না।' সবাই জানে কথাটা সত্যি নয়। তবু এমন ঘোষণা না দিলে যেন বিশ্বকাপের শুরুই হয় না।
খেলা শুরুর আগে থেকেই ঠাট্টা শুরু হয়ে যায়। 'এবারও তোদের কিছু হবে না।' জবাব আসে, 'খেলা শেষ হোক, তারপর কথা হবে।' এমন কথার পর কেউ রাগ করেন না। বরং আরেকটু হাসাহাসি হয়। কারণ এই খোঁচাগুলো বহু বছরের চেনা।
গোল হলে কে কোথায় যাবে, সবাই জানে
ম্যাচ শুরু হলে পরিবারের মানুষগুলোকেও নতুন করে চিনতে হয় না। কে গোল মিস হলে মাথায় হাত দেবেন, কে রেফারির সিদ্ধান্তে রেগে উঠবেন, কে উত্তেজনায় সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়বেন—এসব প্রায় মুখস্থ হয়ে যায়।
প্রিয় দল গোল করলে একজন হাততালি দেন, আরেকজন চুপচাপ পানির গ্লাস হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে যান। কয়েক মিনিট পর আবার ফিরে আসেন, যেন কিছুই হয়নি। হেরে যাওয়া দলের সমর্থককে তখন ইচ্ছে করেই কেউ জিজ্ঞেস করে, 'চা খাবেন?' প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে দুষ্টুমি।
অনেক বাড়িতে ছোটরাই সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে। বাবা যদি ব্রাজিলের সমর্থক হন, ছেলে ইচ্ছে করেই আর্জেন্টিনার জার্সি পরে বসে। আবার কোথাও মেয়ে বাবাকে খোঁচা দিয়ে বলে, 'আজ কিন্তু আপনার দলের খবর আছে।' এসবের কোনোটাই সিরিয়াস নয়। এগুলো আসলে একসঙ্গে খেলা দেখার আনন্দেরই অংশ।
মায়েরা প্রায়ই থাকেন মাঝখানে। কারও জয় নিয়ে খুব মাতামাতি করতে দেন না, আবার হেরে যাওয়া মানুষটার মুখও গোমড়া থাকতে দিতে চান না। কখনো বলেন, 'এত জোরে চিৎকার করো না।' কখনো রান্নাঘর থেকে ডাক আসে, 'চা বানিয়েছি, সবাই এসে খাও।' খেলা তখনও চলছে, কিন্তু কয়েক মিনিটের জন্য সবাই আবার একই দলে।
বিশ্বকাপ শেষ হয়, গল্পগুলো থেকে যায়
বাংলাদেশে ফুটবলের সমর্থন অনেক সময় মাঠের চেয়ে ঘরেই বেশি চোখে পড়ে। অফিসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা চায়ের দোকানে যেমন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা চলে, তেমনি চলে পরিবারের ভেতরও। পার্থক্য হলো, এখানে হার-জিতের চেয়ে সম্পর্কটাই বড়।
তাই মজারও একটা অলিখিত নিয়ম আছে। খোঁচা দেওয়া যাবে, কিন্তু অপমান করা যাবে না। কেউ মন খারাপ করলে একটু পরে তাকে আবার ডাকতে হবে। কারণ খেলা শেষ হলে একই টেবিলে বসেই রাতের খাবার খাওয়া হবে।
বিশ্বকাপ শেষ হলে পতাকাগুলো নামিয়ে রাখা হয়। জার্সি ধুয়ে আলমারিতে তুলে দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর সেই উত্তেজনাও মিলিয়ে যায়। কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায় অনেক দিন। বাবা গোল হওয়ার পর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ছেলে হারের পর আর কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। মা বিরক্ত মুখে বলেছিলেন, 'তোমরা ফুটবল দেখছ, না পুরো পাড়া জাগিয়ে রাখছ?'
এসব দৃশ্যের কোনোটাই ইতিহাসের অংশ হবে না। কোনো স্কোরবোর্ডেও লেখা থাকবে না। তবু অনেক বছর পরে পরিবারের মানুষ যখন পুরোনো বিশ্বকাপের কথা মনে করবেন, তখন ম্যাচের ফলের আগে হয়তো মনে পড়বে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই।
শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা পর্তুগাল—সব পরিচয়ের ওপরে আরেকটা পরিচয় থেকে যায়। তারা একই পরিবারের মানুষ। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোও সম্ভবত সেখানেই জন্ম নেয়।

লেখক: মাহমুদ নেওয়াজ জয় (ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক)

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।