খেলারদেশ

‘আপনি ধারাবাহিক হতে পারলে সফল হতে পারবেন’

ঘরের মাঠে তাঁর শিষ্যদের দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্স দেখে বেশ খুশি বাংলাদেশের সাবেক পেস বোলিং কোচ শন টেইট।

‘আপনি ধারাবাহিক হতে পারলে সফল হতে পারবেন’

শন টেইট যখন বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং কোচ ছিলেন।

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

ঘরের মাঠে তাঁর শিষ্যদের দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্স দেখে বেশ খুশি বাংলাদেশের সাবেক পেস বোলিং কোচ শন টেইট। ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার তুলে ধরেছেন বাংলাদেশে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী বাংলাদেশের পেস বোলিং ইউনিটের সাফল্যের কারণ এবং আরও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলছে এবং বাংলাদেশের পেসাররা দুর্দান্ত বোলিং করছেন। আপনার কাছে কেমন লাগছে? শন টেইট: সত্যি বলতে, তাদের নিয়ে আমি খুব গর্বিত। খুবই খুশি। যদিও তারা আমার নিজের দেশের বিপক্ষে খেলছে, তারপরও তাদের ভালো করতে দেখে সত্যিই খুব আনন্দিত।

আমরা জানি, সে টেস্টের জন্য সে ভালো বোলার। কিন্তু তার ইয়র্কারের কারণে সে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও খেলতে পারে।

শন টেইট

প্রশ্ন: বাংলাদেশ নাহিদ রানাকে পায়নি। কিন্তু দলের বাকি পেসাররা যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছেন, তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে শক্তি ও সামর্থ্য বাড়ছে।

শন টেইট: আমার মনে হয়, আমি যখন বোলিং কোচ ছিলাম তখনও এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম। তখনও বলেছিলাম, বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে বেশ ভালো গভীরতা আছে। দু-একজন চোটে পড়লেও অন্যরা এসে দায়িত্ব নিতে পারে এবং নিজেদের মেলে ধরতে পারে। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সব পেসারই তিন সংস্করণে খেলতে পারে। আমি মনে করি, তারা সবাই বহুমুখী প্রতিভাবান বোলার এবং বাংলাদেশের জন্য এটি বিশাল একটি ব্যাপার। তারা বেশ ভালো করছে এবং সামনে আরও অনেক বছর বাংলাদেশের পেস বোলিং এমন ধারাবাহিক হবে আশা করি।

প্রশ্ন: পেসার হিসেবে হাসান মাহমুদের উন্নতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শন টেইট: সে চোট থেকে ফিরে এসেছে। কিছুদিন আগেই তার কনুইয়ে সমস্যা হয়েছিল। তাই আমি মনে করি, সেই চোট থেকে ফিরে সে খুব ভালো করেছে। মেডিকেল স্টাফরাও নিশ্চয়ই তার সঙ্গে দারুণ কাজ করেছে। আমার মনে হয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে ইংল্যান্ডে কেন্টের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল। তার সঙ্গে কিছু কথা হয়েছে আমার এবং সে কাউন্টি ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছে। আমার মনে হয়, এটি তার আত্মবিশ্বাসের জন্য খুবই ভালো। আমরা জানি, সে টেস্টের জন্য সে ভালো বোলার। কিন্তু তার ইয়র্কারের কারণে সে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও খেলতে পারে। সে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে কাজ করা সত্যিই খুব আরামদায়ক। আমার সাথে তার বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিলো এবং তাকে ভালো খেলতে দেখে আমি খুবই খুশি।

প্রশ্ন: সাধারণত একজন পেসার খুব আগ্রাসী হয়ে থাকেন। কিন্তু হাসানকে বেশ শান্ত মনে হয়। আপনি কি মনে করেন, এটি তার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি? শন টেইট: সে অত্যন্ত শান্ত, খুবই নম্র স্বভাবের এবং ভালো একজন মানুষ। পেসার হিসেবে আমরা সাধারণত যে ধরনের আগ্রাসী মানসিকতার মানুষকে দেখি, সে তেমন নয়। কিন্তু সে একজন স্মার্ট মানুষ। খুবই স্মার্ট একজন ক্রিকেটার। সে তার ক্রিকেট নিয়ে খুব ভালো চিন্তা করে। আর এটাও ঠিক, সে খুবই বিনয়ী। খুব স্থির মানসিকতার একজন মানুষ। অস্ট্রেলিয়ায় এসে এভাবে পারফর্ম করা সত্যিই অসাধারণ।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, গতির ক্ষেত্রে হাসান নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে জানে? অর্থাৎ সে জানে যে তার ১৫০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে বোলিং করার মতো গতি নেই। তাই তাকে বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করতে হয়। এটিই কি তার অন্যতম বড় শক্তি?

শন টেইট: আমি এই টেস্ট ম্যাচটি দেখছি এবং সে খুবই বিরক্ত করে দেয়ার মত বোলিং করছে, টেস্ট ক্রিকেটে ঠিক এটাই করা দরকার। টেস্ট ক্রিকেটে আপনাকে একটি বিরক্তিকর, ভালো লেংথে ধারাবাহিকভাবে বোলিং করে যেতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটের সেরা বোলাররা এটাই করেন। তারা সারাদিন খুব ভালো একটি লেংথে বোলিং করে যান। আর আমার, হাসান সেটি খুব ধারাবাহিকভাবে করতে পেরেছে। এমনকি যদি এই টেস্ট ম্যাচে তার বোলিংয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন বোলারের তুলনা করেন, দেখবেন হাসান তার লাইন ও লেংথের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ধারাবাহিক ছিল। এটাই আসল কৌশল। আপনি যদি ধারাবাহিক হতে পারেন, তাহলে আপনি সফল হতে পারবেন।

প্রশ্ন: আগে বাংলাদেশের পেসাররা বিদেশের কন্ডিশনে অনেক শর্ট বল করতেন, কারণ তারা এসব পিচে অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু এবার তাদের অনেক বেশি ফুলার লেংথে বোলিং করতে দেখা যাচ্ছে। আপনি কি মনে করেন, এটি বাংলাদেশের বড় উন্নতির একটি জায়গা?

শন টেইট: শতভাগ। আপনি একদম ঠিক বলেছেন। শতভাগ ঠিক। এটি একটি বড় ব্যাপার। টেস্ট ক্রিকেটে, আসলে যেকোনো ধরনের ক্রিকেটেই বল একটু সামনে পিচ করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি যখন বাংলাদেশে ছিলাম, তখন আমরা তাদের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতাম। আমার মনে হয়, আমি চলে আসার পরও তারা সেটি ধরে রেখেছে। জানি, দলের বর্তমান কোচিং স্টাফরাও এখনো তাদের সেই বিষয়টির ওপর জোর দিচ্ছেন, বিশেষ করে কন্ডিশন অনুযায়ী একটু ফুলার লেংথে বোলিং করার ব্যাপারে। আমার মনে হয়, বছরের শেষ দিকে তারা দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছে। সেখানেও একই বিষয় প্রযোজ্য। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও বল সামনে পিচ করাতে হবে। এমনকি এমন পর্যায়ে বল করতে হবে, যেখানে মনে হতে পারে আপনি একটু বেশিই ফুলার লেংথে বোলিং করছেন। তবুও খুব বেশি শর্ট করার চেয়ে একটু বেশি ফুলার বোলিং করা ভালো। আমার মনে হয়, উপমহাদেশেও আপনি এটি করতে পারেন। এরপর দিন যত গড়াবে, আপনি আপনার লেংথ সামঞ্জস্য করতে পারবেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানেও আপনি বল সামনে পিচ করানোর মানসিকতা রাখতে পারেন। শুরু করার জন্য এটি খুব ভালো জায়গা।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয়, বাংলাদেশের পেসাররা এখন পরিণত হয়ে উঠছেন এবং অতীতের মতো দলটি আর স্পিনারদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়?

শন টেইট: আমি এটি আগেও বলেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এখন শুধু বুঝতে হবে যে এই মুহূর্তে তাদের শক্তির জায়গা হলো পেস বোলিং। এটি অবশ্যই সত্যি। আমি বিশ্বাস করি, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পেস বোলিং। বাংলাদেশ পেসারদের জন্য আরও ভালো, বোলিং সহায়ক উইকেট তৈরি করতে শুরু করেছে এবং এর ফলে তারা খুব ভালো ফলও পাচ্ছে, এমনকি সাদা বলের ক্রিকেটেও। তারা যদি তাদের পেসারদের এভাবেই গড়ে তুলতে থাকে এবং বাংলাদেশে এমন উইকেট তৈরি করতে থাকে যেখানে পেসাররা কিছুটা সহায়তা পায়, তাহলে তারা অনেক সাফল্য পাবে। আমরা যেমন দেখেছি, তারা বিদেশের মাটিতেও একই রকম সাফল্য পেতে পারে। তবে এখন চ্যালেঞ্জ হলো দ্বিতীয় টেস্টেও সেটি ধরে রাখা। আশা করি, তারা এই টেস্টটি খুব শক্তভাবে শেষ করবে। (এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয় ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিন) এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জের হবে। আশা করি, তারা সেই ম্যাচেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে এবং আবারও ভালো বোলিং করতে পারবে।

প্রশ্ন: আপনি সব সময় বলতেন, পেসারদের সহজভাবে বোলিং করার বিষয়টি শেখানোর চেষ্টা করেন...

শন টেইট: দেখুন, আমি মাত্র তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছি। কিন্তু আমি এটুকু জানি যে সর্বকালের সেরা বোলারদের সবারই আলাদা আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে একটি বিষয় তারা সবাই করেন, তা হলো খুব ধারাবাহিকভাবে বোলিং করেন এবং আপনি যেমন বললেন, বিষয়টিকে সহজ রাখেন। আমার মনে হয়, গত এক বছরে নাহিদ রানার সঙ্গে আমার অনেক আলোচনার মূল বিষয়ও ছিল, বোলিং বিষয়টিকে সহজ রাখা। আমি তাকে শুধু বলেছি, সহজভাবে বোলিং করতে থাকো। তুমি ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বোলিং করো। তোমার বেশি কিছু করার দরকার নেই। তোমার এক মিলিয়ন স্লোয়ার বলের প্রয়োজন নেই, খুব বেশি কিছু করারও দরকার নেই। তোমাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ধারাবাহিকভাবে বোলিং করতে হবে এবং তোমার তো গতি আছেই। আমি মনে করি, আসল কৃতিত্ব খেলোয়াড়দেরই দিতে হবে। অনেক সময় কোচদের বেশি কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কোচ হিসেবে আমরা শুধু তাদের পথ দেখাই। শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়রাই আসল কৃতিত্ব পাওয়ার যোগ্য।

প্রশ্ন: সম্ভবত হাসানও একই নীতি অনুসরণ করে, অর্থাৎ বিষয়টিকে সহজ রাখে?

শন টেইট: হ্যাঁ, শতভাগ। আমার মনে হয়,আমি বাংলাদেশে যাওয়ার আগেই সে বিষয়টি জানত। আমি মনে করি, এই পেসারদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, তাদের জন্য একটি আনন্দপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারা। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পেসারদের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ, আনন্দময় এবং স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা। আপনি যদি সেটি করতে পারেন এবং তাদের অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে ভারাক্রান্ত না করেন, তাহলে আমার সত্যিই মনে হয় আপনি কিছুটা সাফল্য পেতে পারেন। এবং আপনি জানেন, এই বিষয়গুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে ফেরার কোনো পরিকল্পনা আছে?

শন টেইট: কে জানে? বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি মূলত আমার পরিবারের জন্য নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত ছিল। আমি হয়তো কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসতে পারি। তবে তিন সংস্করণে পূর্ণকালীন দায়িত্ব নিয়ে নয়...

প্রশ্ন: তাহলে পরামর্শক হিসেবে?

শন টেইট: হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই। অবশ্যই আমি সেটি বিবেচনা করব। অবশ্যই। (ক্রিকবাজ থেকে অনুবাদ করা)

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।